ছবি: সংগৃহীত
রাজধানীর কদমতলীর খানকা শরীফ পুকুরপাড় এলাকায় সাত বছরের শিশু রিফাতকে হত্যা করে মরদেহ চালের ড্রামে ভরে প্রায় ৬ কিলোমিটার দূরে গেন্ডারিয়ার ময়লার ভাগাড়ে ফেলে দেওয়ার ঘটনায় চাঞ্চল্যকর তথ্য জানিয়েছে পুলিশ।
পুলিশের দাবি, রুটি ও কলা খাওয়ার প্রলোভন দেখিয়ে রিফাতকে বাসায় ডেকে নেয় মায়া আক্তার। এরপর একটি মোবাইল ফোন চুরির বিষয় স্বীকার করাতে চাপ দেওয়া হয় শিশুটিকে। কিন্তু সে রাজি না হওয়ায় খাটের সঙ্গে মাথা থেঁতলে তাকে হত্যা করা হয়।
ঘটনাটি ঘটে গত ১৭ ফেব্রুয়ারি। সেদিন প্রতিদিনের মতো কদমতলীর খানকা শরীফ পুকুরপাড় এলাকায় খেলতে বের হয় রিফাত। সকাল পেরিয়ে দুপুর হলেও সে বাসায় ফিরে না আসায় উদ্বিগ্ন হয়ে পড়ে পরিবার।
পরিবারের সদস্যরা জানান, সম্ভাব্য বিভিন্ন স্থানে খোঁজাখুঁজি এবং মাইকিং করেও রিফাতের কোনো সন্ধান পাওয়া যায়নি। পরে থানায় গিয়ে একটি সাধারণ ডায়েরি (জিডি) করেন তারা।
তদন্তের শুরুতে পুলিশও কোনো সূত্র পাচ্ছিল না। আশপাশের থানাগুলোতেও বিষয়টি জানানো হয়। নিখোঁজের পরদিন রাতে গেন্ডারিয়ার লোহারপুল এলাকার একটি ময়লার ভাগাড় থেকে একটি চালের ড্রাম উদ্ধার করা হয়। পরে সেই ড্রামের ভেতরেই পাওয়া যায় শিশু রিফাতের মরদেহ।
রিফাতের দাদি জানান, ড্রাম খোলার পর তারা ভেতরে শিশুটির মরদেহ দেখতে পান। পরে পুলিশ মরদেহ উদ্ধার করে এবং পরিবারের সদস্যদের সঙ্গে যোগাযোগ করে।
কদমতলী থেকে নিখোঁজ হওয়ার পর গেন্ডারিয়ায় মরদেহ উদ্ধার হওয়ায় শুরুতে পুরো ঘটনায় ধোঁয়াশা তৈরি হয়। তবে মরদেহের সঙ্গে মোড়ানো একটি জামা তদন্তে গুরুত্বপূর্ণ সূত্র হিসেবে কাজ করে।
তদন্তকারীরা ওই পোশাকের সূত্র ধরে এলাকায় অনুসন্ধান শুরু করেন। আশপাশের কারও কাছে এমন পোশাক ছিল কিনা তা খতিয়ে দেখা হয়। পরে জানা যায়, পুকুরপাড় এলাকার এক সাবেক ভাড়াটিয়ার মেয়ের কাছে এমন পোশাক ছিল।
এরপর পুলিশ ওই বাসার সিসিটিভি ফুটেজ বিশ্লেষণ শুরু করে। ফুটেজে দেখা যায়, ১৮ ফেব্রুয়ারি ভাড়াটিয়া মায়া আক্তার একটি ড্রাম অটোরিকশায় তুলে বাসা থেকে বের হচ্ছেন।
এর ভিত্তিতে মায়া আক্তারকে হেফাজতে নিয়ে জিজ্ঞাসাবাদ শুরু করে পুলিশ।
কদমতলী থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা (ওসি) শেখ আশরাফুজ্জামান বলেন, কাপড়ের সূত্র ধরেই তদন্ত শুরু হয়। পরে সিসিটিভি ফুটেজে এক নারীকে ড্রাম নিয়ে যেতে দেখা যায়। এরপর তাকে আটক করে ব্যাপক জিজ্ঞাসাবাদ করা হয়।
জিজ্ঞাসাবাদে বেরিয়ে আসে হত্যার পুরো রহস্য। পুলিশ জানায়, প্রায় পাঁচ মাস আগে রিফাতের পরিবার এবং মায়া পাশাপাশি বাসায় ভাড়া থাকতেন। সে সময় একটি মোবাইল ফোন হারানোর ঘটনায় রিফাত ও তার পরিবারের সদস্যদের সন্দেহ করতেন মায়া।
সেই ক্ষোভ থেকেই ১৭ ফেব্রুয়ারি শিশুটিকে একা পেয়ে বাসায় ডেকে নিয়ে হত্যা করা হয় বলে জানিয়েছে পুলিশ। পরে মরদেহ গুম করতে চালের ড্রামে ভরে দূরে ফেলে আসে অভিযুক্ত নারী।
ওসি শেখ আশরাফুজ্জামান আরও বলেন, জিজ্ঞাসাবাদে মায়া জানিয়েছে, শিশুটি মারা যাওয়ার পর সে ভয় পেয়ে যায়। এরপর মরদেহ লুকানোর সিদ্ধান্ত নেয়। ঘরে থাকা একটি চালের ড্রামে অল্প কিছু চাল রেখে তার মধ্যে মরদেহ ভরে রাখে। সারারাত ড্রামটি পাহারা দেওয়ার পর সকালে সেটি নিয়ে গিয়ে ফেলে আসে।
পুলিশ আরও জানিয়েছে, শুধু মরদেহ গুম করেই থেমে থাকেনি মায়া আক্তার। রিফাতের পরিবারকে বিভ্রান্ত করতে বিভিন্ন জায়গায় খোঁজাখুঁজির নাটকও করেন তিনি।
এ ঘটনায় নিহত শিশুর পরিবারের সদস্যরা হত্যাকারীর সর্বোচ্চ শাস্তির দাবি জানিয়েছেন। ইতোমধ্যে আদালতে হত্যার দায় স্বীকার করে জবানবন্দিও দিয়েছেন মায়া আক্তার।