• ঢাকা
  • রোববার, ২০ সেপ্টেম্বর ২০২৬, ১১:৪৬ পিএম


সীমান্ত হত্যা ও পুশইন বন্ধে বিএসএফকে ক’ড়া বার্তা বিজিবির

দি পালস বিডি অনলাইন ডেস্ক
আপডেট টাইম: ১৫ জুন ২০২৬ ৭:৫০ পিএম

বাংলাদেশ-ভারত সীমান্তে হত্যা, সহিংসতা এবং পুশইন (জোরপূর্বক অনুপ্রবেশ) বন্ধে কার্যকর পদক্ষেপ নেওয়ার জন্য ভারতের সীমান্তরক্ষী বাহিনী বিএসএফের প্রতি আহ্বান জানিয়েছে বর্ডার গার্ড বাংলাদেশ (বিজিবি)। শুক্রবার (১২ জুন) বিজিবির এক সংবাদ বিজ্ঞপ্তিতে এ তথ্য জানানো হয়।

বিজ্ঞপ্তিতে বলা হয়, সীমান্ত ব্যবস্থাপনা, নিরাপত্তা এবং পারস্পরিক সহযোগিতা আরও জোরদারের লক্ষ্যে বিজিবি ও বিএসএফের মহাপরিচালক পর্যায়ের আলোচনা অনুষ্ঠিত হয়েছে। এর আগে ৮ থেকে ১১ জুন ভারতের নয়াদিল্লিতে দুই বাহিনীর মধ্যে ৫৭তম মহাপরিচালক পর্যায়ের সীমান্ত সম্মেলন অনুষ্ঠিত হয়।

সম্মেলনে বিজিবি সীমান্তে নিরীহ মানুষের মৃত্যু শূন্যের কোঠায় নামিয়ে আনার ওপর বিশেষ গুরুত্বারোপ করে। পাশাপাশি অবৈধ অনুপ্রবেশ বা পুশইনের মতো ঘটনা বন্ধে কার্যকর ও দীর্ঘমেয়াদি সমাধান খুঁজে বের করার আহ্বান জানানো হয়। দুই দেশের সীমান্তরক্ষী বাহিনীর মধ্যে বিদ্যমান সমস্যা সমাধানে পারস্পরিক সহযোগিতা ও সমন্বয় আরও শক্তিশালী করার বিষয়েও আলোচনা হয়।

সীমান্ত এলাকায় শান্তি-শৃঙ্খলা বজায় রাখা এবং স্থানীয় জনগণের নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে নিয়মিত যোগাযোগ ও যৌথ উদ্যোগ বাড়ানোর প্রয়োজনীয়তার কথাও সম্মেলনে তুলে ধরা হয়।

সীমান্ত হত্যা ও সহিংসতা নিয়ে উদ্বেগ

বিজিবির মহাপরিচালক সীমান্তে বিএসএফ সদস্য ও ভারতীয় নাগরিকদের হাতে প্রাণঘাতী ও অপ্রাণঘাতী অস্ত্র ব্যবহারের ফলে নিরস্ত্র বাংলাদেশি নাগরিকদের মৃত্যুর ঘটনায় গভীর উদ্বেগ প্রকাশ করেন। তিনি মানবাধিকার লঙ্ঘনের বিভিন্ন উদাহরণ উল্লেখ করে সীমান্ত হত্যা শূন্যে নামিয়ে আনতে বিএসএফকে কার্যকর ব্যবস্থা নেওয়ার আহ্বান জানান।

তিনি সীমান্তে শান্তি, স্থিতিশীলতা ও স্বাভাবিক পরিস্থিতি বজায় রাখতে ধারাবাহিক প্রচেষ্টা এবং জবাবদিহিতা নিশ্চিত করার ওপর গুরুত্বারোপ করেন। উভয় পক্ষ সম্মত হয় যে আন্তরিকতা, বিদ্যমান আইন মেনে চলা এবং মানবিক দৃষ্টিভঙ্গির মাধ্যমে এসব সমস্যার সমাধান সম্ভব।

এ সময় সীমান্ত নিরাপত্তা জোরদার, যৌথ টহল বৃদ্ধি, নজরদারি বাড়ানো এবং অবৈধ সীমান্ত পারাপার রোধে জনসচেতনতামূলক কার্যক্রম গ্রহণের বিষয়ে সম্মতি হয়। একই সঙ্গে সীমান্ত হত্যা ও হামলার ঘটনায় তদন্ত এবং দায়ীদের বিরুদ্ধে আইনগত ব্যবস্থা গ্রহণের বিষয়েও একমত হয় দুই পক্ষ।

পুশইন নিয়ে বিজিবির আপত্তি

বিজিবির মহাপরিচালক সাম্প্রতিক সময়ে বিএসএফের মাধ্যমে রোহিঙ্গা, মিয়ানমারের নাগরিক এবং ভারতীয় নাগরিকদের বাংলাদেশে পুশইনের ঘটনায় গভীর উদ্বেগ প্রকাশ করেন। তিনি বলেন, এসব ঘটনা বিদ্যমান দ্বিপাক্ষিক নীতি, সীমান্ত বিষয়ক যৌথ নির্দেশিকা এবং সমন্বিত সীমান্ত ব্যবস্থাপনা পরিকল্পনার পরিপন্থি।

তিনি উল্লেখ করেন, পুশইনের শিকার ব্যক্তিদের অনেকেই চরম দুর্ভোগে রয়েছেন। তাদের মধ্যে ক্ষুধার্ত, অসুস্থ এবং চিকিৎসাসেবার প্রয়োজন রয়েছে এমন প্রবীণ ব্যক্তিও আছেন।

বিজিবি পুনর্ব্যক্ত করে যে, কোনো ব্যক্তি বাংলাদেশি নাগরিক হিসেবে যাচাইকৃত হলে প্রচলিত দ্বিপাক্ষিক প্রত্যাবাসন প্রক্রিয়ার মাধ্যমে তাকে গ্রহণ করা হবে। একই সঙ্গে বিএসএফকে অবিলম্বে পুশইন বন্ধ এবং বিদ্যমান প্রটোকল অনুসরণ করার আহ্বান জানানো হয়।

অন্যদিকে বিএসএফ মহাপরিচালক জাতীয়তা যাচাই প্রক্রিয়া দ্রুত সম্পন্ন করে প্রত্যাবাসন নিশ্চিত করার আহ্বান জানান। উভয় পক্ষ পারস্পরিক আস্থা, সহযোগিতা এবং সুপ্রতিবেশীসুলভ সম্পর্ক বজায় রাখার বিষয়ে অঙ্গীকার পুনর্ব্যক্ত করে।

মাদক, অস্ত্র ও চোরাচালান রোধে জোর

বিজিবি ভারত থেকে বাংলাদেশে হেরোইন, ফেনসিডিল, ইয়াবা, গাঁজা এবং অন্যান্য মাদকদ্রব্যের চোরাচালান নিয়ে উদ্বেগ প্রকাশ করে। বাংলাদেশ সরকারের ‘জিরো টলারেন্স’ নীতির কথা উল্লেখ করে বলা হয়, এসব মাদক উভয় দেশের তরুণ প্রজন্মের জন্য গুরুতর হুমকি।

এ ছাড়া সীমান্ত দিয়ে আগ্নেয়াস্ত্র, গোলাবারুদ এবং অন্যান্য অবৈধ পণ্যের চোরাচালান নিয়েও উদ্বেগ জানানো হয়। মাদক পাচার রোধে দুই দেশের মাদক নিয়ন্ত্রণ সংস্থার মহাপরিচালকদের নিয়মিত বৈঠকের প্রস্তাব দেয় বিজিবি।

বিএসএফ জানায়, ভারত সরকারও মাদক ও আন্তঃসীমান্ত অপরাধের বিরুদ্ধে ‘জিরো টলারেন্স’ নীতি অনুসরণ করে। দুই পক্ষ সমন্বিত টহল জোরদার এবং মাঠপর্যায়ে তথ্য আদান-প্রদান বৃদ্ধির বিষয়ে একমত হয়।

মানবপাচার, রোহিঙ্গা ও অবৈধ অভিবাসন

রোহিঙ্গা এবং অবৈধ অভিবাসন প্রসঙ্গে বিজিবির মহাপরিচালক বলেন, রোহিঙ্গা সংকট বাংলাদেশের জন্য একটি বড় মানবিক চ্যালেঞ্জ। তিনি স্পষ্টভাবে জানান, বাংলাদেশ তার ভূখণ্ড ব্যবহার করে রোহিঙ্গাদের ভারতে অবৈধভাবে প্রবেশের অনুমতি দেয় না।

উভয় পক্ষ মানবপাচার চক্রের বিরুদ্ধে কঠোর ব্যবস্থা গ্রহণ, ভুক্তভোগীদের উদ্ধার, পুনর্বাসন এবং আইনগত সহায়তা নিশ্চিত করার বিষয়ে একমত হয়।

সীমান্ত অবকাঠামো, বেড়া ও পিলার নিয়ে আলোচনা

সম্মেলনে আন্তর্জাতিক সীমান্তের ১৫০ গজের মধ্যে অননুমোদিত নিরাপত্তা-সংক্রান্ত অবকাঠামো নির্মাণ, গবাদিপশুর বেড়া, সড়ক, ডিউটি পোস্ট, বিদ্যুতের খুঁটি, সিসিটিভি ক্যামেরা ও অন্যান্য স্থাপনা নির্মাণ নিয়ে উদ্বেগ প্রকাশ করে বিজিবি।

বিজিবির মহাপরিচালক বলেন, এ ধরনের কাজের আগে বাংলাদেশের সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষের অনুমতি নেওয়া প্রয়োজন। এ বিষয়ে বিদ্যমান নির্দেশিকা ও কূটনৈতিক প্রক্রিয়া অনুসরণের আহ্বান জানানো হয়।

একই সঙ্গে মুহুরি চর, কুষ্টিয়াসহ বিভিন্ন এলাকায় সীমান্ত পিলার নির্মাণ, পুনঃস্থাপন এবং নদীভিত্তিক অনির্ধারিত সীমান্ত দ্রুত নির্ধারণের বিষয়ও উত্থাপন করা হয়। দুই পক্ষ এসব বিষয় যৌথ সীমান্ত সম্মেলন এবং বিদ্যমান দ্বিপাক্ষিক ব্যবস্থার আওতায় সমাধানের বিষয়ে সম্মত হয়।

নদীর পানি ও তীর সংরক্ষণ

কুশিয়ারা নদীর পানি বণ্টন এবং রহিমপুর খাল খনন নিয়ে বিজিবি উদ্বেগ প্রকাশ করে। বলা হয়, প্রয়োজনীয় সম্মতি প্রদানে বিলম্বের কারণে বাংলাদেশের ন্যায্য পানি প্রাপ্তি বাধাগ্রস্ত হচ্ছে।

নদীতীর সংরক্ষণ প্রকল্পগুলোর অনুমোদন দ্রুত সম্পন্ন এবং বন্যা ও ভাঙন প্রতিরোধে সহযোগিতা বৃদ্ধির আহ্বান জানানো হয়। উভয় পক্ষ এসব বিষয় যৌথ নদী কমিশন এবং যৌথ মনিটরিং ব্যবস্থার আওতায় আলোচনার মাধ্যমে সমাধানের বিষয়ে একমত হয়।

সন্ত্রাসবাদ ও সীমান্ত নিরাপত্তা

বিজিবি ভারতের মিজোরাম অঞ্চলে পার্বত্য এলাকার বিচ্ছিন্নতাবাদী ও সশস্ত্র গোষ্ঠীগুলোর সম্ভাব্য অবস্থান এবং বাংলাদেশবিরোধী কর্মকাণ্ড নিয়ে উদ্বেগ জানায়। জবাবে বিএসএফ জানায়, ভারত জাতীয়তা নির্বিশেষে সব ধরনের সশস্ত্র সন্ত্রাসী গোষ্ঠীর বিরুদ্ধে ‘জিরো টলারেন্স’ নীতি অনুসরণ করে।

উভয় পক্ষ নিজ নিজ ভূখণ্ড কোনো সন্ত্রাসী গোষ্ঠীর ঘাঁটি হিসেবে ব্যবহার করতে না দেওয়ার বিষয়ে পুনরায় অঙ্গীকার করে।

অপপ্রচার ও বিভ্রান্তিকর তথ্য নিয়ে উদ্বেগ

সম্মেলনে দুই দেশের কিছু প্রিন্ট, ইলেকট্রনিক ও সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে সীমান্ত ও দ্বিপাক্ষিক সম্পর্ক নিয়ে মিথ্যা, বিকৃত ও বিভ্রান্তিকর তথ্য প্রচারের বিষয়েও উদ্বেগ প্রকাশ করা হয়।

উভয় পক্ষই সম্মত হয় যে, গণমাধ্যমে অপপ্রচার ও গুজব রোধে সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষ প্রয়োজনীয় পদক্ষেপ নেবে এবং সীমান্ত-সম্পর্কিত ঘটনার বিষয়ে সময়োপযোগী ব্যাখ্যা প্রদান করবে।

সম্মেলন শেষে বিজিবি ও বিএসএফের মহাপরিচালকরা বাংলাদেশ-ভারত সীমান্তে শান্তি, স্থিতিশীলতা ও নিরাপত্তা বজায় রাখতে যৌথভাবে কাজ করার অঙ্গীকার পুনর্ব্যক্ত করেন।

/এসএন