• ঢাকা
  • সোমবার, ১৯ অক্টোবর ২০২৬, ০৫:৩৩ এএম


সাহিল খানকে টেনেহিঁচড়ে থানায় নিয়ে নির্যাতন ভারতীয় পুলিশের‘তুই মুসলিম, তুই কেন প্রতিবাদে অংশ নিচ্ছিস?’

দি পালস বিডি অনলাইন ডেস্ক
আপডেট টাইম: ১৭ অক্টোবর ২০২৬ ৬:০৮ এএম

‘তুই মুসলিম, তুই কেন প্রতিবাদে?’—সাহিলকে চুল ধরে থানায় নেওয়ার অভিযোগ পুলিশের বিরুদ্ধেভারতের আসাম রাজ্যের গুয়াহাটিতে নারী নির্যাতনের বিরুদ্ধে আয়োজিত প্রতিবাদ কর্মসূচিতে অংশ নেওয়ার কয়েক ঘণ্টার মধ্যেই পুলিশের হাতে আটক, শারীরিক নির্যাতন ও প্রাণনাশের হুমকির শিকার হওয়ার অভিযোগ করেছেন সাহিল খান (২০) নামের এক মুসলিম ছাত্র। তিনি স্টুডেন্টস ফেডারেশন অব ইন্ডিয়ার (এসএফআই) একজন কর্মী। গত ১৩ অক্টোবরের এ ঘটনার পর রাত প্রায় ৯টার দিকে তাকে পানবাজার থানা থেকে মুক্তি দেওয়া হয়।সাহিলের অভিযোগ, আটক অবস্থায় পুলিশ সদস্যরা তাকে ধর্মীয় বিদ্বেষমূলক গালিগালাজ করেন। একই সঙ্গে নারী নির্যাতনের বিরুদ্ধে আয়োজিত কর্মসূচিতে অংশ নেওয়া নিয়ে তাকে অপমানজনক প্রশ্ন করা হয়।উন্মুক্ত বিশ্ববিদ্যালয়ের বিএ প্রথম সেমিস্টারের শিক্ষার্থী সাহিল ‘উইমেন এগেইনস্ট ভায়োলেন্স কালেক্টিভ’-এর ব্যানারে আয়োজিত ‘উইমেনস ফ্রিডম মার্চ’-এ অংশ নিয়েছিলেন। কর্মসূচি শেষ হওয়ার প্রায় ৩০ মিনিট পর নেহেরু পার্ক থেকে প্রায় ২০০ মিটার দূরে পুলিশের বাধার মুখে পড়েন তিনি।মাকতুব মিডিয়াকে দেওয়া সাক্ষাৎকারে সাহিল জানান, গুয়াহাটিতে নারীদের ওপর ক্রমবর্ধমান অপরাধের বিরুদ্ধে সচেতন নাগরিক হিসেবে তিনি প্রতিবাদে অংশ নিয়েছিলেন। কর্মসূচি শেষে বন্ধুদের সঙ্গে ফেরার পথে একটি পুলিশি গাড়ি তাদের পথ আটকায়।সাহিল বলেন, “শহরে নারীদের ওপর বেড়ে চলা অপরাধের বিরুদ্ধে সচেতন নাগরিক হিসেবে আমি প্রতিবাদে অংশ নিয়েছিলাম। বন্ধুদের সঙ্গে ফেরার পথে সমাবেশস্থল থেকে ২০০ মিটার দূরে একটি পুলিশি গাড়ি আমাদের পথ আটকায়।”তার ভাষ্য অনুযায়ী, প্রথমে পুলিশ তার স্কুটারের কাগজপত্র দেখতে চায়। প্রয়োজনীয় কাগজপত্র দেখানোর পরও তাকে কেন আটক করা হচ্ছে, সে বিষয়ে কোনো সুনির্দিষ্ট কারণ জানানো হয়নি। একপর্যায়ে তাকে জোরপূর্বক পুলিশের গাড়িতে তোলার চেষ্টা করা হয়।সাহিলের অভিযোগ, আটকের কারণ জানতে চেয়ে তিনি যেতে আপত্তি জানালে একজন পুলিশ কর্মকর্তা ও গাড়ির চালক তার চুল ধরে টেনেহিঁচড়ে গাড়িতে তোলেন।তিনি আরও অভিযোগ করেন, পুলিশের গাড়ির ভেতরে তাকে মারধর করা হয়। এ সময় মুসলিম হয়েও কেন তিনি প্রতিবাদ কর্মসূচিতে অংশ নিয়েছেন, তা নিয়ে প্রশ্ন তোলা হয়।পরে তাকে পানবাজার থানার পেছনের দরজা দিয়ে ভেতরে নিয়ে যাওয়া হয় বলে অভিযোগ করেন সাহিল। সেখানে তাকে অপমানজনক ভাষায় গালিগালাজ করার পাশাপাশি গুম ও হত্যার হুমকিও দেওয়া হয় বলে তার দাবি।সাহিল বলেন, “পুলিশ সদস্যরা আমাকে বারবার ‘মিঞা’ বলে ডাকছিল। একজন হুমকি দিয়ে বলে, ‘তোকে গুম করে দেব’, আরেকজন বলে, ‘তোকে মেরে ফেলব’। তারা বলছিল, ‘তুই মুসলিম, তুই কেন প্রতিবাদে অংশ নিচ্ছিস?’—যেন মুসলিমদের প্রতিবাদ করারও অধিকার নেই।”ঘটনায় ক্ষোভ প্রকাশ করে ২০ বছর বয়সী এই শিক্ষার্থী প্রশ্ন তোলেন, নারীদের প্রতি সহিংসতার বিচার চাওয়া কি অপরাধ, নাকি মুসলিম হওয়াটাই অপরাধ? তার দাবি, ওই সমাবেশে দুই শতাধিক মানুষ অংশ নিয়েছিলেন। কিন্তু তাদের মধ্যে শুধু তাকেই লক্ষ্যবস্তু করা হয়েছে।সাহিলের সহকর্মী ও প্রত্যক্ষদর্শী মনিরুল খানও ঘটনার সত্যতা নিশ্চিত করেছেন বলে প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়েছে।আটকের তথ্য প্রথমে অস্বীকার, পরে স্বীকারের অভিযোগঘটনার পর সাহিলের বন্ধুরা তার খোঁজ নিতে থানায় গেলে পুলিশ প্রথমে তাকে আটক করার কথা অস্বীকার করে বলে অভিযোগ উঠেছে। পরে থানা প্রাঙ্গণে প্রতিবাদকারীরা জড়ো হয়ে চাপ সৃষ্টি করলে পুলিশ স্বীকার করে যে সাহিলকে পেছনের দরজা দিয়ে ভেতরে আনা হয়েছিল।এসএফআইয়ের রাজ্য যুগ্ম সম্পাদক ও কর্মসূচির অন্যতম আয়োজক উৎপলা দাস জানান, সাহিলের খোঁজে তারা কয়েকটি থানায় যোগাযোগ করেন। পরে জানতে পারেন, তাকে পানবাজার থানায় রাখা হয়েছে।উৎপলা দাসের ভাষ্য অনুযায়ী, পুলিশ প্রথমে বেপরোয়াভাবে গাড়ি চালানোর অভিযোগে সাহিলকে আটক করার কথা জানায়। তবে আন্দোলনকারীরা প্রতিবাদ জানালে তাকে ছেড়ে দিতে বাধ্য হয়।তিনি বলেন, “সাহিল আমাদের জানিয়েছে, তাকে গুম করে দেওয়ার এবং হত্যার হুমকি দেওয়া হয়েছিল। পুলিশ কর্মকর্তা প্রথমে সাম্প্রদায়িক গালাগালির কথা অস্বীকার করলেও পরে দাবি করেন, সাহিলের নামের পেছনে ‘কালাম মিঞা’ যুক্ত থাকায় তাকে ‘মিঞা’ বলা হয়েছে। অথচ তার নাম সাহিল খান। পুলিশ আগে থেকেই তার ওপর নজর রাখছিল কিংবা তার পরিচয় নিয়ে উদ্দেশ্যপ্রণোদিত আচরণ করেছে।”উৎপলা দাস আরও জানান, এ ঘটনার বিচার চেয়ে তারা আইনি পদক্ষেপ নেবেন। তার মতে, বিষয়টি শুধু সাহিল খানের ব্যক্তিগত নিরাপত্তার মধ্যে সীমাবদ্ধ নয়; এটি মুসলিম সম্প্রদায়ের নিরাপত্তা ও মৌলিক অধিকারের সঙ্গেও সম্পর্কিত।নারী নির্যাতনের বিরুদ্ধে ‘ফ্রিডম মার্চ’গত ১৩ অক্টোবর গুয়াহাটির নেহেরু পার্কের কাছে নারী নির্যাতন বন্ধ এবং লিঙ্গসমতা প্রতিষ্ঠার দাবিতে ‘উইমেনস ফ্রিডম মার্চ’ আয়োজন করা হয়।সম্প্রতি গুয়াহাটিতে মাত্র ১৫ দিনের ব্যবধানে যৌন সহিংসতার দুটি ঘটনায় তরুণীদের প্রাণহানির প্রতিবাদে এ কর্মসূচির ডাক দেওয়া হয়েছিল।প্রতিবেদন অনুযায়ী, কর্মসূচি চলাকালে পুলিশের একটি বড় দল সেখানে উপস্থিত হয়ে অনুমতির অজুহাতে পদযাত্রা আটকে দেয়। পরে আয়োজকেরা সমাবেশস্থলেই সংক্ষিপ্ত প্রতিবাদ কর্মসূচি শেষ করেন।সাহিল খানের আটকের ঘটনা প্রকাশ্যে আসার পর মানবাধিকারকর্মী ও প্রতিবাদকারীরা এর নিন্দা জানিয়েছেন। তারা ঘটনাটিকে ধর্মীয় বৈষম্য ও উদ্দেশ্যপ্রণোদিত আচরণের অভিযোগ হিসেবে দেখছেন।তবে পুলিশের বিরুদ্ধে ওঠা এসব অভিযোগের বিষয়ে সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষের বক্তব্য প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়নি।

/বিএসএস