• ঢাকা
  • বৃহস্পতিবার, ২২ অক্টোবর ২০২৬, ০৯:৪৮ এএম


ক্যান্সার আক্রান্ত স্ত্রীকে সাহস দিতে মাথা ন্যাড়া করলেন সামিয়ার স্বামী ও ছেলে

দি পালস বিডি অনলাইন ডেস্ক
আপডেট টাইম: ২০ অক্টোবর ২০২৬ ১১:২৯ পিএম

ক্যানসারে আক্রান্ত স্ত্রীকে সাহস জোগাতে নিজের মাথা ন্যাড়া করেছেন উপস্থাপক সামিয়া আফরিনের স্বামী এস এম রেজাউল ইমরান ও ছেলে আহানাফ আরাবি। কেমোথেরাপির কারণে চুল হারানোর কষ্ট যেন সামিয়াকে একা বহন করতে না হয়, সে জন্য তাঁদের এই ব্যতিক্রমী উদ্যোগ। কঠিন সময়ে পরিবারের এমন ভালোবাসা ও সমর্থন সামিয়ার ক্যানসারের বিরুদ্ধে লড়াইয়ে নতুন করে সাহস জোগাচ্ছে।বর্তমানে ডিম্বাশয়ের ক্যানসারের চিকিৎসায় কেমোথেরাপি নিচ্ছেন সামিয়া। চিকিৎসকেরা আগেই তাঁকে জানিয়েছিলেন, কেমোথেরাপির পার্শ্বপ্রতিক্রিয়ায় চুল পড়ে যেতে পারে। বিষয়টি মাথায় রেখে মানসিকভাবে প্রস্তুতি নিচ্ছিলেন তিনি। প্রথমে চুল ছোট করেন, পরে নিজের ছেলের হাতেই মাথা ন্যাড়া করান এই উপস্থাপক।কিন্তু এরপর ঘটে আবেগঘন এক ঘটনা। মায়ের প্রতি ভালোবাসা ও সংহতি প্রকাশ করতে ছেলে আহানাফ আরাবিও নিজের মাথা ন্যাড়া করে হাসিমুখে মায়ের সামনে হাজির হন। স্ত্রীকে কঠিন সময়ে একা অনুভব করতে দিতে চাননি স্বামী এস এম রেজাউল ইমরানও। তিনিও মাথার চুল ফেলে দিয়ে স্ত্রীর পাশে দাঁড়ান।গত ১৫ সেপ্টেম্বর মাথা ন্যাড়া করার একটি ভিডিও ফেসবুকে প্রকাশ করে নিজের অনুভূতির কথা জানান সামিয়া। কেমোথেরাপির কারণে চুল পড়ে যাওয়াকে কেন্দ্র করে মন খারাপ না করে পরিস্থিতি স্বাভাবিকভাবে মেনে নেওয়ার সিদ্ধান্ত নিয়েছেন তিনি। তাঁর উপলব্ধি, সবকিছু নিয়ে মন খারাপ করে লাভ নেই; বরং সময়ের সঙ্গে নিজেকে মানিয়ে নেওয়াই গুরুত্বপূর্ণ।সম্প্রতি গণমাধ্যমকে সামিয়া বলেন, ‘চুল তো মানুষের বাহ্যিক সৌন্দর্য। চুল থাকুক বা না থাকুক, আত্মবিশ্বাসটাই মূল। আল্লাহ আমাকে বাঁচিয়ে রেখেছেন। হাঁটাচলা করতে পারছি, এটাই অনেক বড় পাওয়া।’প্রথমে কোলন ক্যানসার, পরে ডিম্বাশয়েসামিয়ার ক্যানসারের সঙ্গে লড়াই শুরু হয় ২০২২ সালে। ওই বছর প্রথম কোলন ক্যানসারে আক্রান্ত হওয়ার বিষয়টি জানতে পারেন তিনি। চিকিৎসকের পরামর্শে একই বছরের এপ্রিলে সিঙ্গাপুরে যান। সেখানে পরীক্ষা-নিরীক্ষার পর জানতে পারেন, তাঁর ক্যানসার চতুর্থ পর্যায়ে পৌঁছেছে।অস্ত্রোপচার ও কেমোথেরাপির কথা শুনে মানসিকভাবে ভেঙে পড়েছিলেন সামিয়া। এমনকি কোনো চিকিৎসা না করিয়েই দেশে ফিরে আসার কথাও ভেবেছিলেন তিনি।সেই অভিজ্ঞতা বর্ণনা করে সামিয়া বলেন, ‘চিকিৎসক দেবর যখন প্রথম খবরটা দিল, ভেবেছিলাম, যখন হয়েই গেছে, তখন আর কী করা যাবে! সন্ধ্যায় সেজেগুজে দাওয়াত খেতেও গিয়েছি। কিন্তু সিঙ্গাপুরে গিয়ে যখন শুনলাম ক্যানসার চতুর্থ পর্যায়ে, অস্ত্রোপচার করতে হবে, কেমোথেরাপি দিতে হবে, তখন ভেঙে পড়ি। অনেক কান্নাকাটি করেছি। মনে হয়েছিল, চিকিৎসা নিলে আমার পুরো জীবনযাপন বদলে যাবে।’পরে সিঙ্গাপুরের এক চিকিৎসক তাঁকে ইমিউনোথেরাপি নেওয়ার পরামর্শ দেন। ব্যয়বহুল হলেও সেই চিকিৎসা নিতে রাজি হন সামিয়া। এরপর শুরু হয় ক্যানসারের বিরুদ্ধে তাঁর নতুন লড়াই।প্রতি ২১ দিন পরপর তাঁকে এই চিকিৎসা নিতে হতো। তবে চিকিৎসার পার্শ্বপ্রতিক্রিয়া ছিল বেশ তীব্র। প্রথম থেরাপির পর ঠিকমতো ঢোক গিলতে পারতেন না তিনি। ত্বকেও দেখা দিয়েছিল চুলকানি। সিঙ্গাপুরে যাওয়ার সময় হেঁটে চলাফেরা করতে পারলেও দেশে ফেরার সময় হুইলচেয়ারের প্রয়োজন হয়েছিল।২০২৩ সালে দেশে ফেরার পরও নানা শারীরিক জটিলতায় ভুগেছেন সামিয়া। একপর্যায়ে পাতলা পায়খানার সমস্যায় ডায়াপার পরে হাসপাতালে ভর্তি হতে হয় তাঁকে।শারীরিক যন্ত্রণার তীব্রতা বোঝাতে গিয়ে সামিয়া বলেন, ‘স্বাভাবিকভাবে সন্তান প্রসবের সময় যে যন্ত্রণা হয়, অনেকটা সে রকম যন্ত্রণা হতো।’এত কষ্টের মধ্যেও চিকিৎসা চালিয়ে গেছেন তিনি। প্রথম দিকে সিঙ্গাপুরে চিকিৎসা নিতে যাওয়ার সময় স্বামী, ননদসহ পরিবারের সদস্যরা তাঁর সঙ্গে যেতেন। পরে একাই যাতায়াত শুরু করেন সামিয়া। পরিবারের অন্য সদস্যদের কাজ থাকত। পাশাপাশি নিজেরও শক্ত থাকার ইচ্ছা ছিল তাঁর।চিকিৎসায় সাড়া পাওয়ার পর ধীরে ধীরে স্বাভাবিক জীবনে ফিরছিলেন সামিয়া। কিন্তু নিয়মিত ফলোআপের মধ্যে জেনেটিক পরীক্ষায় আবারও ক্যানসার ধরা পড়ে। এবার আক্রান্ত হয় তাঁর ডিম্বাশয়।গত ২২ জুলাই সিঙ্গাপুরে অস্ত্রোপচার করিয়েছেন তিনি। বর্তমানে দেশে চলছে কেমোথেরাপি। আগামী ডিসেম্বরের মধ্যে ছয়টি কেমোথেরাপির কোর্স শেষ হওয়ার কথা রয়েছে।এবারের চিকিৎসার অভিজ্ঞতা জানিয়ে সামিয়া বলেন, ‘খাবারে স্বাদ-গন্ধ কিছুই পাই না। মুখ লাল হয়ে যায়, মাথা চুলকায়। তবে কাউকে এই যন্ত্রণা বলে বোঝানো যাবে না। যিনি এর মধ্য দিয়ে যাবেন, তিনিই বুঝবেন।’জেনেটিক পরীক্ষায় তাঁর শরীরে জিনগত ত্রুটি ধরা পড়েছে বলেও জানিয়েছেন সামিয়া। এ কারণে ভবিষ্যতে শরীরের অন্য কোথাও ক্যানসার হওয়ার আশঙ্কা রয়েছে। তবে কঠিন পরিস্থিতির মধ্যেও আশা ছাড়তে চান না তিনি।সামিয়ার ভাষ্য, ‘আশা করছি, শরীরে আর ক্যানসার ফিরে আসবে না।’ক্যানসারের চিকিৎসায় শারীরিক কষ্ট, চুল হারানোর মানসিক চাপ এবং ভবিষ্যৎ নিয়ে অনিশ্চয়তার মধ্যেও সামিয়ার পাশে রয়েছেন তাঁর স্বামী ও ছেলে। তাঁদের এই ভালোবাসা ও সংহতি মনে করিয়ে দেয়, কঠিন অসুস্থতার সময়ে পরিবারের মানসিক সমর্থন একজন মানুষের সাহস ধরে রাখতে কতটা গুরুত্বপূর্ণ।

/বিএসএস