• ঢাকা
  • রোববার, ০৪ অক্টোবর ২০২৬, ০৩:৩৭ পিএম


ভারত-বাংলাদেশ সম্পর্ক ‘বড় ভাই–ছোট ভাই’ নয়, সমতার হওয়া উচিত: নাসীরুদ্দীন

দি পালস বিডি অনলাইন ডেস্ক
আপডেট টাইম: ৪ অক্টোবর ২০২৬ ৩:৩৬ পিএম

‘আমরা আধিপত্য চাই না, সংঘাতও চাই না’ বলে মন্তব্য করেছেন জাতীয় নাগরিক পার্টির (এনসিপি) মুখ্য সমন্বয়ক নাসীরুদ্দীন পাটওয়ারী। তিনি বলেছেন, বাংলাদেশ চায় সমতার বন্ধুত্ব, পারস্পরিক সম্মান এবং ন্যায্য প্রতিবেশী সম্পর্ক। ভারত-বাংলাদেশ সম্পর্কের ভবিষ্যৎ ‘বড় ভাই–ছোট ভাই’ ধরনের না হয়ে দুই সার্বভৌম প্রতিবেশীর সমান মর্যাদার ভিত্তিতে হওয়া উচিত বলেও মন্তব্য করেন তিনি।

রোববার (৪ অক্টোবর) নিজের ভেরিফায়েড ফেসবুক আইডিতে দেওয়া এক পোস্টে এসব কথা বলেন নাসীরুদ্দীন পাটওয়ারী।

পোস্টে তিনি লেখেন, ঢাকায় ভারতের হাইকমিশনার দীনেশ ত্রিবেদী বলেছেন, ২০২৪ সালের আগস্টে শেখ হাসিনাকে ভারতে আশ্রয় দেওয়া ছাড়া ভারতের সামনে নাকি অন্য কোনো বিকল্প ছিল না। তিনি বিষয়টিকে একজন প্রতিবেশী হিসেবে ভারতের দায়িত্ব হিসেবেও ব্যাখ্যা করেছেন।

তবে নাসীরুদ্দীন পাটওয়ারীর প্রশ্ন, শুধু শেখ হাসিনাকে আশ্রয় দেওয়ার সিদ্ধান্ত নয়, গত এক দশকে বাংলাদেশের রাজনৈতিক বাস্তবতা তৈরিতে ভারতের ভূমিকা নিয়েও কি ভারত কখনো আত্মসমালোচনা করবে?

এনসিপির এই নেতা বলেন, ২০২৪ সালের জুলাই-আগস্টে বাংলাদেশের জনগণের ওপর যে ভয়াবহ দমন-পীড়ন হয়েছিল, জাতিসংঘের মানবাধিকার দপ্তরের তদন্তে তার একটি ভয়াবহ চিত্র উঠে এসেছে। জাতিসংঘের হিসাবে, ১ জুলাই থেকে ১৫ আগস্টের মধ্যে প্রায় ১ হাজার ৪০০ মানুষ নিহত হয়ে থাকতে পারেন এবং নিরাপত্তা বাহিনী ব্যাপকভাবে প্রাণঘাতী শক্তি ব্যবহার করেছিল।

শেখ হাসিনা সরকারের সেই শাসনব্যবস্থার সঙ্গে ভারতের ঘনিষ্ঠ সম্পর্ক নিয়ে বাংলাদেশের মানুষের দীর্ঘদিনের প্রশ্ন রয়েছে উল্লেখ করে তিনি বলেন, ভারত যখন এখন শুধু ‘প্রতিবেশীর দায়িত্ব’ বলে নিজের অবস্থান ব্যাখ্যা করে, তখন বাংলাদেশের মানুষের স্বাভাবিক প্রশ্ন হলো—প্রতিবেশীর দায়িত্ব কি শুধু ক্ষমতাচ্যুত একজন শাসককে আশ্রয় দেওয়া, নাকি প্রতিবেশী দেশের জনগণের গণতান্ত্রিক আকাঙ্ক্ষা, মর্যাদা ও সার্বভৌমত্বকেও সম্মান করা?

এর পাশাপাশি সীমান্তের বাস্তবতাও এড়িয়ে যাওয়ার সুযোগ নেই বলে মন্তব্য করেন নাসীরুদ্দীন।

ভারত-বাংলাদেশ সীমান্তে প্রাণহানি এখনো বন্ধ হয়নি জানিয়ে তিনি বলেন, আইন ও সালিশ কেন্দ্রের তথ্য অনুযায়ী, ২০২৫ সালে ভারতীয় সীমান্তরক্ষী বাহিনীর হাতে ৩৪ জন বাংলাদেশি নিহত হয়েছেন। আর ২০২৬ সালের প্রথম ছয় মাসেই ২১টি সীমান্ত সহিংসতার ঘটনায় ১০ জন বাংলাদেশি নিহত এবং ১০ জন আহত হয়েছেন।

এমনকি ২০২৬ সালে হিউম্যান রাইটস ওয়াচ ভারতের বিভিন্ন কর্তৃপক্ষের বিরুদ্ধে বাঙালি বাসিন্দাদের যথাযথ আইনি প্রক্রিয়া ছাড়াই বাংলাদেশে ঠেলে দেওয়ার অভিযোগও নথিবদ্ধ করেছে বলে জানান তিনি। তাদের হিসাবে, জুনের প্রথম দিক থেকে ২০০-এর বেশি মানুষকে সীমান্তের দিকে ঠেলে দেওয়ার ২১টি প্রচেষ্টা বাংলাদেশি সীমান্তরক্ষীরা ঠেকিয়েছে।

নাসীরুদ্দীন পাটওয়ারী বলেন, ভারত ও বাংলাদেশের নিজেদের সরকারি নথিতেও সীমান্তে বেসামরিক মানুষের প্রাণহানিকে উদ্বেগের বিষয় হিসেবে উল্লেখ করা হয়েছে। সেখানে দুই দেশের সীমান্তরক্ষীদের এমন ব্যবস্থা নেওয়ার কথা বলা হয়েছে, যাতে এ ধরনের ঘটনা শূন্যে নামিয়ে আনা যায়।

তার প্রশ্ন, ‘প্রতিবেশীর দায়িত্বের’ কথা যদি বলা হয়, তাহলে সেই দায়িত্ব সীমান্তে একজন নিরস্ত্র মানুষের জীবন রক্ষার ক্ষেত্রেও সমানভাবে প্রযোজ্য নয় কেন?

বাংলাদেশ ভারতবিরোধী কোনো রাষ্ট্র হতে চায় না জানিয়ে নাসীরুদ্দীন বলেন, বাংলাদেশ সমতার ভিত্তিতে ভারত-বাংলাদেশ সম্পর্ক চায়। দুই দেশের মধ্যে বন্ধুত্ব, বাণিজ্য, যোগাযোগ ও সাংস্কৃতিক সম্পর্ক থাকবে; তবে এসব সম্পর্কের ভিত্তি হতে হবে পারস্পরিক সম্মান, সার্বভৌম সমতা ও ন্যায্য স্বার্থ।

তার মতে, ভারতের উচিত বাংলাদেশের জনগণকে কোনো বৃহত্তর ভূ-রাজনৈতিক কল্পনার অংশ হিসেবে না দেখে একটি স্বাধীন ও সার্বভৌম জাতির জনগণ হিসেবে বিবেচনা করা। ‘অখণ্ড ভারত’ ধরনের যেকোনো সম্প্রসারণবাদী বা আধিপত্যবাদী রাজনৈতিক কল্পনা বাংলাদেশের মানুষের কাছে গ্রহণযোগ্য নয় বলেও উল্লেখ করেন তিনি।

পোস্টে তিনি আরও বলেন, দক্ষিণ এশিয়ার প্রতিটি দেশের নিজস্ব ইতিহাস, সংস্কৃতি, ভূখণ্ড ও জাতীয় পরিচয়ের প্রতি সম্মানই হতে পারে টেকসই প্রতিবেশী সম্পর্কের ভিত্তি।

নাসীরুদ্দীন পাটওয়ারী বলেন, বাংলাদেশের নদীর ন্যায্য হিস্যা, সীমান্তে মানুষের নিরাপত্তা, বাণিজ্যে ভারসাম্য, সীমান্ত ব্যবস্থাপনায় মানবাধিকার এবং বাংলাদেশের অভ্যন্তরীণ রাজনৈতিক বিষয়ে অযাচিত প্রভাব—এসব প্রশ্নের সমাধান চাপ প্রয়োগের মাধ্যমে নয়, বরং সমতার ভিত্তিতে আলোচনার মাধ্যমেই করতে হবে।

তিনি উল্লেখ করেন, গঙ্গা পানি চুক্তির মেয়াদ ২০২৬ সালের ডিসেম্বরে শেষ হওয়ার কথা এবং বাংলাদেশ ইতোমধ্যে নতুন করে আলোচনার প্রস্তাব দিয়েছে।

ভারতের উদ্দেশে নাসীরুদ্দীন বলেন, সময় এসেছে একটি বিষয় পরিষ্কারভাবে বোঝার—বাংলাদেশ কোনো অধীনস্থ ভূখণ্ড নয়, কোনো ‘পিছনের উঠান’ নয় এবং কোনো বৃহত্তর রাষ্ট্রীয় কল্পনার অংশও নয়।

বাংলাদেশ একটি স্বাধীন রাষ্ট্র উল্লেখ করে তিনি বলেন, ভারত যদি সত্যিই প্রতিবেশীর দায়িত্বের কথা বলে, তাহলে সেই দায়িত্বের প্রথম শর্ত হওয়া উচিত বাংলাদেশের জনগণের সার্বভৌম সিদ্ধান্ত, জাতীয় মর্যাদা, নিজস্ব সংস্কৃতি ও ভূখণ্ডের প্রতি পূর্ণ সম্মান।

/এসএন