দেশে উন্নয়ন প্রকল্প বাস্তবায়নের নামে গত সাড়ে ১৫ বছরে বিপুল পরিমাণ বৈদেশিক ঋণ নিয়েছে আওয়ামী লীগ সরকার। বাংলাদেশ ব্যাংকের সাম্প্রতিক প্রতিবেদনের তথ্য অনুযায়ী, ২০০৯ সাল থেকে ২০২৪ সালের জুন পর্যন্ত সময়ে নতুন করে প্রায় ৮ হাজার ৬২ কোটি ডলার বিদেশি ঋণ নেওয়া হয়েছে। স্বাধীনতার পর দেশের মোট বৈদেশিক ঋণের ৭৮ শতাংশই নেওয়া হয়েছে এই সময়কালে।
প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, ২০০৯ সালের শুরুতে দেশের মোট বৈদেশিক ঋণের পরিমাণ ছিল ২ হাজার ২৭৯ কোটি ডলার। আওয়ামী লীগ সরকারের বিদায়ের সময় ২০২৪ সালের জুনে তা বেড়ে দাঁড়ায় ১০ হাজার ৩৪১ কোটি ডলারে। একই সময়ে ডলারের দাম ৬৯ টাকা থেকে বেড়ে ১২০ টাকায় পৌঁছায়। কোনো কোনো সময়ে ব্যাংকগুলোতে ১৩২ টাকা দরেও ডলার বিক্রি হয়েছে।এদিকে বৈদেশিক ঋণের সুদের হারও উল্লেখযোগ্যভাবে বেড়েছে।
২০০৯ সালে যেখানে সুদের হার ছিল ৪ থেকে ৫ শতাংশ, বর্তমানে তা বেড়ে ৭ থেকে ৯ শতাংশে দাঁড়িয়েছে। ২০২২ থেকে ২০২৪ সালের বৈশ্বিক অর্থনৈতিক মন্দার সময়ে সুদের হার আরও বেড়েছিল। প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, মোট ঋণের প্রায় ৭৫ শতাংশই বাজারভিত্তিক সুদ ও বিনিময় হার নির্ভর। ফলে ঋণ পরিশোধের সময় ডলারের দাম ও আন্তর্জাতিক সুদের হার যত বাড়ছে, চাপও তত বাড়ছে।বাংলাদেশ ব্যাংকের তথ্য অনুযায়ী, আগে বছরে বৈদেশিক ঋণ বাবদ ১৫০ থেকে ২০০ কোটি ডলার পরিশোধ করতে হতো।
এখন সেই পরিমাণ বেড়ে গত অর্থবছরে প্রায় ৪৫০ কোটি ডলারে দাঁড়িয়েছে। চলতি অর্থবছরে এই অঙ্ক ৫০০ কোটি ডলার ছাড়িয়ে যাবে বলে আশঙ্কা করা হচ্ছে। ইতোমধ্যে চলতি অর্থবছরের মার্চ পর্যন্ত সরকারি খাতেই ৪০০ কোটি ডলার পরিশোধ করা হয়েছে।প্রতিবেদনে আরও বলা হয়েছে, বৈদেশিক ঋণ পরিশোধের চাপে দেশের বৈদেশিক মুদ্রার রিজার্ভ কমে যাচ্ছে। ২০২০ সালে ঋণের বিপরীতে রিজার্ভের অনুপাত ছিল ৬০ শতাংশ, যা বর্তমানে নেমে এসেছে ২৩ শতাংশে।
একই সঙ্গে মধ্যপ্রাচ্যের যুদ্ধের কারণে জ্বালানি তেল ও আমদানি পণ্যের দাম বেড়ে যাওয়ায় পরিস্থিতি আরও জটিল হয়েছে।মাথাপিছু বৈদেশিক ঋণের পরিমাণও বেড়েছে উল্লেখযোগ্যভাবে। ২০০৯ সালে যেখানে মাথাপিছু বৈদেশিক ঋণ ছিল ১৬৯ ডলার, সেখানে আওয়ামী লীগ সরকারের শেষ সময়ে তা বেড়ে দাঁড়ায় ৬০৭ ডলারে।
২০২৫ সালের ডিসেম্বরে এই অঙ্ক ৬৫৭ ডলারে পৌঁছেছে বলে প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়েছে।সংশ্লিষ্টদের অভিযোগ, নেওয়া ঋণের বড় একটি অংশ উৎপাদনমুখী বা বৈদেশিক মুদ্রা আয়কারী খাতে ব্যয় না হয়ে স্থানীয় মুদ্রানির্ভর প্রকল্পে ব্যয় হয়েছে। এমনকি কিছু অর্থ বিদেশে পাচারও হয়েছে বলে অভিযোগ রয়েছে। ফলে ঋণের বিপরীতে প্রত্যাশিত অর্থনৈতিক সুফল পাওয়া যায়নি। বরং এখন ঋণ পরিশোধের চাপ সরাসরি সাধারণ মানুষের ওপর এসে পড়ছে।
বর্তমানে রাজস্ব আয় কমে যাওয়ায় সরকার স্থানীয়ভাবে ঋণ নিয়ে ডলার কিনে বিদেশি ঋণ পরিশোধ করছে। অর্থনীতিবিদদের মতে, পরিকল্পনাহীন ঋণ গ্রহণ ও দুর্বল ব্যবস্থাপনার কারণে দেশের অর্থনীতিতে দীর্ঘমেয়াদি চাপ তৈরি হয়েছে।