সরকার জুলাই আন্দোলনের প্রতিশ্রুতি বাস্তবায়ন না করে জনগণের সঙ্গে প্রতারণা করেছে বলে অভিযোগ করেছেন বিরোধীদলীয় নেতা ও বাংলাদেশ জামায়াতে ইসলামীর আমির ডা. শফিকুর রহমান।
বুধবার (৫ আগস্ট) রাজধানীর জাতীয় মসজিদ বায়তুল মোকাররমের দক্ষিণ গেটে গণভোটের গণরায় বাস্তবায়নের দাবিতে আয়োজিত ১১ দলীয় ঐক্যের সমাবেশে প্রধান অতিথির বক্তব্যে তিনি এ মন্তব্য করেন।
ডা. শফিকুর রহমান বলেন, দেশের ৭০ শতাংশ মানুষের গণরায়কে অবমূল্যায়ন বা উপেক্ষা করা উচিত নয়। তিনি বলেন, যারা অতীতে জনগণের রায়কে অগ্রাহ্য করেছে, তাদের শেষ পর্যন্ত দেশ ছেড়ে পালাতে হয়েছে। বর্তমান সরকারকেও জনগণের রায়কে সম্মান করার আহ্বান জানান তিনি।
জামায়াত আমির বলেন, জুলাই হত্যাকাণ্ডের সঙ্গে জড়িতদের বিচারের দাবি এখনো পূরণ হয়নি। তার ভাষায়, এ বিষয়ে দৃশ্যমান কোনো অগ্রগতি দেখা যাচ্ছে না এবং এ বিষয়ে সরকারপ্রধানকে জনগণের কাছে জবাবদিহি করতে হবে।
বর্তমান পরিস্থিতি তুলে ধরে তিনি বলেন, দেশের সামগ্রিক অবস্থা দেখে মনে হচ্ছে সামনে আরেকটি আন্দোলন আসতে পারে। সেই আন্দোলনের জন্য দেশবাসীকে প্রস্তুত থাকার আহ্বান জানান তিনি।
তিনি আরও বলেন, বিপ্লব কোনো বয়সের সীমা মানে না। ২০২৪ সালের জুলাই আন্দোলনে শিশু থেকে প্রবীণ—সব বয়সের মানুষ রাজপথে নেমেছিলেন। ভবিষ্যতেও ফ্যাসিবাদের বিরুদ্ধে একইভাবে জনগণ ঐক্যবদ্ধ হয়ে আন্দোলন করবে বলেও মন্তব্য করেন তিনি।
ডা. শফিকুর রহমান বলেন, ২০২৪ সালের জুলাই আন্দোলন কোনো প্রচলিত রাজনৈতিক দলের নেতৃত্বে হয়নি। এটি ছিল ছাত্র ও তরুণ সমাজের নেতৃত্বে গড়ে ওঠা একটি গণআন্দোলন। তিনি আন্দোলনের নেতৃত্বদানকারী তরুণদের প্রতি শ্রদ্ধা জানিয়ে বলেন, গত সাড়ে ১৫ বছরে বিভিন্ন রাজনৈতিক দল আন্দোলন করেও ফ্যাসিবাদকে বিদায় করতে পারেনি। কিন্তু জুলাই আন্দোলনের সময় সারা দেশের মানুষ ঐক্যবদ্ধ হওয়ায় ক্ষমতাসীন সরকার দেশ ছেড়ে যেতে বাধ্য হয়। তাই এই আন্দোলনের কৃতিত্ব জনগণের এবং নেতৃত্বের কৃতিত্ব তরুণ সমাজের।
জুলাই আন্দোলনের কৃতিত্ব নিয়ে বিভাজনের সমালোচনা করে তিনি বলেন, কাউকে এককভাবে ‘মাস্টারমাইন্ড’ হিসেবে প্রতিষ্ঠার চেষ্টা গ্রহণযোগ্য নয়। তার ভাষায়, ‘এই আন্দোলনের মাস্টারমাইন্ড ১৮ কোটি নির্যাতিত মানুষ।’
শহীদদের নিয়ে রাজনৈতিক বিভাজন সৃষ্টি না করার আহ্বান জানিয়ে তিনি বলেন, তারা কোনো রাজনৈতিক দলের সম্পদ নন, তারা পুরো জাতির সম্পদ। একই সঙ্গে আহত ও পঙ্গু হয়ে যাওয়া জুলাইযোদ্ধাদের উন্নত চিকিৎসা, পুনর্বাসন এবং শহীদ পরিবারগুলোর সম্মানজনক পুনর্বাসন নিশ্চিত করার দাবি জানান। পাশাপাশি জুলাই হত্যাকাণ্ডে জড়িতদের দ্রুত বিচারের আওতায় আনারও আহ্বান জানান তিনি।
সরকারের সমালোচনা করে জামায়াত আমির বলেন, নির্বাচনের আগে দেওয়া বহু প্রতিশ্রুতির বাস্তবায়নে কোনো কার্যকর উদ্যোগ দেখা যাচ্ছে না। গণভোটে জনগণের দেওয়া রায় বাস্তবায়নের আহ্বান জানিয়ে তিনি বলেন, জনগণের রায় উপেক্ষা করলে তার রাজনৈতিক পরিণতি কখনোই ভালো হয় না।
দেশের বিভিন্ন শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে সাম্প্রতিক সংঘর্ষের ঘটনাও বক্তব্যে তুলে ধরেন তিনি। তার দাবি, শিক্ষাঙ্গনে আবারও গণরুম-গেস্টরুম সংস্কৃতি ও ফ্যাসিবাদী আচরণের পুনরাবৃত্তির আশঙ্কা তৈরি হয়েছে। যেখানেই ফ্যাসিবাদী প্রবণতা দেখা দেবে, সেখানেই প্রতিরোধ গড়ে তোলার আহ্বান জানান তিনি।
ডা. শফিকুর রহমান অভিযোগ করেন, ক্ষমতায় আসার মাত্র কয়েক মাসের মধ্যেই জনগণের সঙ্গে বিশ্বাসভঙ্গ করা হয়েছে। জনগণের প্রত্যাশা পূরণ না করে যদি আবারও ফ্যাসিবাদী আচরণের পুনরাবৃত্তি ঘটে, তবে তার পরিণতি ভালো হবে না বলেও সতর্ক করেন তিনি।
তিনি আরও বলেন, গ্যাস সংকট সৃষ্টি করে দাম বাড়ানো জনগণের দুর্ভোগ বাড়ানোর একটি ভুল নীতি। পাশাপাশি অতীতের লুটপাটের ধারাবাহিকতা এখনো অব্যাহত রয়েছে বলেও অভিযোগ করেন।
বক্তব্যের শেষাংশে জামায়াত আমির বলেন, তাদের লক্ষ্য একটি কলঙ্কমুক্ত, ফ্যাসিবাদমুক্ত, মানবিক এবং ইনসাফভিত্তিক বাংলাদেশ গড়ে তোলা। সেই লক্ষ্য অর্জিত না হওয়া পর্যন্ত আন্দোলন অব্যাহত থাকবে বলেও ঘোষণা দেন তিনি। একই সঙ্গে পরদিন জনদুর্ভোগ ইস্যুতে ঘোষিত কর্মসূচিতে অংশ নিতে উপস্থিত নেতাকর্মীদের আহ্বান জানান। সমাবেশে ১১ দলের শীর্ষ নেতারাও বক্তব্য দেন।
/এসএন