• ঢাকা
  • শনিবার, ১০ অক্টোবর ২০২৬, ১০:৪১ পিএম


এক বাবার ছয় সন্তানই ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে, ত্যাগে স্বপ্নপূরণ ছায়েদ উল্লাহর

দি পালস বিডি অনলাইন ডেস্ক
আপডেট টাইম: ১০ অক্টোবর ২০২৬ ৬:২০ পিএম

এক বাবার ছয় সন্তানই ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে, ত্যাগে স্বপ্নপূরণ ছায়েদ উল্লাহর

সীমিত আয়, নানা প্রতিকূলতা আর দীর্ঘদিনের ত্যাগ—কোনো কিছুই সন্তানদের উচ্চশিক্ষার স্বপ্ন পূরণের পথে বাধা হয়ে দাঁড়াতে পারেনি অবসরপ্রাপ্ত প্রাথমিক বিদ্যালয়ের শিক্ষক ছায়েদ উল্লাহর। নিজের জমিজমা বিক্রি করেও সন্তানদের পড়াশোনা চালিয়ে গেছেন তিনি। তাঁর সেই আত্মত্যাগের ফল মিলেছে অনন্য সাফল্যে। একে একে তাঁর ছয় সন্তানই ভর্তি হয়েছেন ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে। ছোট ছেলে আরাফাত হোসেনের ভর্তির মধ্য দিয়ে পূর্ণ হয়েছে এই শিক্ষকের দীর্ঘদিনের স্বপ্ন।লক্ষ্মীপুরের কমলনগর উপজেলার তোরাবগঞ্জ ইউনিয়নের ফাজিল মিয়ার হাট এলাকার ‘ছায়েদ মাস্টার বাড়ি’ এখন এই ব্যতিক্রমী সাফল্যের জন্য পরিচিত। ছায়েদ উল্লাহ নোয়াখালীর সুবর্ণচর উপজেলার দক্ষিণ ওয়াপদা সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ে টানা ৩০ বছর শিক্ষকতা করেছেন। সীমিত বেতনের ওপর নির্ভরশীল এই পরিবারে সন্তানদের পড়াশোনার ব্যয় বহন করা ছিল বেশ কঠিন। তবু শিক্ষার প্রতি গুরুত্ব কমাননি তিনি। প্রয়োজনে নিজের জমিজমা বিক্রি করে সন্তানদের লেখাপড়া চালিয়ে গেছেন।পরিবারটির ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে পড়ার সাফল্যের সূচনা হয় ২০০৭-০৮ শিক্ষাবর্ষে। ওই শিক্ষাবর্ষে ছায়েদ উল্লাহর বড় ছেলে শামসুল আলম দিপু বিশ্ববিদ্যালয়ের রাষ্ট্রবিজ্ঞান বিভাগে ভর্তি হন। পড়াশোনা শেষ করে তিনি ৩৫তম বিসিএসের মাধ্যমে সরকারি চাকরিতে যোগ দেন। বর্তমানে তিনি বাংলাদেশ ফাইন্যান্সিয়াল ইন্টেলিজেন্স ইউনিটের (বিএফআইইউ) পরিচালক হিসেবে দায়িত্ব পালন করছেন।দ্বিতীয় ছেলে শাহজাহান সিরাজ আল মামুন ২০১০-১১ শিক্ষাবর্ষে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের লোকপ্রশাসন বিভাগে ভর্তি হন। স্নাতক ও স্নাতকোত্তর সম্পন্ন করার পর তিনি কর্মসংস্থান ব্যাংকের হাজীগঞ্জ শাখায় জ্যেষ্ঠ কর্মকর্তা হিসেবে কর্মরত হন।তৃতীয় ছেলে আশরাফুল ইসলাম শহীদ বিশ্ববিদ্যালয়ের ইসলামের ইতিহাস ও সংস্কৃতি বিভাগ থেকে উচ্চশিক্ষা শেষ করেছেন। বর্তমানে তিনি বাংলাদেশ কৃষি ব্যাংকের লক্ষ্মীপুর আঞ্চলিক শাখায় জ্যেষ্ঠ কর্মকর্তা হিসেবে কর্মরত রয়েছেন।চতুর্থ ছেলে শরীফুল ইসলাম বিজয় ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের রাষ্ট্রবিজ্ঞান বিভাগ থেকে পড়াশোনা শেষ করে এখন বিসিএস পরীক্ষার প্রস্তুতি নিচ্ছেন। পরিবারের একমাত্র মেয়ে জান্নাতুল ফেরদৌস বর্তমানে বিশ্ববিদ্যালয়ের উইমেন অ্যান্ড জেন্ডার স্টাডিজ বিভাগে অধ্যয়নরত।সবশেষে এই সাফল্যের তালিকায় যুক্ত হয়েছেন ছোট ছেলে আরাফাত হোসেন। ২০২৫-২৬ শিক্ষাবর্ষে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের ‘এ’ ইউনিটের ভর্তি পরীক্ষায় উত্তীর্ণ হয়ে তিনি বিশ্ববিদ্যালয়ে ভর্তির সুযোগ পেয়েছেন। তাঁর ভর্তির মধ্য দিয়ে একই পরিবারের ছয় সন্তানেরই ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে পড়ার স্বপ্ন বাস্তবে রূপ নিয়েছে।এর আগে ২০২২ সালে পরিবারের পাঁচ সন্তানের ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে পড়ার খবর প্রকাশ্যে এলে তা দেশজুড়ে প্রশংসা কুড়ায়। তিন বছর পর ছোট ছেলে আরাফাতের ভর্তির মধ্য দিয়ে সেই অর্জনে যুক্ত হয়েছে নতুন অধ্যায়।পরিবারটির এই ধারাবাহিক সাফল্যের পেছনে বাবা ছায়েদ উল্লাহর পাশাপাশি মা শামীমা বেগমেরও রয়েছে দীর্ঘদিনের ত্যাগ, ধৈর্য ও একনিষ্ঠ প্রচেষ্টা। আর্থিক সীমাবদ্ধতার মধ্যেও সন্তানদের শিক্ষার প্রতি তাঁদের গুরুত্ব দেওয়ার ফলেই একে একে সবাই উচ্চশিক্ষার সুযোগ পেয়েছেন।স্থানীয় শিক্ষাবিদদের মতে, ছায়েদ উল্লাহর পরিবারের এই অর্জন সীমিত আয়ের পরিবারগুলোর সন্তানদের জন্য অনুপ্রেরণার উৎস হতে পারে।কমলনগরের একটি মাধ্যমিক বিদ্যালয়ের শিক্ষক সানা উল্লাহ সানু বলেন, “এটি কেবল ছয় সন্তানের ভর্তির গল্প নয়; এটি একজন শিক্ষকের নিষ্ঠা এবং শিক্ষাকে সবচেয়ে বড় সামাজিক বিনিয়োগ হিসেবে দেখার এক প্রোজ্জ্বল দৃষ্টান্ত।”কমলনগরের একটি স্থানীয় কলেজের অধ্যক্ষ মো. আরিফ হোসেন বলেন, “শিক্ষক ছায়েদ উল্লাহ ও তাঁর পরিবার প্রমাণ করেছেন, সততা, অদম্য ইচ্ছা ও সঠিক চেষ্টার সামনে অর্থনৈতিক সীমাবদ্ধতা কখনো বাধা হতে পারে না। একটি সীমিত আয়ের পরিবারের ছয় সন্তানই দেশের সেরা বিশ্ববিদ্যালয়ে পড়াশোনা করছে—এটি বাস্তবে রূপ নেওয়া এক রূপকথা।”ছায়েদ উল্লাহর পরিবারের এই গল্প শুধু ছয় সন্তানের বিশ্ববিদ্যালয়ে ভর্তির সাফল্য নয়; এটি সন্তানদের ভবিষ্যৎ গড়তে একজন শিক্ষক ও তাঁর স্ত্রীর দীর্ঘদিনের ত্যাগ, অধ্যবসায় এবং শিক্ষার প্রতি অটুট বিশ্বাসের প্রতিচ্ছবি।

/বিএসএস