• ঢাকা
  • বুধবার, ২৩ সেপ্টেম্বর ২০২৬, ০৪:১৫ এএম


ন্যায্যমূল্য না পেয়ে পানিতে পেঁয়াজ ফেলছেন ফরিদপুরের কৃষকরা

দি পালস বিডি অনলাইন ডেস্ক
আপডেট টাইম: ২৮ জুন ২০২৬ ১০:৪৮ পিএম

দেশের দ্বিতীয় বৃহত্তম পেঁয়াজ উৎপাদনকারী অঞ্চল ফরিদপুর। জেলার সালথা, নগরকান্দা ও বোয়ালমারী উপজেলায় সবচেয়ে বেশি পেঁয়াজ উৎপাদন হয়। তবে চলতি মৌসুমে উৎপাদিত পেঁয়াজের ন্যায্যমূল্য না পাওয়ায় চরম হতাশায় পড়েছেন কৃষকরা।

বিশেষ করে সালথা উপজেলায় উৎপাদন খরচের অর্ধেকেরও কম দামে পেঁয়াজ বিক্রি করতে বাধ্য হওয়ায় অনেক কৃষক ক্ষোভ, হতাশা ও অসহায়ত্ব থেকে খাল, পুকুর ও ডোবার পানিতে পেঁয়াজ ফেলে দিচ্ছেন। উৎপাদিত ফসলের এমন পরিণতি স্থানীয়দেরও ব্যথিত করেছে।

সম্প্রতি সালথা উপজেলার খোয়াড় গ্রামের একটি ডোবার পানিতে কৃষকদের পেঁয়াজ ফেলে দিতে দেখা গেছে। ঘটনাটি স্থানীয়দের মধ্যে ব্যাপক আলোচনার সৃষ্টি করেছে।

কৃষকদের ভাষ্য, বর্তমান বাজারদরে পেঁয়াজ বিক্রি করার চেয়ে অনেক সময় ফেলে দেওয়াই যেন কম কষ্টের।

পেঁয়াজ চাষি দাউদ মাতুব্বর জানান, বর্তমানে প্রতি মণ পেঁয়াজ ৮০০ থেকে ৯০০ টাকায় বিক্রি হচ্ছে। অথচ এক মণ পেঁয়াজ উৎপাদনে সার, বীজ, সেচ, ডিজেল, কীটনাশক ও শ্রমিকের মজুরি মিলিয়ে ১ হাজার ৫০০ থেকে ১ হাজার ৬০০ টাকা পর্যন্ত ব্যয় হয়। এর পর মৌসুম শেষে ঘরের চাঙ বা মাচায় সংরক্ষণ করতে হয়। পাঁচ থেকে ছয় মাস সংরক্ষণের পর ওজন কমে এক মণ পেঁয়াজ প্রায় ৩০ কেজিতে নেমে আসে। অর্থাৎ প্রতি মণে প্রায় ১০ কেজি ওজন কমে যায়। সব মিলিয়ে কৃষকের ভাগ্যে লোকসানই জুটছে।

একই গ্রামের কৃষক আবুল মাতুব্বর বলেন, কৃষকদের এমন দুর্দশার পরও সরকারের কার্যকর উদ্যোগ চোখে পড়ছে না। তিনি বলেন, কৃষক বাঁচলে দেশ বাঁচবে। দেশের অধিকাংশ মানুষ কৃষির ওপর নির্ভরশীল। উৎপাদিত কৃষিপণ্যের ন্যায্যমূল্য নিশ্চিত করা না গেলে একসময় মানুষ চাষাবাদ থেকে মুখ ফিরিয়ে নেবে।

শুধু সালথা নয়, ফরিদপুরের নগরকান্দা, বোয়ালমারী, ভাঙ্গা, সদরপুর ও মধুখালী উপজেলার পেঁয়াজ চাষিরাও একই সংকটে রয়েছেন। উৎপাদন ভালো হলেও বাজারে দাম না থাকায় অধিকাংশ কৃষক লোকসানের মুখে পড়েছেন। অনেকেই ঋণ নিয়ে চাষাবাদ করেছেন। এখন সেই ঋণের কিস্তি কীভাবে পরিশোধ করবেন, তা নিয়েই দুশ্চিন্তায় রয়েছেন।

সালথার কৃষক আহম্মদ মাতুব্বর বলেন, এক বিঘা জমিতে পেঁয়াজ আবাদ করতে আগের তুলনায় অনেক বেশি খরচ হচ্ছে। বর্তমানে এক মণ পেঁয়াজ বিক্রি করে এক কেজি গরুর মাংসও কেনা যায় না। এভাবে চলতে থাকলে আগামী বছর পেঁয়াজ চাষ করবেন কি না, সেটিই ভাবছেন।

ফরিদপুর শহরের পাইকারি ব্যবসায়ী শাহজাহান বেপারি বলেন, এ বছর পেঁয়াজের ফলন ভালো হয়েছে। পাশাপাশি বিভিন্ন জেলা থেকেও প্রচুর পেঁয়াজ বাজারে এসেছে। এছাড়া আমদানি বেশি হওয়ায় বাজারদর কমে গেছে। তবে কৃষকদের স্বার্থ রক্ষায় বাজার ব্যবস্থাপনায় কার্যকর উদ্যোগ নেওয়া প্রয়োজন।

কৃষি সংশ্লিষ্টদের মতে, দেশে চাহিদার তুলনায় উৎপাদন বৃদ্ধি এবং আধুনিক সংরক্ষণ ব্যবস্থার অভাবের কারণে প্রতিবছরই পেঁয়াজের বাজারে বড় ধরনের অস্থিরতা দেখা দেয়। দাম বাড়লে ভোক্তারা ক্ষতিগ্রস্ত হন, আর দাম কমে গেলে সর্বস্ব হারান কৃষকরা। দীর্ঘমেয়াদি সংরক্ষণের সুযোগ না থাকায় কৃষকরা বাধ্য হয়ে কম দামে পেঁয়াজ বিক্রি করেন অথবা নষ্ট হয়ে যাওয়ার আশঙ্কায় ফেলে দেন।

সালথা উপজেলা কৃষি সম্প্রসারণ কর্মকর্তা মো. রেজাউল করিম জানান, চলতি মৌসুমে উপজেলায় পেঁয়াজ আবাদের লক্ষ্যমাত্রা ছিল ১১ হাজার ৫০০ হেক্টর। তবে কৃষকদের আগ্রহে ১২ হাজার ৫৮৫ হেক্টর জমিতে পেঁয়াজের আবাদ হয়েছে। এতে মোট প্রায় ২ লাখ ৫০ হাজার ১২৫ মেট্রিক টন পেঁয়াজ উৎপাদিত হয়েছে। কৃষি বিভাগের হিসাবে প্রতি কেজি পেঁয়াজ উৎপাদনে গড়ে প্রায় ২৪ টাকা ব্যয় হয়। অর্থাৎ প্রতি মণের উৎপাদন খরচ প্রায় ৯৬০ টাকা।

তিনি আরও বলেন, বিষয়টি গুরুত্বের সঙ্গে দেখা হচ্ছে। কৃষকদের সংরক্ষণ পদ্ধতি সম্পর্কে নিয়মিত পরামর্শ দেওয়া হচ্ছে। তবে বাজারমূল্য নির্ধারণ কৃষি বিভাগের হাতে নেই।

স্থানীয় কৃষকদের দাবি, সরকারিভাবে পেঁয়াজ সংগ্রহ, আধুনিক সংরক্ষণাগার নির্মাণ, সহজ শর্তে কৃষিঋণ এবং বাজারে মধ্যস্বত্বভোগীদের নিয়ন্ত্রণে কার্যকর পদক্ষেপ নিতে হবে। অন্যথায় উৎপাদন খরচ বাড়লেও ন্যায্যমূল্য না পাওয়ায় কৃষকরা ধীরে ধীরে পেঁয়াজ চাষ থেকে সরে যাবেন, যা দেশের কৃষি অর্থনীতি ও ভবিষ্যৎ খাদ্য নিরাপত্তার ওপর নেতিবাচক প্রভাব ফেলবে।

সালথা উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা (ইউএনও) দবির উদ্দিন বলেন, পেঁয়াজের কম দামের কারণে কৃষকরা কষ্টে আছেন এবং তারা ন্যায্যমূল্য পাচ্ছেন না—এ বিষয়টি তিনি অবগত। এটি জাতীয় পর্যায়ের বিষয় হলেও ফরিদপুর-২ (সালথা-নগরকান্দা) আসনের সংসদ সদস্য ও পররাষ্ট্র উপদেষ্টার কাছে লিখিতভাবে বিষয়টি তুলে ধরবেন, যাতে কৃষকদের স্বার্থে প্রয়োজনীয় উদ্যোগ নেওয়া যায়।

ফরিদপুর কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তরের উপ-পরিচালক (ডিডি) কৃষিবিদ মো. শাহাদুজ্জামান জানান, পেঁয়াজ সংরক্ষণে কৃষকদের সহায়তা দিতে ২০২৪-২৫ অর্থবছরে জেলায় ১ হাজার ৪৩০টি এয়ারফ্লো মেশিন বিতরণ করা হয়েছে। চলতি বছর ইতোমধ্যে ৭০০টি বিতরণ করা হয়েছে এবং আরও প্রায় আড়াই হাজার মেশিন সরবরাহের উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে।

তার মতে, সংরক্ষণ সুবিধা বাড়ানো গেলে কৃষকরা তাৎক্ষণিকভাবে কম দামে পেঁয়াজ বিক্রি করতে বাধ্য হবেন না।

/এসএন