ইট ভেঙে, কৃষিকাজ করে পড়াশোনা, সেই আমিনুল এখন বিসিএস শিক্ষা ক্যাডারশৈশবেই মায়ের স্নেহ থেকে বঞ্চিত হওয়া, অষ্টম শ্রেণিতে পড়ার সময় বাবাকে হারানো—জীবনের শুরুতেই একের পর এক কঠিন বাস্তবতার মুখোমুখি হতে হয়েছে আমিনুল হককে। অভাবের সংসারে নিজের পড়াশোনার খরচ জোগাতে কখনো ইট ভেঙেছেন, কখনো কৃষিকাজ করেছেন, আবার কখনো টিউশনি করে উপার্জন করেছেন। যে বয়সে অন্য শিশুরা খেলাধুলা আর আনন্দে মেতে থাকত, সেই বয়সেই তাঁকে ভাবতে হয়েছে নিজের ভবিষ্যৎ ও পড়াশোনা চালিয়ে যাওয়ার উপায় নিয়ে। নানা প্রতিকূলতা, নিরলস পরিশ্রম এবং মানুষের সহযোগিতাকে পুঁজি করে সেই আমিনুলই আজ বিসিএস শিক্ষা ক্যাডারে নিয়োগ পেয়েছেন। তাঁর এই সাফল্য কেবল ব্যক্তিগত অর্জন নয়, বরং দারিদ্র্যকে জয় করে স্বপ্ন পূরণের এক অনুপ্রেরণাদায়ী গল্প।আমিনুল হকের বাড়ি ময়মনসিংহের ফুলবাড়িয়া উপজেলার ভবানীপুর ইউনিয়নের কান্দানিয়া গ্রামে। তাঁর বাবা ওয়াজউদ্দিন মিয়া কৃষিকাজ করতেন। মা আমিনা খাতুনের সঙ্গে বাবার বিচ্ছেদের পর আমিনুল চাচা আবদুল খালেক ও চাচি মিনারা খাতুনের আশ্রয়ে বেড়ে ওঠেন। মাত্র সাত মাস বয়সে মায়ের সান্নিধ্য হারান তিনি। এরপর ২০১২ সালে অষ্টম শ্রেণিতে পড়ার সময় মারা যান তাঁর বাবা। ছোটবেলাতেই মা-বাবার স্নেহ ও সাহচর্য হারিয়ে অনিশ্চিত হয়ে পড়ে তাঁর জীবন। তবে চাচা-চাচি, দাদি ও ফুফুরা তাঁকে আগলে রেখে বড় করেছেন। তাঁদের ভালোবাসা ও সহযোগিতাই হয়ে ওঠে তাঁর বেড়ে ওঠার অন্যতম অবলম্বন।নিজের শৈশবের স্মৃতিচারণা করে আমিনুল হক বলেন, খুব ছোটবেলায় মা চলে গেছেন। অষ্টম শ্রেণিতে পড়ার সময় বাবা মারা যান। তাঁর কোনো ভাইবোন ছিল না। চাচা-চাচি, দাদি ও ফুফুরাই তাঁকে আগলে রেখেছেন। তাঁদের স্নেহ-ভালোবাসার মধ্যে প্রতিকূল পরিস্থিতির সঙ্গে লড়াই করে বড় হয়েছেন তিনি।শৈশবের কঠিন অভিজ্ঞতা আমিনুলকে অল্প বয়সেই জীবনের বাস্তবতা বুঝতে শিখিয়েছে। নিজের ভবিষ্যৎ গড়তে হলে পড়াশোনার বিকল্প নেই—এমন উপলব্ধি থেকেই লেখাপড়ার প্রতি আরও মনোযোগী হয়ে ওঠেন তিনি। কিন্তু স্বপ্ন পূরণের পথ মোটেও সহজ ছিল না। সংসারে আর্থিক সংকট থাকায় পড়াশোনার খরচ জোগাড় করাই ছিল তাঁর জন্য বড় চ্যালেঞ্জ। বই-খাতা কেনা, পরীক্ষার ফি দেওয়া কিংবা প্রয়োজনীয় পোশাকের ব্যবস্থা করতে গিয়ে তাঁকে বারবার কঠিন পরিস্থিতির মুখোমুখি হতে হয়েছে।যখন তাঁর সমবয়সীরা মাঠে খেলাধুলা করত, বন্ধুদের সঙ্গে বেড়াতে যেত কিংবা অবসর সময় আনন্দে কাটাত, তখন আমিনুলকে ব্যস্ত থাকতে হতো উপার্জনের চিন্তায়। কখনো ইট ভেঙে, কখনো কৃষিকাজ করে নিজের পড়াশোনার খরচ জোগাড়ের চেষ্টা করেছেন তিনি। প্রয়োজনের তাগিদে শৈশবের অনেক স্বাভাবিক আনন্দ বিসর্জন দিতে হয়েছে তাঁকে। জীবনের সেই সময়গুলো ছিল কষ্টের, তবে সেগুলোই তাঁকে ধৈর্যশীল ও পরিশ্রমী হতে শিখিয়েছে।আমিনুল হক বলেন, বন্ধুরা যখন মাঠে খেলত কিংবা বেড়াতে যেত, তখন তাঁকে কাজ করতে হতো। শিশুবয়সে বিষয়টি তাঁর জন্য খুব কষ্টের ছিল। একসময় তাঁর মনে হয়েছিল, সামনে এগিয়ে যাওয়ার কোনো পথ নেই। তবে শেষ পর্যন্ত পড়াশোনাকেই নিজের একমাত্র সম্বল হিসেবে আঁকড়ে ধরেন তিনি। প্রতিকূলতার কাছে হার না মেনে শিক্ষাজীবন চালিয়ে যাওয়ার সিদ্ধান্তই পরবর্তী সময়ে তাঁর সাফল্যের ভিত্তি তৈরি করে।অভাবের কারণে একপর্যায়ে পড়াশোনা বন্ধ হয়ে যাওয়ার আশঙ্কা তৈরি হলেও আমিনুল হাল ছাড়েননি। নিজের শ্রমে যতটা সম্ভব খরচ চালিয়েছেন। একই সঙ্গে পাশে পেয়েছেন গ্রামের সহৃদয় মানুষদের। কেউ তাঁকে আর্থিক সহায়তা দিয়েছেন, কেউ কিনে দিয়েছেন খাতা-কলম, আবার কেউ পরীক্ষার ফি ও পোশাকের ব্যবস্থা করে দিয়েছেন। তাঁদের সামান্য সহযোগিতাও আমিনুলের কাছে ছিল অনেক বড় প্রেরণা। মানুষের এই ভালোবাসা ও বিশ্বাস তাঁকে বারবার নতুন করে স্বপ্ন দেখার সাহস জুগিয়েছে।আমিনুলের বেড়ে ওঠা ও শিক্ষাজীবনে সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রেখেছেন তাঁর চাচা আবদুল খালেক ও চাচি মিনারা খাতুন। নিজেদের সীমাবদ্ধতা সত্ত্বেও তাঁরা তাঁকে কখনো পর মনে করেননি। বরং নিজেদের সন্তানের মতোই লালন-পালন করেছেন এবং তাঁর ভবিষ্যৎ গড়ার জন্য যথাসাধ্য চেষ্টা করেছেন। অভাবের সংসারেও আমিনুলের পড়াশোনা চালিয়ে যাওয়ার ব্যাপারে তাঁরা ছিলেন আন্তরিক। তাঁদের ত্যাগ ও নিঃস্বার্থ ভালোবাসা আমিনুলের জীবনের অন্যতম শক্তি হয়ে উঠেছে।চাচা আবদুল খালেক আবেগাপ্লুত হয়ে বলেন, সাত মাস বয়সে আমিনুলকে রেখে তাঁর মা চলে গিয়েছিলেন। এরপর অনেক কষ্ট করে তাঁকে বড় করেছেন। কখনো ভাতিজা হিসেবে আলাদা করে দেখেননি। সব সময় নিজের সন্তানের মতোই লালন-পালন করেছেন। তিনি বলেন, আল্লাহই আমিনুলকে আজকের অবস্থানে নিয়ে এসেছেন।চাচি মিনারা খাতুনও আমিনুলকে ঘিরে নিজের ত্যাগের কথা স্মরণ করেন। তিনি বলেন, নিজের বুকের দুধ খাইয়ে আমিনুলকে বড় করেছেন। আমিনুলের বাবা তাঁর হাত ধরে বলেছিলেন, নিজের তিন ছেলের সঙ্গে আমিনুলকেও যেন একই চোখে দেখেন। সেই কথা তিনি সারা জীবন মনে রেখেছেন। কখনো আমিনুলকে নিজের সন্তানদের চেয়ে আলাদা করে দেখেননি। চাচি হিসেবে নয়, মায়ের স্নেহ দিয়েই তাঁকে আগলে রেখেছেন।কান্দানিয়া উচ্চবিদ্যালয় থেকে ২০১৫ সালে এসএসসি এবং আছিম শাহাবুদ্দিন ডিগ্রি কলেজ থেকে ২০১৭ সালে এইচএসসি পাস করেন আমিনুল। এরপর উচ্চশিক্ষার জন্য ভর্তি হন ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের সমাজকল্যাণ বিভাগে। গ্রামের সীমিত সুযোগ-সুবিধার পরিবেশ থেকে দেশের অন্যতম শীর্ষ উচ্চশিক্ষা প্রতিষ্ঠানে পৌঁছানো ছিল তাঁর জীবনের বড় অর্জন। বিশ্ববিদ্যালয়ে পড়াশোনার সময় তিনি থাকতেন স্যার এ এফ রহমান হলে। তবে বিশ্ববিদ্যালয়ে ভর্তি হওয়ার পরও আর্থিক সংকট পুরোপুরি কাটেনি। নিজের খরচ চালাতে টিউশনি করেছেন, পাশাপাশি চালিয়ে গেছেন পড়াশোনা।বিশ্ববিদ্যালয়ে অধ্যয়নকালে আমিনুল হক ‘সাঁকো-প্রথম আলো ট্রাস্টের’ অদম্য মেধাবী বৃত্তি লাভ করেন। এই বৃত্তি তাঁর শিক্ষাজীবনে গুরুত্বপূর্ণ সহায়তা হিসেবে কাজ করে। পরিবার, গ্রামবাসী ও বিভিন্ন পর্যায়ে পাওয়া সহযোগিতাকে কাজে লাগিয়ে তিনি উচ্চশিক্ষা সম্পন্ন করার পথে এগিয়ে যান। তবে শুধু সহযোগিতার ওপর নির্ভর করে থেমে থাকেননি; নিজের পরিশ্রম, অধ্যবসায় ও লক্ষ্য অর্জনের দৃঢ় সংকল্প বজায় রেখেছেন। জীবনের প্রতিটি ধাপে প্রতিকূলতার সঙ্গে লড়াই করে সামনে এগিয়ে যাওয়ার চেষ্টা করেছেন তিনি।দীর্ঘ প্রস্তুতি ও অধ্যবসায়ের ফল হিসেবে আমিনুল হক ৪৬তম বিসিএসে শিক্ষা ক্যাডারে সুপারিশপ্রাপ্ত হন। তবে ওই বিসিএসে তাঁর নিয়োগের গেজেট তখনো প্রকাশিত হয়নি। পরবর্তী সময়ে ৪৯তম বিশেষ বিসিএসেও শিক্ষা ক্যাডারে সুপারিশ পান তিনি। গত ৩০ সেপ্টেম্বর প্রকাশিত গেজেটে তাঁর নিয়োগ চূড়ান্ত হয়। সবকিছু ঠিক থাকলে ১২ অক্টোবর তাঁর কর্মস্থলে যোগদানের কথা রয়েছে।ইট ভাঙা, কৃষিকাজ ও টিউশনি করে পড়াশোনার খরচ জোগানো সেই তরুণের জীবনে এটি এক বড় অর্জন। দীর্ঘদিনের সংগ্রাম, আত্মবিশ্বাস ও অধ্যবসায়ের মধ্য দিয়ে তিনি নিজের স্বপ্ন পূরণের পথে পৌঁছেছেন।তবে জীবনের এই সাফল্যের আনন্দের মধ্যেও আমিনুলের মনে রয়ে গেছে গভীর এক আক্ষেপ। যাঁরা তাঁর জন্য সবচেয়ে বেশি ত্যাগ স্বীকার করেছেন, তাঁদের অনেকেই তাঁর সাফল্য দেখে যেতে পারেননি। তাঁর দাদি মোছা. ওমর জান ২০২১ সালে মারা যান। দাদি সব সময় তাঁকে বড় কর্মকর্তা হওয়ার স্বপ্ন দেখাতেন এবং চাকরি কবে হবে, তা জানতে চাইতেন। কিন্তু আমিনুলের বিসিএস ক্যাডার হওয়ার খবর শুনে আনন্দিত হওয়ার সুযোগ আর পাননি তিনি। বাবাও দেখে যেতে পারেননি ছেলের এই অর্জন।আমিনুল হক বলেন, তাঁর দাদি সব সময় বলতেন, একদিন তিনি বড় কর্মকর্তা হবেন। চাকরি কবে হবে, তা জানতে চাইতেন দাদি। আমিনুল তখন বলতেন, তাঁর পড়াশোনা এখনো শেষ হয়নি। কিন্তু দাদি আর দেখে যেতে পারেননি যে তিনি ক্যাডার হয়েছেন। বাবাও তাঁর এই সাফল্য দেখে যেতে পারেননি। বিষয়টি তাঁর জীবনের সবচেয়ে বড় আক্ষেপগুলোর একটি হয়ে থাকবে বলে জানান তিনি।চাকরি পাওয়ার পর বাবা ও দাদির কবর জিয়ারত করেছেন আমিনুল। তাঁর এই অর্জনের সঙ্গে মিশে রয়েছে প্রিয়জনদের স্মৃতি, তাঁদের ত্যাগ এবং পূরণ না হওয়া অনেক প্রত্যাশা।বিশ্ববিদ্যালয়ে পড়াশোনার সময় সাবিকুন্নাহার সিনথিয়ার সঙ্গে পরিচয় হয় আমিনুলের। পরে ২০২৪ সালের ২৭ সেপ্টেম্বর তাঁরা বিবাহবন্ধনে আবদ্ধ হন। জীবনের কঠিন সময়ে স্ত্রীর কাছ থেকেও মানসিক সমর্থন পেয়েছেন তিনি। দীর্ঘ সংগ্রামের পথে পরিবারের সদস্যদের ভালোবাসা, স্ত্রীর সহযোগিতা এবং শুভাকাঙ্ক্ষীদের অনুপ্রেরণা তাঁকে এগিয়ে যেতে সাহায্য করেছে। তাঁর মতে, জীবনে সফল হতে হলে শুধু স্বপ্ন দেখলেই চলে না; সেই স্বপ্ন বাস্তবায়নে প্রয়োজন সততা, পরিশ্রম ও ধৈর্য।নিজের অভিজ্ঞতা থেকে আমিনুল হক বলেন, সফলতার জন্য সততা, পরিশ্রম ও ধৈর্য প্রয়োজন। পাশাপাশি সৃষ্টিকর্তার কাছে দোয়া করতে হবে। তাঁর বিশ্বাস, সততা, পরিশ্রম ও ধৈর্য যার মধ্যে রয়েছে, তিনি চাকরি কিংবা ব্যবসা—যেকোনো ক্ষেত্রেই সফল হতে পারবেন। নিজের জীবনের দীর্ঘ সংগ্রাম থেকেই তিনি উপলব্ধি করেছেন, প্রতিকূলতা যত কঠিনই হোক, লক্ষ্য স্থির রেখে চেষ্টা চালিয়ে গেলে সামনে এগিয়ে যাওয়ার পথ তৈরি হয়।কান্দানিয়া গ্রামের আমিনুল হকের সাফল্যের গল্প তাই কেবল একজন তরুণের বিসিএস ক্যাডার হওয়ার গল্প নয়। এর সঙ্গে জড়িয়ে আছে মা-বাবাকে হারানোর বেদনা, চাচা-চাচির নিঃস্বার্থ ভালোবাসা, দাদির অপূর্ণ স্বপ্ন, গ্রামবাসীর সহযোগিতা এবং নিজের ভবিষ্যৎ গড়তে এক তরুণের নিরন্তর সংগ্রাম। যে হাতে একসময় ইট ভেঙেছেন, কৃষিকাজ করে উপার্জন করেছেন এবং টিউশনি করে পড়াশোনার খরচ জুগিয়েছেন, সেই সংগ্রামী জীবনের পথ পেরিয়ে আজ তিনি শিক্ষা ক্যাডারে নিয়োগ পেয়েছেন।আমিনুলের এই অর্জন প্রমাণ করে, দারিদ্র্য ও প্রতিকূলতা মানুষের পথ কঠিন করে তুলতে পারে, কিন্তু অদম্য ইচ্ছাশক্তি, অধ্যবসায় ও মানুষের ভালোবাসা থাকলে স্বপ্ন পূরণের পথ তৈরি করা সম্ভব। তাঁর জীবনসংগ্রাম দেশের প্রত্যন্ত অঞ্চলের সুবিধাবঞ্চিত শিক্ষার্থীদের জন্য এক অনুপ্রেরণার নাম।
/বিএসএস