প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানের সাম্প্রতিক চীন সফরে বাংলাদেশ থেকে কাঁঠাল রপ্তানির বিষয়ে একটি সমঝোতা স্মারক (এমওইউ) স্বাক্ষর হয়েছে। বিশ্বের অন্যতম বৃহৎ উৎপাদন ও রপ্তানিকারক দেশ হওয়া সত্ত্বেও চীন কেন বাংলাদেশ থেকে কাঁঠাল আমদানিতে আগ্রহী—এ প্রশ্ন ঘিরে বিভিন্ন মহলে আলোচনা শুরু হয়েছে। তবে সংশ্লিষ্টরা বলছেন, বাংলাদেশি কাঁঠালের প্রতি চীনের আগ্রহ নতুন কোনো বিষয় নয়।
রোববার (২৮ জুন) বিবিসি বাংলার এক প্রতিবেদনে এ তথ্য উঠে এসেছে।
এর আগে, গত বছরের মে মাসে বাংলাদেশ থেকে প্রথমবারের মতো কাঁচা আম আমদানি শুরু করার সময়ই কাঁঠাল ও পেয়ারাসহ আরও কিছু কৃষিপণ্য আমদানিতে আগ্রহ প্রকাশ করেছিল চীন।
প্রধানমন্ত্রীর কার্যালয়ের মুখপাত্র মাহদী আমিন জানান, প্রধানমন্ত্রীর এবারের চীন সফরে দুই দেশের বাণিজ্য ঘাটতি কমানোর বিষয়টি বিশেষ গুরুত্ব পেয়েছে। সফরকালে অবকাঠামো, দুর্যোগ ব্যবস্থাপনা, ডিজিটাল অর্থনীতিসহ বিভিন্ন খাতে মোট ১৭টি সমঝোতা স্মারক স্বাক্ষর হয়েছে। এর মধ্যে বাংলাদেশ থেকে কাঁঠাল রপ্তানির বিষয়টিও অন্তর্ভুক্ত রয়েছে।
সংশ্লিষ্টদের মতে, এই সমঝোতার ফলে কাঁঠাল রপ্তানির প্রক্রিয়া এখন আনুষ্ঠানিক অনুমোদনের গুরুত্বপূর্ণ ধাপে পৌঁছেছে।
কৃষি অর্থনীতিবিদ ও রপ্তানিকারকদের ভাষ্য, কৃষিনির্ভর দেশ হওয়া সত্ত্বেও বাংলাদেশ এখনো কৃষিপণ্য রপ্তানিতে প্রত্যাশিত অবস্থানে পৌঁছাতে পারেনি। চীনের মতো বড় বাজারে কাঁঠাল বা কাঁঠালজাত পণ্য রপ্তানির সুযোগ তৈরি হলে দেশের কৃষি অর্থনীতিতে নতুন সম্ভাবনার দ্বার খুলবে। একই সঙ্গে অন্যান্য কৃষিপণ্যের জন্যও আন্তর্জাতিক বাজার সম্প্রসারণে এটি ইতিবাচক ভূমিকা রাখতে পারে। তবে পণ্যের মান, প্রক্রিয়াজাতকরণ ও আধুনিক প্যাকেজিং সক্ষমতার ঘাটতিকে বড় চ্যালেঞ্জ হিসেবে দেখছেন বিশেষজ্ঞরা।
বাংলাদেশ কৃষি বিশ্ববিদ্যালয়ের কৃষি অর্থনীতি ও গ্রামীণ সমাজবিজ্ঞান অনুষদের ডিন ড. মোহাম্মদ আমিরুল ইসলাম বলেন, ‘আমাদের টোটাল কৃষি খাতের রপ্তানি এখনো তেমন ভালো নয়। আমরা যতটুকু রপ্তানি করি তার বেশিরভাগই এথনিক মার্কেটে।’
তিনি আরও বলেন, কৃষিপণ্যের গুণগত মান আন্তর্জাতিক মানে উন্নীত করতে না পারায় ইউরোপীয় বাজারেও বাংলাদেশ এখনো শক্ত অবস্থান তৈরি করতে পারেনি।
বিশেষজ্ঞদের মতে, নির্দিষ্ট জাতিগত বা অভিবাসী জনগোষ্ঠীকেন্দ্রিক বাজারকে এথনিক মার্কেট বলা হয়।
বিশ্বব্যাপী কাঁঠালের বাজারের পরিমাণ কয়েকশ কোটি মার্কিন ডলারের। ২০১২ সালে বিশ্বে কাঁঠাল রপ্তানির বাজার ছিল প্রায় ২০০ কোটি মার্কিন ডলার, যা ২০২৩ সালে বেড়ে দাঁড়িয়েছে ৩৭০ কোটি ডলারে।
বর্তমানে ভিয়েতনাম, থাইল্যান্ড, নেদারল্যান্ডস, চীন ও ইকুয়েডর মিলে বৈশ্বিক কাঁঠাল রপ্তানির প্রায় ৬০ শতাংশের সঙ্গে যুক্ত। এর মধ্যে এককভাবে ভিয়েতনামের দখলে রয়েছে বিশ্ববাজারের প্রায় ২৫ শতাংশ।
অন্যদিকে, বিশ্বের সবচেয়ে বড় কাঁঠাল ভোক্তা ও আমদানিকারক দেশ হলো চীন। দেশটি তাদের চাহিদার বড় অংশ পূরণ করে ভিয়েতনাম ও থাইল্যান্ড থেকে।
বাংলাদেশ কাঁঠাল উৎপাদনে বিশ্বের অন্যতম শীর্ষ দেশ হলেও আন্তর্জাতিক বাজারে দেশের অংশগ্রহণ এখনো খুবই সীমিত।
জাতিসংঘের খাদ্য ও কৃষি সংস্থার (এফএও) তথ্য অনুযায়ী, বৈশ্বিক কাঁঠাল রপ্তানিতে বাংলাদেশের অংশ মাত্র ০.৩ শতাংশ। দেশের মোট কাঁঠাল রপ্তানির প্রায় ৭৬ শতাংশই যায় যুক্তরাজ্যে। এছাড়া ইতালি, কানাডা ও ফ্রান্স মিলিয়ে এই চারটি দেশেই বাংলাদেশের মোট কাঁঠাল রপ্তানির প্রায় ৮৫ শতাংশ চলে যায়। ফলে চীনের বিশাল বাজার বাংলাদেশের জন্য নতুন সম্ভাবনার দ্বার খুলে দিতে পারে।
বাংলাদেশে প্রতি বছর বিপুল পরিমাণ কাঁঠাল উৎপাদিত হলেও অভ্যন্তরীণ বাজারে চাহিদা সীমিত এবং পর্যাপ্ত প্রক্রিয়াজাতকরণ সুবিধা না থাকায় উৎপাদিত ফলের বড় অংশই নষ্ট হয়ে যায়।
বাংলাদেশ কৃষি গবেষণা ইনস্টিটিউটের ফল গবেষণা কেন্দ্রের তথ্য অনুযায়ী, দেশে বছরে প্রায় ৮ থেকে ১০ লাখ টন কাঁঠাল উৎপাদিত হয়। কিন্তু পর্যাপ্ত রপ্তানি সুযোগ ও অভ্যন্তরীণ চাহিদার অভাবে উৎপাদিত কাঁঠালের ৪৫ শতাংশেরও বেশি প্রতি বছর নষ্ট হয়ে যায়।
ফল গবেষণা কেন্দ্রের মুখ্য বৈজ্ঞানিক কর্মকর্তা ড. মো. শফিকুল ইসলাম বলেন, ‘বাংলাদেশে উৎপাদিত ফলের মধ্যে আম প্রথম, কলা দ্বিতীয় এবং তৃতীয় কাঁঠাল।’
তিনি জানান, বাংলাদেশ কৃষি গবেষণা ইনস্টিটিউট এখন পর্যন্ত কাঁঠালের ছয়টি উন্নত জাত উদ্ভাবন করেছে। পাশাপাশি বিশ্বে কাঁঠাল উৎপাদনে বাংলাদেশের অবস্থান দ্বিতীয়।
বাংলাদেশের মোট রপ্তানি আয়ের বড় অংশ আসে তৈরি পোশাক খাত থেকে। কৃষিনির্ভর দেশ হলেও নীতিগত ও আইনগত বিভিন্ন জটিলতার কারণে কৃষিপণ্য রপ্তানি এখনো প্রত্যাশিত পর্যায়ে পৌঁছাতে পারেনি।
বিশেষজ্ঞরা বলছেন, আন্তর্জাতিক বাজারে সফলভাবে কৃষিপণ্য রপ্তানি করতে হলে উৎপাদন থেকে শুরু করে সংরক্ষণ, প্রক্রিয়াজাতকরণ ও পরিবহন—সব ক্ষেত্রেই আন্তর্জাতিক মান নিশ্চিত করতে হবে।
বাংলাদেশ অ্যাগ্রো-বেজড প্রোডাক্ট প্রডিউসারস অ্যান্ড মার্চেন্ট অ্যাসোসিয়েশনের সভাপতি মোহাম্মদ রুহুল আমিন বলেন, ‘কাঁঠাল দিয়ে তৈরি পণ্য কয়েকটি দেশে রপ্তানি হচ্ছে, কিন্তু চীন কীভাবে নেবে সেটি হলো প্রশ্ন। কারণ কাঁঠাল সংরক্ষণ করা এবং পরিবহনের ক্ষেত্রে কিছু ঝুঁকি আছে।’
কৃষি অর্থনীতিবিদদের মতে, আন্তর্জাতিক বাজারে প্রতিযোগিতা করতে হলে পণ্যের মান উন্নয়ন, আধুনিক প্রসেসিং ও প্যাকেজিং সুবিধা বাড়াতে হবে। পাশাপাশি এ খাতে সরকারি বিনিয়োগও বৃদ্ধি প্রয়োজন।
তবে ড. মোহাম্মদ আমিরুল ইসলাম মনে করেন, চীনের সঙ্গে হওয়া এই সমঝোতা শুধু রপ্তানির সুযোগই তৈরি করবে না, বরং আধুনিক প্রযুক্তি শেখা এবং স্থানীয় বাজারে তা প্রয়োগের ক্ষেত্রেও গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখবে।
তিনি বলেন, ‘আমরা যখন সুযোগ পাই, তিনগুণ দাম পাই, তখন সবই দেশের বাইরে পাঠানোর চেষ্টা করি। দেশীয় চাহিদা এবং নিউট্রিশনকেও গুরুত্ব দিতে হবে।’
/এসএন