• ঢাকা
  • শনিবার, ১৭ অক্টোবর ২০২৬, ১২:০৮ এএম


মুসলিম ও আদিবাসী নারীদের ভাতার টাকাও গায়েব করে দিলো শুভেন্দু সরকার!

দি পালস বিডি অনলাইন ডেস্ক
আপডেট টাইম: ১৫ অক্টোবর ২০২৬ ৮:৪৬ পিএম

পশ্চিমবঙ্গের বাঁকুড়া জেলার পুনিশোল গ্রামের মুসলিম নারীদের পাশাপাশি জঙ্গলমহল এলাকার আদিবাসী নারীরাও অন্নপূর্ণা যোজনার ভাতা না পাওয়ার অভিযোগ তুলেছেন। বারবার আবেদন করেও আর্থিক সহায়তা না পাওয়ায় ক্ষোভ প্রকাশ করেছেন তাঁরা। সরকারি দপ্তরে গিয়েও সমস্যার সমাধান না হওয়া এবং অভিযোগ জানাতে গিয়ে হেনস্তা ও হুমকির মুখে পড়ার অভিযোগও করেছেন কয়েকজন নারী।বাঁকুড়া জেলার ওন্দা ব্লকের পুনিশোল গ্রাম আগে থেকেই ভোটার তালিকার বিশেষ নিবিড় পুনরীক্ষণ (এসআইআর) ঘিরে অনিশ্চয়তার মুখে পড়েছিল। গ্রামের প্রায় ৮ হাজার বৈধ ভোটারের নাম নিয়ে সংশয় তৈরি হয়েছিল। তাঁদের মধ্যে অনেক নারীকে ভোটার তালিকায় তথাকথিত ‘যুক্তিসংগত অসংগতি’র অভিযোগে শুনানির জন্য ডাকা হয়।নোটিশ পাওয়ার পর নিজেদের নাগরিকত্ব ও বৈধ ভোটার পরিচয় প্রমাণ করতে গিয়ে বিপাকে পড়েন বাসিন্দারা। কয়েকজন শুনানিতে উপস্থিত হলেও প্রশাসনিক কর্মকর্তারা তাঁদের বক্তব্যে যথাযথ গুরুত্ব দেননি বলে অভিযোগ করেন তাঁরা।গত ১৭ মার্চ পুনিশোলের ভুক্তভোগী নারী-পুরুষের সঙ্গে কথা বলে এ বিষয়ে একটি বিশেষ প্রতিবেদন প্রকাশ করে সংবাদমাধ্যম ‘দ্য ওয়্যার’। প্রতিবেদন প্রকাশের পর গ্রামবাসীরা সেটির কপি ও প্রয়োজনীয় নথিপত্র ওন্দা ব্লক অফিসে জমা দেন। পরে সরকারি কর্মকর্তারা গ্রাম পরিদর্শন করে নথিপত্র যাচাই করেন এবং যোগ্য ভোটারদের নাম তালিকায় পুনরায় অন্তর্ভুক্ত করেন। এতে তাঁরা ভোট দেওয়ার সুযোগ পান।নির্বাচনের দিন দীর্ঘ লাইনে দাঁড়িয়ে ভোট দেওয়ার সময় অনেক বাসিন্দা ক্ষোভ প্রকাশ করে বলেন, সংবাদমাধ্যম তাঁদের দুর্ভোগের কথা তুলে না ধরলে হয়তো ভোট দেওয়ার সুযোগও পেতেন না তাঁরা।তবে ভোটার তালিকা নিয়ে সেই অনিশ্চয়তা কাটতে না কাটতেই এবার সরকারি ভাতা না পাওয়ার অভিযোগে নতুন করে উদ্বেগ তৈরি হয়েছে পুনিশোলের নারীদের মধ্যে।‘বারবার আবেদন করেছি, কিন্তু টাকা আসেনি’পুনিশোলের ২০টি পাড়ায় ২৫ থেকে ৬০ বছর বয়সী প্রায় ৯ হাজার নারী বসবাস করেন। গ্রামের স্বাস্থ্যকর্মী গোলাম খাজার দাবি, প্রায় ৮ হাজার নারী অনলাইনে ও অফলাইনে অন্নপূর্ণা যোজনার জন্য আবেদন করলেও মাত্র ৫০০ জনের মতো নারী আর্থিক সহায়তা পেয়েছেন।স্থানীয় আশা কর্মী জাসিমা খাতুন বলেন, ভাতার টাকা কবে পাওয়া যাবে, তা জানতে নারীরা প্রায়ই তাঁর কাছে আসেন। কিন্তু তাঁদের প্রশ্নের উত্তর দেওয়ার মতো তথ্য তাঁর কাছে নেই।তিনি বলেন, ‘আমরা প্রতিদিন স্বাস্থ্য ও অন্যান্য বিষয়ে খবরখবর নিতে এই নারীদের বাড়ি বাড়ি যাই। অনেকেই আমাদের কাছে জানতে চান অন্নপূর্ণা যোজনার টাকা কবে আসবে। কিন্তু আমাদের কাছে দেওয়ার মতো কোনো উত্তর নেই।’গত শনিবার, ১০ অক্টোবর, ‘দ্য ওয়্যার’-এর প্রতিনিধি পুনিশোলের একাধিক পাড়ায় গিয়ে স্থানীয় নারীদের সঙ্গে কথা বলেন। তাঁদের অভিযোগ, পুনিশোল পঞ্চায়েত ও ওন্দা ব্লক অফিসে বারবার গিয়েও তাঁরা সমস্যার কোনো সমাধান পাননি। কেউ কেউ দাবি করেন, তাঁদের বক্তব্য না শুনেই কর্মকর্তারা দপ্তর থেকে বের করে দিয়েছেন।হাঁসদাবাদ পাড়ার গৃহবধূ রোশনা বিবি মণ্ডল, জারিনা বিবি মল্লিক, সোলেমা খাতুন ও লতিফুন বিবি জানান, সরকার যখন কাগজে আবেদন করতে বলেছে, তখন তাঁরা তা জমা দিয়েছেন। পরে অনলাইনে আবেদন করার নির্দেশ দেওয়া হলে সেটিও অনুসরণ করেছেন। কিন্তু এখন পর্যন্ত কোনো অর্থ পাননি তাঁরা।আবেদনের অবস্থা জানতে ব্লক অফিসে গেলে তাঁদের অভিযোগের বিষয়ে যথাযথ সাড়া দেওয়া হয়নি বলে দাবি করেন নারীরা। কয়েকজনের অভিযোগ, বারবার দপ্তরে যাওয়ার পর কিছু কর্মকর্তা তাঁদের বলেছেন, হিন্দু আবেদনকারীরা আগে টাকা পাবেন, এরপর মুসলিমরা পাবেন।ফাতেমা বিবি খান ও আখরুন খাতুন এ নিয়ে প্রশ্ন তুলে বলেন, ‘এটা কী ধরনের বিচার?’স্থানীয় নারীদের দাবি, তৃণমূল কংগ্রেস সরকারের আমলে চালু হওয়া লক্ষ্মীর ভান্ডার প্রকল্পের আওতায় তাঁরা মাসে ১ হাজার ৫০০ রুপি পেতেন। তাঁদের অভিযোগ, বর্তমান বিজেপি নেতৃত্বাধীন সরকার ভাতার পরিমাণ বাড়িয়ে ৩ হাজার রুপি করার পরও তাঁরা টাকা পাচ্ছেন না।কেন তাঁদের আবেদন আটকে রয়েছে, সে বিষয়ে কোনো স্পষ্ট ব্যাখ্যা দেওয়া হচ্ছে না বলে অভিযোগ করেন তাঁরা। তাঁদের প্রশ্ন, আবেদনে কোনো ভুল থাকলে তা জানানো হচ্ছে না কেন? শুধু মুসলিম হওয়ার কারণে তাঁদের ভাতা দেওয়া হচ্ছে না কি না, সেই সন্দেহও প্রকাশ করেছেন কয়েকজন নারী।আখরুন খাতুন বলেন, ‘হিন্দু-মুসলিম সবাই এক হয়ে ভোট দিয়ে সরকার গঠন করেছি। তাহলে এখানে আমাদের সঙ্গে কেন এই বৈষম্য? আগে তো কখনো এমন ঘটেনি।’জারিনা বিবির দাবি, হাঁসদাবাদ পাড়ার কোনো নারীই এখন পর্যন্ত অন্নপূর্ণা যোজনার টাকা পাননি। তিনি বলেন, ‘ওরা খালি নথিপত্র জমা নেয় আর বলে যাচাই করা হচ্ছে। কিন্তু কাজের কাজ কিছুই হয় না।’বারবার দপ্তরে গিয়ে অপমানিত হওয়ার আশঙ্কায় এখন অনেক নারী ব্লক অফিসে যেতেও ভয় পাচ্ছেন বলে জানান। জ্যোৎস্না খাতুন ও হাবিবা বিবি মণ্ডল বলেন, ‘আমরা এখন ব্লক অফিসে যেতে ভয় পাই। যদি আবার আমাদের অপমান করে তাড়িয়ে দেয়?’ফিরোজা খাতুনসহ অন্য নারীরাও আগের অভিজ্ঞতার কথা তুলে ধরে প্রশ্ন করেন, ভোটার তালিকা থেকে নাম বাদ পড়ার আশঙ্কা এবং হয়রানির পর এবার ভাতার জন্য তাঁরা কার কাছে যাবেন। তাঁদের দাবি, ‘দ্য ওয়্যার’-এর প্রতিবেদন কর্মকর্তাদের সামনে তুলে ধরার পরই ভোটার তালিকা নিয়ে তাঁদের ভোগান্তির অবসান হয়েছিল।‘সংসার চালাতে এই টাকাটা খুব দরকার ছিল’দরিদ্র পরিবারগুলোর কাছে সরকারি ভাতার অর্থ গুরুত্বপূর্ণ বলে জানিয়েছেন স্থানীয় নারীরা। তাঁদের বক্তব্য, এই টাকা দিয়ে সংসারের নিত্যপ্রয়োজনীয় খরচ মেটাতে কিছুটা সুবিধা হতো।লতিফুন বিবি মণ্ডল জানান, তাঁদের পরিবারের পুরুষ সদস্যরা প্রতিদিন ভোরে সাইকেল নিয়ে বাঁকুড়া, তালড্যাংরা, ওন্দাসহ বিভিন্ন এলাকায় কাজের সন্ধানে বেরিয়ে পড়েন। তাঁরা বাড়ি বাড়ি ঘুরে পুরোনো বস্তা, বই-খাতা, সংবাদপত্র, লোহালক্কড় ও ভাঙাচোরা জিনিস কম দামে কিনে সামান্য লাভে বিক্রি করেন।লতিফুন বিবি বলেন, লক্ষ্মীর ভান্ডারের টাকা দিয়ে তাঁদের সংসার কোনোমতে চলত। কিন্তু এখন সেই অর্থও বন্ধ হয়ে যাওয়ায় আর্থিক চাপ বেড়েছে।জ্যোৎস্না বেগম ও হাবিবা বিবি মণ্ডলও একই ধরনের ক্ষোভ প্রকাশ করেন। প্রয়োজন হলে তাঁরা আবারও ওন্দা ব্লক অফিসে গিয়ে অবস্থান কর্মসূচি পালন করবেন বলে জানিয়েছেন। তাঁদের বক্তব্য, সরকারি নিয়ম মেনে আবেদন করার পরও কেন ভাতা দেওয়া হচ্ছে না, তার স্পষ্ট জবাব দিতে হবে।কারিগরি সমস্যার কথা বলছেন বিজেপি বিধায়কপুনিশোলের বিপুলসংখ্যক নারী কেন ভাতা পাচ্ছেন না, সে বিষয়ে জানতে চাওয়া হলে ওন্দার বিজেপি বিধায়ক অমরনাথ শাখা জানান, কিছু আবেদনকারীর একাধিক ব্যাংক অ্যাকাউন্ট থাকতে পারে। আবার কারও ব্যাংক অ্যাকাউন্টের সঙ্গে আধার কার্ড যুক্ত না থাকায় অর্থ পাঠানোর প্রক্রিয়া আটকে যেতে পারে।তবে বিধায়কের এই ব্যাখ্যা মানতে নারাজ ক্ষুব্ধ নারীরা। হাঁসদাবাদের বাসিন্দা নাসুদা বিবি খান ও জারিনা বিবি মল্লিক বলেন, তাঁরা রাত জেগে বাঁকুড়া হেড পোস্ট অফিসে গিয়ে মোবাইল নম্বরের সঙ্গে আধার কার্ড যুক্ত করিয়েছেন। ফলে ব্যাংক হিসাব বা আধার সংযোগের সমস্যার কথা বলে তাঁদের আবেদন আটকে রাখার ব্যাখ্যা তাঁরা মেনে নিতে পারছেন না।এ অবস্থায় আবেদন যাচাইয়ের প্রকৃত অবস্থা এবং অর্থ ছাড়ে বিলম্বের কারণ নিয়ে প্রশ্ন তুলেছেন ভুক্তভোগীরা। তাঁদের দাবি, আবেদন বাতিল বা স্থগিত থাকলে তার কারণ স্পষ্টভাবে জানানো হোক।ভাতা না পাওয়ার অভিযোগ আদিবাসী নারীদেরওপুনিশোলের মুসলিম নারীদের পাশাপাশি বাঁকুড়া জেলার জঙ্গলমহল এলাকার তপশিলি উপজাতিভুক্ত নারীরাও অন্নপূর্ণা যোজনার সুবিধা না পাওয়ার অভিযোগ তুলেছেন।বাঁকুড়ার জঙ্গলমহল অঞ্চলে উল্লেখযোগ্যসংখ্যক আদিবাসী জনগোষ্ঠীর বসবাস। রানিবাঁধ, রাউতোড়া ও বারিকুল এলাকার জনসংখ্যার অর্ধেকেরও বেশি সাঁওতাল, শবর, মাহালি, ভূমিজ, মুণ্ডা ও কোড়া সম্প্রদায়ের মানুষ বলে প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়েছে।আদিবাসী নারীদের অভিযোগ, তাঁরাও সরকারি ভাতার সুবিধা থেকে বঞ্চিত হচ্ছেন। এ বিষয়ে সরব হতে গিয়ে কয়েকজন হুমকি ও ধমকের মুখে পড়েছেন বলেও অভিযোগ উঠেছে।সব মিলিয়ে পুনিশোলসহ বাঁকুড়ার বিভিন্ন এলাকার নারীদের অভিযোগ, নিয়ম মেনে আবেদন করার পরও তাঁরা সরকারি আর্থিক সহায়তা পাচ্ছেন না। আবেদন যাচাইয়ের অগ্রগতি, অর্থ ছাড়ে বিলম্বের কারণ এবং ভুক্তভোগীদের অভিযোগের বিষয়ে সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষের স্পষ্ট ব্যাখ্যা দাবি করেছেন তাঁরা।

/বিএসএস