• ঢাকা
  • বুধবার, ০৭ অক্টোবর ২০২৬, ০৯:২৫ পিএম


যশোরে বদলে যাচ্ছে শিক্ষার চিত্র, স্কুল ছাড়িয়ে বাড়ছে মাদ্রাসায় ভর্তি!

দি পালস বিডি অনলাইন ডেস্ক
আপডেট টাইম: ২৫ জুলাই ২০২৬ ৮:৩১ পিএম

যশোরে শিক্ষাব্যবস্থায় নীরবে বড় ধরনের পরিবর্তন দেখা যাচ্ছে। সরকারি প্রাথমিক ও মাধ্যমিক বিদ্যালয়ে শিক্ষার্থীর সংখ্যা ধারাবাহিকভাবে কমলেও ইবতেদায়ি ও দাখিল মাদ্রাসাগুলোতে বাড়ছে ভর্তি। জেলা প্রাথমিক ও মাধ্যমিক শিক্ষা অফিসের ২০২৫ ও ২০২৬ সালের তথ্য বিশ্লেষণে এমন চিত্র উঠে এসেছে।

জেলা প্রাথমিক শিক্ষা অফিসের তথ্য অনুযায়ী, ২০২৬ সালে যশোরের ১ হাজার ২৮৯টি সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ে মোট শিক্ষার্থী রয়েছে ২ লাখ ৭৪ হাজার ১৮১ জন। আগের বছর এ সংখ্যা ছিল ২ লাখ ৮২ হাজার ১২ জন। অর্থাৎ এক বছরে সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ে শিক্ষার্থী কমেছে ৭ হাজার ৮৩১ জন।

প্রথম শ্রেণিতে নতুন ভর্তির সংখ্যাও কমেছে। ২০২৫ সালে যেখানে ভর্তি হয়েছিল ৫৭ হাজার ৬৩৮ জন, সেখানে ২০২৬ সালে তা নেমে এসেছে ৫৭ হাজার ১০০ জনে। অর্থাৎ নতুন ভর্তি কমেছে ৫৩৮ জন।

অন্যদিকে ইবতেদায়ি মাদ্রাসাগুলোতে একই সময়ে উল্লেখযোগ্য হারে শিক্ষার্থী বেড়েছে। ২০২৫ সালে মোট শিক্ষার্থী ছিল ৬৮ হাজার ৭৭ জন। ২০২৬ সালে তা বেড়ে হয়েছে ৭২ হাজার ৪৪২ জন। অর্থাৎ এক বছরে শিক্ষার্থী বেড়েছে ৪ হাজার ৩৬৫ জন। একই সময়ে প্রথম শ্রেণিতে নতুন ভর্তি হয়েছে ১৫ হাজার ৮০৫ জন, যা আগের বছরের তুলনায় ১ হাজার ২৩৩ জন বেশি।

মাধ্যমিক পর্যায়েও একই প্রবণতা দেখা গেছে। জেলা মাধ্যমিক শিক্ষা অফিসের তথ্য অনুযায়ী, ২০২৫ সালে জেলার ৫৫৩টি সাধারণ শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে বাংলা ভার্সনে শিক্ষার্থী ছিল ২ লাখ ২৩ হাজার ৬৫৭ জন। ২০২৬ সালে (দশম শ্রেণি বাদে) এ সংখ্যা কমে দাঁড়িয়েছে ১ লাখ ৭৭ হাজার ৫৮৩ জনে। ইংরেজি ভার্সনেও শিক্ষার্থী কমেছে। ২০২৫ সালে যেখানে শিক্ষার্থী ছিল ১ হাজার ৫ জন, সেখানে ২০২৬ সালে নবম শ্রেণি পর্যন্ত তা নেমে এসেছে ৭৫৫ জনে।

কারিগরি ও ভোকেশনাল শিক্ষাতেও নিম্নমুখী প্রবণতা দেখা গেছে। ২০২৫ সালে ষষ্ঠ থেকে দশম শ্রেণি পর্যন্ত ভোকেশনাল ট্রেডে শিক্ষার্থী ছিল ১৬ হাজার ৬৬০ জন। ২০২৬ সালে অষ্টম শ্রেণি পর্যন্ত সেই সংখ্যা নেমে এসেছে ১ হাজার ৩৫০ জনে। এসএসসি ভোকেশনালেও শিক্ষার্থী কমেছে।

অন্যদিকে দাখিল মাদ্রাসায় ২০২৫ সালে ষষ্ঠ থেকে দশম শ্রেণি পর্যন্ত শিক্ষার্থী ছিল ৭৫ হাজার ৫৭৯ জন। ২০২৬ সালে দশম শ্রেণির তথ্য বাদে মোট শিক্ষার্থী রয়েছে ৫৮ হাজার ৯৩৮ জন এবং নতুন ভর্তি হয়েছে ১৬ হাজার ৩৫৩ জন। তবে দুই বছরের তথ্য উপস্থাপনের ধরন ভিন্ন হওয়ায় সরাসরি তুলনা করা কঠিন বলে জানিয়েছেন সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তারা।

মাদ্রাসা শিক্ষক আনিসুর রহমান বলেন, সাধারণ শিক্ষার তুলনায় মাদ্রাসায় ভালো ফল করা তুলনামূলক সহজ হওয়ায় অনেক অভিভাবক সন্তানদের সেখানে ভর্তি করাচ্ছেন। পাশাপাশি আবাসিক মাদ্রাসার সংখ্যা বৃদ্ধি পাওয়ায়ও এ প্রবণতা বাড়ছে।

যশোর জেলা প্রাথমিক শিক্ষা কর্মকর্তা জি. এম. আলমগীর কবির বলেন, স্কুল ফিডিং কর্মসূচির মাধ্যমে সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ে শিক্ষার্থী ধরে রাখার চেষ্টা চলছে। তবে অনেক শিক্ষার্থী পরবর্তীতে বিদ্যালয় পরিবর্তন করে বা ঝরে পড়ে। মাদ্রাসামুখী হওয়ার বিষয়টি এলাকার পরিবেশ, প্রতিষ্ঠানের মান এবং অভিভাবকদের সিদ্ধান্তের ওপর নির্ভর করে বলেও মন্তব্য করেন তিনি।

শিক্ষাবিদ ও উপশহর ডিগ্রি কলেজের সাবেক অধ্যক্ষ শাহিন ইকবালের মতে, এই পরিবর্তনের পেছনে ধর্মীয় দৃষ্টিভঙ্গির পাশাপাশি অর্থনৈতিক বাস্তবতাও গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখছে। তিনি বলেন, সাধারণ শিক্ষার তুলনায় মাদ্রাসায় তুলনামূলক সহজে ভালো ফল করার সুযোগ এবং দারিদ্র্যের কারণে অনেক অভিভাবক সন্তানদের মাদ্রাসায় ভর্তি করাচ্ছেন।

এদিকে জেলায় দ্রুত বিস্তার লাভ করা কিন্ডারগার্টেন, প্রি-ক্যাডেট স্কুল, আবাসিক মাদ্রাসা ও এতিমখানার শিক্ষার্থীদের বিষয়ে কোনো সমন্বিত সরকারি তথ্যভাণ্ডার নেই। ফলে জেলার প্রকৃত শিক্ষা পরিস্থিতির পূর্ণাঙ্গ মূল্যায়ন কঠিন হয়ে পড়েছে।

শিক্ষা সংশ্লিষ্টদের মতে, সাধারণ শিক্ষাকে আরও আধুনিক, আকর্ষণীয় ও কর্মমুখী করার পাশাপাশি সব ধরনের শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানকে একটি সমন্বিত তথ্যব্যবস্থার আওতায় এনে কার্যকর নজরদারি নিশ্চিত করা না গেলে ভবিষ্যতে শিক্ষাব্যবস্থায় এই ভারসাম্যহীনতা আরও প্রকট হতে পারে।

/এএসএফ