• ঢাকা
  • শুক্রবার, ০৬ নভেম্বর ২০২৬, ০৬:১২ পিএম


বিনা দোষে ২২ বছর কারাগারে, মুক্তির পরও স্বাভাবিক জীবনে ফিরতে পারেননি ইব্রাহিম

দি পালস বিডি অনলাইন ডেস্ক
আপডেট টাইম: ১৬ জুলাই ২০২৬ ৮:৩৬ পিএম

বিনা দোষে দীর্ঘ ২২ বছর কারাভোগের পর মুক্তি মিলেছে ইব্রাহিম আলী শেখের (সাগর)। তবে কারাগার থেকে বের হলেও স্বাভাবিক জীবনে আর ফিরতে পারেননি তিনি। ২০১৭ সালে উচ্চ আদালত তাকে বেকসুর খালাস দিলেও সেই রায়ের কপি কারাগারে পৌঁছাতে লেগে যায় আরও আট বছর। ফলে নির্দোষ হওয়া সত্ত্বেও ২০২৫ সালের ৬ ফেব্রুয়ারি পর্যন্ত তাকে বন্দি জীবন কাটাতে হয়েছে।বর্তমানে খুলনার বটিয়াঘাটার বাসিন্দা ইব্রাহিম আলী শেখ বাগেরহাটের ফকিরহাট উপজেলার লখপুর ইউনিয়নের ভবনা-খড়িবুনিয়া গ্রামে মেয়ের জামাইয়ের বাড়িতে আশ্রয় নিয়েছেন।

সেখানে একটি ঝুপড়ি ঘরে বৃদ্ধা মাকে নিয়ে মানবেতর জীবনযাপন করছেন তিনি। নিয়মিত আয়ের কোনো উৎস না থাকায় অনেক সময় মা-ছেলেকে অর্ধাহারে-অনাহারে দিন কাটাতে হয়।ইব্রাহিম জানান, ছোটবেলায় বাবা দ্বিতীয় বিয়ে করে আলাদা হয়ে যাওয়ার পর পরিবারের দায়িত্ব এসে পড়ে তার কাঁধে। দারিদ্র্যের কারণে লেখাপড়া ছেড়ে দিনে ভ্যান-রিকশা চালাতেন এবং রাতে বাজারে নাইটগার্ড হিসেবে কাজ করতেন। সেই আয়েই চলত মা, ভাই-বোন, স্ত্রী এবং দুই মাস বয়সী মেয়েকে নিয়ে সংসার।২০০৩ সালে রাতের পাহারার কাজ শেষে সকালে বাড়ি ফেরার পথে পুলিশ তাকে আটক করে। পরে থানায় নিয়ে হত্যাসহ চারটি মামলায় আসামি করা হয়।

গ্রেপ্তারের পর মাত্র দুই মাস বয়সী মেয়েকে রেখে তার স্ত্রী অন্যত্র বিয়ে করেন।ইব্রাহিম বলেন, ‘আমি বারবার কইছিলাম, আমি কাউরে মারি নাই। আমি গরিব মানুষ, খাইটে খাই। কিন্তু কেউ আমার কথা শুনল না।’তিনি জানান, নিরক্ষর ও চরম দরিদ্র হওয়ায় নিজের পক্ষে আইনজীবী নিয়োগ বা কার্যকর আইনি লড়াই চালানোর সামর্থ্য ছিল না। পরে কারাগারে থাকা এক সহবন্দির পরিবারের সহযোগিতায় এবং তার মায়ের মাথা গোঁজার একমাত্র আশ্রয় ভিটেমাটি বিক্রি করে উচ্চ আদালতে আপিল করেন।২০১৭ সালের ২০ জুলাই হত্যা মামলাসহ যাবজ্জীবন সাজা থেকে তাকে বেকসুর খালাস দেওয়া হয়।

কিন্তু সেই রায়ের কপি কারাগারে পৌঁছাতে আরও আট বছর লেগে যায়। এ সময় পর্যন্ত তাকে বন্দি জীবনই কাটাতে হয়েছে। অন্য দুটি মামলায় যথাক্রমে ৭ ও ১০ বছরের সাজা তিনি এরই মধ্যে ভোগ করে ফেলেছিলেন।দীর্ঘদিন কারাগারে থাকার প্রভাব এখনো বহন করছেন ইব্রাহিম। শারীরিকভাবে দুর্বল হয়ে পড়েছেন তিনি। চোখে কম দেখেন, আলো সহ্য করতে পারেন না। হাত-পায়ে শক্তি কমে গেছে। বয়সের তুলনায় আগেভাগেই বার্ধক্য নেমে এসেছে। ভারী কাজ তো দূরের কথা, সাধারণ শ্রমের কাজ করতেও কষ্ট হয়।কান্নাজড়িত কণ্ঠে তিনি বলেন, ‘জেলে থাকতি দুইবেলা খাওন পাইতাম।

এখন অনেক সময় না খাইয়া থাকতি হয়। বউ বাচ্চা ফালাইয়ে ঘর ছাড়ছে, মেয়েটাও অর্ধাহার-অনাহারে কষ্টে আছে। জেল থেকে মুক্তি পাইছি, কিন্তু জীবনডা আর ফেরত পাই নাই।’সরকারের কাছে পুনর্বাসনের আবেদন জানিয়ে ইব্রাহিম বলেন, ‘সরকারের কাছে একটাই দাবি, আমারে বাঁচার একটা ব্যবস্থা করে দিক। বাকি জীবনটা যেন পরের কাছে আশ্রিত থাকতি না হয়। মরার পর যেন বেওয়ারিশ লাশ হয়ে পড়ে থাকতে না হয়।’ইব্রাহিমের মা কোহিনূর বেগম জানান, ছেলেকে মুক্ত করার জন্য তিনি ইটভাটায় ও মানুষের বাড়িতে কাজ করেছেন।

শেষ পর্যন্ত নিজের বসতঘরও বিক্রি করতে হয়েছে। পরে মেয়ের বিয়ে দিয়ে এখন তার জামাইয়ের বাড়িতেই তারা আশ্রয় নিয়েছেন।মুক্তির পর গত এক বছরে সমাজসেবা অধিদপ্তর, স্থানীয় প্রশাসনসহ বিভিন্ন সরকারি ও বেসরকারি প্রতিষ্ঠানের কাছে সহায়তার আবেদন করেছেন ইব্রাহিম। প্রয়োজনীয় কাগজপত্র জমা দিয়ে বারবার দ্বারে দ্বারে ঘুরলেও এখন পর্যন্ত কোনো পুনর্বাসন সুবিধা পাননি।এ বিষয়ে বাগেরহাট জেলা সমাজসেবা কার্যালয়ের উপপরিচালক সন্তোষ কুমার নাথ বলেন, ইব্রাহিম আলী শেখের প্রয়োজন ও সক্ষমতা বিবেচনা করে সহায়তার উদ্যোগ নেওয়া হবে।

/বিএসএস