• ঢাকা
  • শুক্রবার, ১৮ সেপ্টেম্বর ২০২৬, ০৪:১৮ এএম


বিমানের টিকিটের টাকা ছিল না, ভালোবাসার টানে ভারত থেকে সাইকেলে সুইডেন

দি পালস বিডি অনলাইন ডেস্ক
আপডেট টাইম: ১৮ আগস্ট ২০২৬ ৯:৪৩ পিএম

ভালোবাসার মানুষটি ফিরে গেছেন হাজার হাজার কিলোমিটার দূরের দেশ সুইডেনে। কিন্তু বিমানের টিকিট কেনার সামর্থ্য ছিল না। তাই ১৯৭৭ সালে ভারতীয় শিল্পী পি কে মহানন্দিয়া এমন এক সিদ্ধান্ত নিয়েছিলেন, যা কয়েক দশক পরও বিশ্বের আলোচিত প্রেমকাহিনিগুলোর একটি হয়ে আছে। নিজের জিনিসপত্র বিক্রি করে একটি পুরোনো সাইকেল কিনে তিনি রওনা দিয়েছিলেন সুইডেনে থাকা শার্লট ফন শেডভিনের কাছে।তাদের পরিচয় অবশ্য আরও আগে। ১৯৭৫ সালে সুইডেন থেকে ভারত ভ্রমণে এসেছিলেন শার্লট। দিল্লির কনট প্লেসে তখন মানুষের প্রতিকৃতি এঁকে পরিচিতি পাচ্ছিলেন মহানন্দিয়া। সেখানেই তার সঙ্গে শার্লটের পরিচয় হয়। মহানন্দিয়ার কাছে নিজের প্রতিকৃতি আঁকাতে এসেছিলেন শার্লট। সেই পরিচয়ই অল্প সময়ের মধ্যে ভালোবাসার সম্পর্কে রূপ নেয়।সম্পর্ক গভীর হওয়ার পর দুজন বিয়ের সিদ্ধান্ত নেন। কিন্তু একসময় শার্লটকে সুইডেনে ফিরে যেতে হয়। মহানন্দিয়া থেকে যান ভারতে। দূরত্ব তৈরি হলেও তাদের যোগাযোগ বন্ধ হয়নি। চিঠির মাধ্যমে তারা সম্পর্ক ধরে রাখেন।একপর্যায়ে আর অপেক্ষা করতে চাননি মহানন্দিয়া। কিন্তু সুইডেনে যাওয়ার বিমানের টিকিট কেনার মতো অর্থ তার হাতে ছিল না। শার্লটের কাছ থেকে ভ্রমণের খরচ নেওয়ার প্রস্তাবও তিনি গ্রহণ করেননি বলে বিভিন্ন সময়ে দেওয়া সাক্ষাৎকারে জানিয়েছেন।শেষ পর্যন্ত নিজের জিনিসপত্র বিক্রি করে একটি সেকেন্ডহ্যান্ড সাইকেল কেনেন তিনি। ১৯৭৭ সালের ২২ জানুয়ারি দিল্লি থেকে শুরু হয় তার দীর্ঘ যাত্রা।প্রতিদিন গড়ে প্রায় ৭০ কিলোমিটার পথ পাড়ি দিতেন মহানন্দিয়া। পাকিস্তান, আফগানিস্তান, ইরান ও তুরস্ক হয়ে তিনি ইউরোপের দিকে এগিয়ে যান। তবে পুরো যাত্রাপথ সাইকেলে অতিক্রম করেননি। সুযোগ পেলে অন্য যানবাহনেও কিছু পথ পাড়ি দিয়েছেন। ইউরোপে পৌঁছানোর পর ভিয়েনা থেকে ট্রেনে সুইডেনের গোথেনবার্গে যান তিনি।এই দীর্ঘ যাত্রায় সবচেয়ে বড় চ্যালেঞ্জ ছিল অর্থের সংকট। সঙ্গে খুব বেশি টাকা ছিল না। তখন কাজে আসে তার ছবি আঁকার দক্ষতা। বিভিন্ন জায়গায় মানুষের প্রতিকৃতি এঁকে অর্থ উপার্জন করতেন তিনি। কেউ তাকে টাকা দিতেন, আবার কেউ খাবার কিংবা রাতে থাকার জায়গা করে দিতেন।চার মাসের বেশি সময় ধরে চলা সেই যাত্রা শেষে ১৯৭৭ সালের মে মাসে তিনি ইউরোপে পৌঁছান। এরপর সুইডেনে গিয়ে আবার দেখা হয় শার্লটের সঙ্গে।পরে সেই সময়ের স্মৃতিচারণ করে মহানন্দিয়া বলেছিলেন, দীর্ঘ যাত্রায় তার পায়ে ব্যথা হতো, ক্লান্তিও আসত। কিন্তু শার্লটের সঙ্গে আবার দেখা হবে—এই ভাবনাই তাকে সামনে এগিয়ে যেতে অনুপ্রাণিত করত।সুইডেনে পৌঁছানোর পরও তাদের সামনে বাধা ছিল। ভিন্ন দেশ, সংস্কৃতি ও সামাজিক পটভূমির এই সম্পর্ক শুরুতে সহজভাবে গ্রহণ করা হয়নি। তবে শেষ পর্যন্ত তারা একসঙ্গে জীবন শুরু করেন এবং সুইডেনেই সংসার গড়ে তোলেন।তাদের দুই সন্তান রয়েছে। কয়েক দশক পেরিয়ে গেলেও মহানন্দিয়া ও শার্লট একসঙ্গেই আছেন। সুইডেনে শিল্পী হিসেবেও নিজের কাজ চালিয়ে গেছেন মহানন্দিয়া।বছরের পর বছর ধরে তাদের প্রেমের গল্প নিয়ে আন্তর্জাতিক গণমাধ্যমে প্রতিবেদন প্রকাশ হয়েছে, লেখা হয়েছে বইও। তবে নিজের সেই দীর্ঘ সাইকেলযাত্রাকে মহানন্দিয়া কখনো বীরত্বের ঘটনা হিসেবে দেখেননি।তার কাছে বিষয়টি ছিল খুবই সহজ—সাইকেলকে ভালোবেসে তিনি এত দূর যাননি, গিয়েছিলেন ভালোবাসার মানুষটির কাছে পৌঁছাতে।

/বিএসএস