• ঢাকা
  • মঙ্গলবার, ১৩ অক্টোবর ২০২৬, ০২:০২ এএম


চিকিৎসকের অবহেলায় স্ত্রীর মৃত্যু, মামলা না করার শর্তে টাকা নেন স্বামী

দি পালস বিডি অনলাইন ডেস্ক
আপডেট টাইম: ১১ অক্টোবর ২০২৬ ৭:৩৯ পিএম

পেটে গজ রেখেই সেলাই, মৃত্যুর পর সামনে এল টাকা নেওয়ার চুক্তিফরিদপুর প্রতিনিধি: ফরিদপুর মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে সিজারিয়ান অস্ত্রোপচারের সময় পেটে গজ রেখেই সেলাই করে দেওয়ার অভিযোগ উঠেছে চিকিৎসকের বিরুদ্ধে। পরে পেটে গজ রেখে দেওয়ার কারণে সংক্রমণ ও নানা শারীরিক জটিলতায় ভুগে মারা গেছেন নার্স বীথি আক্তার। তাঁর মৃত্যুর পর হাসপাতাল কর্তৃপক্ষের কাছ থেকে ‘মামলা না করার শর্তে’ আর্থিক সহায়তা নেওয়ার একটি চুক্তির তথ্য সামনে এসেছে। ওই চুক্তিতে বীথির স্বামী রাকিবুল ইসলামের স্বাক্ষর রয়েছে।সময়ের সংবাদে প্রকাশিত প্রতিবেদন অনুযায়ী, ১০০ টাকার নন-জুডিশিয়াল স্ট্যাম্পে করা চুক্তিতে উল্লেখ রয়েছে, আর্থিক সহায়তা গ্রহণের পর রোগীর পরিবার হাসপাতাল কর্তৃপক্ষের বিরুদ্ধে ভবিষ্যতে কোনো আইনি ব্যবস্থা নেবে না বা আর্থিক দাবি জানাবে না। চুক্তিতে ৫৫ হাজার টাকা দেওয়ার কথা উল্লেখ রয়েছে। তবে নথিতে হাসপাতাল কর্তৃপক্ষ ও সাক্ষীদের স্বাক্ষর ঝাপসা করে দেওয়া হয়েছে।বীথির মৃত্যুর পর সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে দেওয়া এক পোস্টে তাঁর স্বামী রাকিবুল ইসলাম আর্থিক সহায়তা নেওয়ার বিষয়টি তুলে ধরেন। তিনি জানান, ওই সময় তাঁর কাছে মাত্র ২০ হাজার টাকা ছিল। হাসপাতালের বকেয়া বিলসহ বিভিন্ন আর্থিক চাপে পড়েছিলেন তিনি। এমন পরিস্থিতিতে স্ট্যাম্পে স্বাক্ষর করে ৫০ হাজার টাকা নিয়েছিলেন বলে দাবি করেন রাকিবুল। পরিবারের ভবিষ্যৎ ও আর্থিক পরিস্থিতি বিবেচনা করেই তখন তিনি ওই সিদ্ধান্ত নিয়েছিলেন বলে জানান।এ বিষয়ে ফরিদপুর মেডিকেল কলেজ হাসপাতালের উপপরিচালক ও ভারপ্রাপ্ত পরিচালক মানস কৃষ্ণ কুন্ডু বলেন, হাসপাতাল কর্তৃপক্ষের টাকা দেওয়ার বিষয়টি তাঁর জানা নেই। তবে বিষয়টি শুনেছেন এবং সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে তা ছড়িয়ে পড়েছে বলে জেনেছেন। বীথির চিকিৎসার জন্য মেডিকেল বোর্ড গঠন করা হয়েছিল। বোর্ডের সিদ্ধান্ত অনুযায়ী তাঁকে ঢাকায় পাঠানো হয়। সেখানে চিকিৎসাধীন অবস্থায় তাঁর মৃত্যু হয়।বীথির চিকিৎসায় কোনো ধরনের অবহেলা হয়েছিল কি না, তা খতিয়ে দেখতে তদন্ত কমিটি গঠন করা হয়েছে বলেও জানান তিনি। হাসপাতালের সার্জারি বিভাগের বিভাগীয় প্রধান ডা. স্বপন কুমার বিশ্বাসকে প্রধান করে ছয় সদস্যের কমিটি গঠন করা হয়েছে। আগামী ১০ দিনের মধ্যে তদন্ত প্রতিবেদন জমা দিতে বলা হয়েছে। প্রতিবেদন পাওয়ার পর সে অনুযায়ী ব্যবস্থা নেওয়া হবে বলে জানান হাসপাতালের ভারপ্রাপ্ত পরিচালক।গত ৮ অক্টোবর বৃহস্পতিবার সকাল সাড়ে ৮টার দিকে ঢাকা মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে চিকিৎসাধীন অবস্থায় মারা যান বীথি আক্তার। তিনি রাজবাড়ী জেলার গোয়ালন্দ উপজেলার উজানচর ইউনিয়নের জামতলার হাট জ্যোতিনবর্দিপাড়া গ্রামের রাকিবুল ইসলামের স্ত্রী ছিলেন। বীথি ফরিদপুর শহরের একটি নার্সিং কলেজের শিক্ষার্থী ছিলেন। পাশাপাশি ফরিদপুর মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে প্রশিক্ষণার্থী হিসেবে কাজ করতেন।পরিবারের সদস্যদের ভাষ্য অনুযায়ী, গত ৬ মে ফরিদপুর মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে বীথির সিজারিয়ান অস্ত্রোপচার করেন ডা. তামান্না আক্তার ও ইন্টার্ন চিকিৎসক অরবিন্দু। অস্ত্রোপচারের মাধ্যমে তিনি একটি পুত্রসন্তানের জন্ম দেন। পাঁচ দিন পর হাসপাতাল থেকে ছাড়পত্র নিয়ে স্বামীর বাড়িতে চলে যান তিনি। এরপর থেকেই তাঁর শারীরিক অসুস্থতা ও নানা জটিলতা দেখা দিতে থাকে।একপর্যায়ে অস্ত্রোপচারকারী চিকিৎসকের শরণাপন্ন হন বীথি। তবে গুরুতর কোনো সমস্যা নেই বলে তাঁকে বাড়িতে পাঠিয়ে দেওয়া হয় বলে পরিবারের অভিযোগ। কিন্তু সময়ের সঙ্গে সঙ্গে তাঁর শারীরিক অবস্থার অবনতি হতে থাকে। প্রায় দেড় মাস পর দুটি বেসরকারি হাসপাতালে দুই দফায় আল্ট্রাসনোগ্রাম করানো হলে তাঁর পেটের ভেতরে গজ কাপড় থাকার বিষয়টি ধরা পড়ে বলে পরিবারের সদস্যরা জানান।এরপর গত ১২ জুলাই বীথিকে ফরিদপুর মেডিকেল কলেজ হাসপাতালের সার্জারি ওয়ার্ডে ভর্তি করা হয়। তিন দিন পর, ১৫ জুলাই, সার্জারি বিভাগের সহযোগী অধ্যাপক ফজলুল হক শোভন ও সঞ্জয় সাহা দ্বিতীয় অস্ত্রোপচার করে তাঁর পেট থেকে গজ কাপড় বের করেন। তত দিনে পেটের নাড়িতে পচন ধরে সংক্রমণ দেখা দিয়েছিল বলে জানা যায়।পরবর্তী সময়ে ২২ জুলাই তাঁকে ছাড়পত্র দিয়ে বাড়িতে পাঠানো হয়। তবে পেটের ভেতরে সংক্রমণের মাত্রা বেড়ে যাওয়ায় গত ২০ সেপ্টেম্বর থেকে ৪ অক্টোবর পর্যন্ত আবারও ফরিদপুর মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে চিকিৎসাধীন ছিলেন তিনি।শারীরিক অবস্থার অবনতি হলে গত ২ অক্টোবর বীথি নিজেই বাঁচার আকুতি জানিয়েছিলেন। তাঁর চিকিৎসা ও অবস্থার অবনতি নিয়ে হাসপাতাল কর্তৃপক্ষের বিরুদ্ধে অবহেলার অভিযোগ তোলেন স্বজনরা।পরে আশঙ্কাজনক অবস্থায় গত ৪ অক্টোবর বীথিকে ফরিদপুর মেডিকেল কলেজ হাসপাতাল থেকে ঢাকা মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে পাঠানো হয়। ঢাকায় নেওয়ার পর তাঁর শারীরিক অবস্থার আরও অবনতি ঘটে। চার দিন চিকিৎসাধীন থাকার পর ৮ অক্টোবর সকালে মারা যান তিনি। ওই দিন দুপুরে তাঁর মরদেহ গ্রামের বাড়িতে নেওয়া হয়। জানাজা শেষে তাঁকে দাফন করা হয়।বীথির চিকিৎসায় অবহেলার অভিযোগ এবং আর্থিক সহায়তা গ্রহণের চুক্তি—দুটি বিষয়ই এখন আলোচনায় এসেছে। তবে চিকিৎসায় অবহেলার অভিযোগের সত্যতা এবং চুক্তির বিষয়ে হাসপাতাল কর্তৃপক্ষের ভূমিকা তদন্তের মাধ্যমে স্পষ্ট হবে।

সূত্র: সময় সংবাদ

/বিএসএস