ছবি: সংগৃহীত
রাজধানীর বারিধারা ডিওএইচএস এলাকার নিজ বাসা থেকে গত ২৩ মার্চ দিবাগত রাতে গ্রেপ্তার করা হয় লেফটেন্যান্ট জেনারেল (অব.) মাসুদ উদ্দিন চৌধুরীকে। পরদিন ২৪ মার্চ পল্টন মডেল থানার একটি মামলায় আদালত তাকে পাঁচ দিনের রিমান্ডে নিয়ে জিজ্ঞাসাবাদের অনুমতি দেন। পরে ২৯ মার্চ দ্বিতীয় দফায় আরও ছয় দিনের রিমান্ড মঞ্জুর করা হয়। এরপর ৪ এপ্রিল তৃতীয় দফায় আরও তিন দিনের রিমান্ড অনুমোদন দেন আদালত।
সর্বশেষ ৭ এপ্রিল পল্টন মডেল থানার মামলায় তিন দফায় মোট ১৪ দিনের রিমান্ড শেষে তাকে আদালতে হাজির করা হয়। ওইদিন দেলোয়ার হোসেন হত্যা মামলায় গ্রেপ্তার দেখিয়ে আরও চার দিনের রিমান্ড মঞ্জুর করা হয়। পরে ১১ এপ্রিল আবারও চার দিনের রিমান্ড মঞ্জুর করেন আদালত।
গোয়েন্দা সংস্থার একাধিক কর্মকর্তা জানিয়েছেন, মূলত ২০০৭ সালের এক-এগারোর ঘটনাপ্রবাহ ও সংশ্লিষ্ট ষড়যন্ত্র নিয়ে তাকে জিজ্ঞাসাবাদ করা হচ্ছে। তদন্ত সংশ্লিষ্টদের দাবি, জিজ্ঞাসাবাদে তিনি গুরুত্বপূর্ণ বিভিন্ন তথ্য দিয়েছেন।
রিমান্ডে দেওয়া বক্তব্যে মাসুদ উদ্দিন বলেন, ২০০৬ সালের শুরু থেকেই দেশের রাজনৈতিক পরিস্থিতি উত্তপ্ত হয়ে ওঠে। সে সময় তিনি সেনাবাহিনীর অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ নবম পদাতিক ডিভিশনের জিওসি হিসেবে দায়িত্ব পালন করছিলেন। তার ভাষ্য অনুযায়ী, এই ডিভিশনকে সেনাবাহিনীর অন্যতম স্তম্ভ হিসেবে বিবেচনা করা হয়।
তিনি দাবি করেন, ওই সময় ইংরেজি দৈনিক ডেইলি স্টারের একজন সম্পাদক তার সঙ্গে ব্যক্তিগতভাবে দেখা করার আগ্রহ প্রকাশ করেন। সাভার সেনানিবাসে সাক্ষাতের প্রস্তাব দেওয়া হলেও সেটি গ্রহণ করা হয়নি। পরে গুলশানের একটি বাসায় নৈশভোজে আমন্ত্রণ জানানো হলে তিনি সেখানে যান।
মাসুদ উদ্দিনের ভাষ্যমতে, ২০০৬ সালের অক্টোবরে গুলশানের এক শিল্পপতির বাসায় আয়োজিত ওই নৈশভোজে তিনি স্ত্রীসহ উপস্থিত ছিলেন। ওই শিল্পপতি দুটি প্রভাবশালী সংবাদপত্রের মালিক বলেও তিনি উল্লেখ করেন। সেখানে তিনি কয়েকজন সুশীল সমাজের প্রতিনিধি, প্রথম আলো সম্পাদক, অর্থনীতিবিদ, লেখক ও বুদ্ধিজীবীদের সঙ্গে পরিচিত হন।
তার দাবি, ওই বৈঠকে দেশের রাজনৈতিক পরিস্থিতি নিয়ে আলোচনা হয় এবং নৈশভোজের একপর্যায়ে দুই সম্পাদক ও একজন স্বনামধন্য বুদ্ধিজীবী তার সঙ্গে একান্তে কথা বলেন। সে আলোচনায় রাজনৈতিক সংকট মোকাবিলায় সেনাবাহিনীর সম্ভাব্য ভূমিকা নিয়ে আলোচনা হয় বলে তিনি উল্লেখ করেন।
গোয়েন্দাদের কাছে দেওয়া বক্তব্যে মাসুদ বলেন, তিনি তখন উপস্থিত তিনজনকে জানান যে সেনাবাহিনী চেইন অব কমান্ড অনুযায়ী পরিচালিত হয়, তাই এ বিষয়ে সেনাপ্রধানের সঙ্গে কথা বলা উচিত। জবাবে তাকে জানানো হয়, সেনাপ্রধানের সঙ্গে তাদের ইতোমধ্যে আলোচনা হয়েছে এবং তিনি মাসুদের ভূমিকা নিয়ে নিশ্চিত নন।
মাসুদের ভাষ্য অনুযায়ী, তখন তিনি বলেন, সেনাপ্রধান সেনাবাহিনী ও দেশের স্বার্থে যে সিদ্ধান্ত নেবেন, তিনি সেটিই অনুসরণ করবেন।
তিনি আরও দাবি করেন, ওই নৈশভোজের একদিন পর সেনাপ্রধান তাকে ফোন করে জরুরি বৈঠকের জন্য সেনা সদরে ডাকেন। তার বক্তব্য অনুযায়ী, মইন ইউ আহমেদের সঙ্গে তার ব্যক্তিগত সম্পর্ক ভালো হলেও সেনাপ্রধান হওয়ার পর তাদের মধ্যে দূরত্ব তৈরি হয়েছিল। তবে সেনা সদরের ওই বৈঠকের পর সেই দূরত্ব কমে আসে।
মাসুদ বলেন, বৈঠকে দেশের রাজনৈতিক পরিস্থিতি নিয়ে দীর্ঘ আলোচনা হয়। সেখানে তাকে জানানো হয় যে আসন্ন নির্বাচনে আওয়ামী লীগ অংশ নেবে না। তিনি প্রথমে বিষয়টি বিশ্বাস করেননি। পরে তিনি জানান, ২২ জানুয়ারির নির্বাচন আওয়ামী লীগ বর্জন করলে সেনাপ্রধান যে সিদ্ধান্ত নেবেন, তিনি তা মেনে নেবেন।
রিমান্ডে তিনি আরও বলেন, ৮ জানুয়ারির এক বৈঠকে ইয়াজউদ্দিন সরকারের অপসারণের সিদ্ধান্ত চূড়ান্ত করা হয়। একই সঙ্গে তিনি দাবি করেন, সেনাবাহিনীতে তিনি সেনাপ্রধানের চেয়ে বেশি জনপ্রিয় ছিলেন এবং এক-এগারোর সময় তাকে সামনে রেখেই সব কার্যক্রম পরিচালনা করা হয়।
মাসুদ উদ্দিন দাবি করেন, তিনি নিজে কিংবা সেনাবাহিনী বেগম খালেদা জিয়ার পরিবারকে গ্রেপ্তারের পক্ষে ছিলেন না। তার ভাষ্যমতে, কোর কমান্ড বৈঠকে তাদের গৃহবন্দি রাখা অথবা বিদেশে পাঠানোর সিদ্ধান্ত নিয়ে আলোচনা হয়েছিল। কিন্তু সুশীল সমাজের প্রতিনিধিরা, বিশেষ করে দুই সম্পাদক মতিউর রহমান ও মাহফুজ আনাম গ্রেপ্তারের জন্য চাপ সৃষ্টি করেন।
তিনি আরও দাবি করেন, তিনি তাদের সতর্ক করে বলেছিলেন যে শহীদ রাষ্ট্রপতি জিয়াউর রহমান সেনাবাহিনীতে অত্যন্ত সম্মানিত ব্যক্তি এবং জিয়া পরিবারকে গ্রেপ্তার করা হলে সেনাবাহিনীর মধ্যে অসন্তোষ সৃষ্টি হতে পারে। কিন্তু জবাবে তাকে বলা হয়, দুই নেত্রীকে না সরালে দেশে রাজনৈতিক সংস্কার সম্ভব নয়।
মাসুদ বলেন, তখন তিনি দুই সম্পাদককে এ বিষয়ে জনমত তৈরির কথা বলেন। এরপর দুই নেত্রীর বিরুদ্ধে ওই দুটি সংবাদপত্রে ধারাবাহিকভাবে একাধিক প্রতিবেদন প্রকাশিত হয় বলে তিনি দাবি করেন।
তার বক্তব্য অনুযায়ী, মতিউর রহমানের নামে প্রকাশিত ‘দুই নেত্রীকে সরে দাঁড়াতে হবে’ শিরোনামের লেখাটিকেই এক-এগারো সরকারের পথনির্দেশনা হিসেবে ব্যবহার করা হয়েছিল। তিনি আরও দাবি করেন, এক-এগারোর পুরো প্রক্রিয়াই মতিউর রহমান, মাহফুজ আনাম এবং সুশীল সমাজের পরামর্শে পরিচালিত হয়।
মাসুদ উদ্দিনের দাবি, ২০০৫ সাল থেকেই দুটি সংবাদপত্র নিয়মিতভাবে বিএনপির বিরুদ্ধে সংবাদ ও কলাম প্রকাশ করতে শুরু করে, যা এক-এগারোর পটভূমি তৈরিতে ভূমিকা রাখে। তিনি আরও বলেন, ২০০৮ সালের ১১ জানুয়ারি ফখরুদ্দীন আহমদের নেতৃত্বে গঠিত তত্ত্বাবধায়ক সরকারের ১৬ জন উপদেষ্টার মধ্যে ৯ জনই ওই দুটি পত্রিকার সঙ্গে ঘনিষ্ঠ ছিলেন অথবা সেখানে নিয়মিত কলাম লিখতেন।
তার দেওয়া তালিকায় ছিলেন এ বি মির্জ্জা মো. আজিজুল ইসলাম, আইয়ুব কাদরী, ড. ইফতেখার আহমেদ চৌধুরী, চৌধুরী সাজ্জাদুল করিম (সি এস করিম), এ এম এম শওকত আলী, রাশেদা কে চৌধূরী ও ড. হোসেন জিল্লুর রহমান। এছাড়া হাসান আরিফ ওই সংবাদপত্র দুটির আইনজীবী ছিলেন বলেও তিনি দাবি করেন। গীতি আরা সাফিয়া চৌধুরী বিভিন্ন প্রচারণায় যুক্ত ছিলেন বলেও তার অভিযোগ।
রিমান্ডে মাসুদ আরও বলেন, ২০০১ সালে বিএনপি নেতৃত্বাধীন চারদলীয় জোট সরকার ক্ষমতায় আসার পর থেকেই একটি বিশেষ চক্র সক্রিয় হয়ে ওঠে। তার ভাষ্যমতে, ২০০৬ সালের শুরু থেকে দেশের একটি বাংলা ও একটি ইংরেজি দৈনিক পরিকল্পিতভাবে সরকারের বিরুদ্ধে নেতিবাচক প্রচার শুরু করে।
তিনি অভিযোগ করেন, তথাকথিত ‘যোগ্য প্রার্থী’ নির্বাচনের নামে এনজিও ও সুশীল সমাজের প্রতিনিধিদের নিয়ে দেশজুড়ে সেমিনার ও গোলটেবিল বৈঠকের আয়োজন করা হতো, যার উদ্দেশ্য ছিল রাজনীতিবিদদের প্রতি সাধারণ মানুষের বিরূপ মনোভাব তৈরি করা।
তার দাবি অনুযায়ী, ওই সময় কিছু প্রভাবশালী মহল দেশের রাজনৈতিক পরিস্থিতিকে নির্দিষ্ট দিকে নিতে কাজ করেছিল। তিনি বলেন, দুটি প্রভাবশালী সংবাদপত্রের সমালোচনামূলক প্রচারের ফলে রাজনীতিবিদদের প্রতি মানুষের আস্থা কমে যায় এবং ‘বিরাজনীতিকরণ’ ধারণাকে জনপ্রিয় করে তোলার চেষ্টা করা হয়।
এদিকে গোয়েন্দা কর্মকর্তাদের ধারণা, এক-এগারোর ঘটনাপ্রবাহের প্রকৃত রহস্য উদ্ঘাটনে ওই দুই সম্পাদককে জিজ্ঞাসাবাদ করা প্রয়োজন হতে পারে।
এক-এগারোর ষড়যন্ত্রে সম্পৃক্ততার অভিযোগ নিয়ে প্রথম আলো সম্পাদক মতিউর রহমানের সঙ্গে একাধিকবার যোগাযোগের চেষ্টা করা হলেও তিনি ফোন ধরেননি বলে প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়েছে। এছাড়া বক্তব্য নেওয়ার জন্য প্রতিনিধি প্রথম আলো কার্যালয়ে গেলে জানানো হয়, তিনি অফিসে নেই।