জীবনের প্রায় ৭০ বছর ধরে গাছ লাগিয়েছেন তিনি। নিজের বাড়ির আঙিনা, প্রতিবেশীর উঠান কিংবা সরকারি রাস্তার পাশ—যেখানেই একটু খালি জায়গা পেয়েছেন, সেখানেই রোপণ করেছেন গাছ। শুধু নিজের গ্রামেই নয়, আশপাশের অন্তত ১০ গ্রামজুড়ে ছড়িয়ে আছে তার হাতে লাগানো হাজার হাজার গাছ। এ পর্যন্ত অন্তত ৫০ হাজার গাছ লাগিয়েছেন বলে জানান তিনি।তিনি মসজিদের ইমাম সিরাজুল ইসলাম হাওলাদার। বরিশাল বিভাগের পটুয়াখালী জেলার গলাচিপা উপজেলার ডাকুয়া ইউনিয়নের পূর্ব আটখালী গ্রামের বাসিন্দা। দীর্ঘদিন ধরে বৃক্ষরোপণ ও গাছের পরিচর্যা করে আসায় স্থানীয়দের কাছে তিনি ‘বৃক্ষপ্রেমী সিরাজুল ইসলাম’ নামে পরিচিত।তবে যে মানুষটি জীবনের দীর্ঘ সময় প্রকৃতিকে সবুজ রাখতে কাজ করে গেছেন, জীবনের শেষ প্রান্তে এসে সেই মানুষটিই এখন চরম দুর্দশার মধ্যে দিন কাটাচ্ছেন। বয়সের ভারে শরীর নুয়ে পড়েছে। দীর্ঘদিন ধরে ভুগছেন নানা রোগে। অর্থের অভাবে প্রয়োজনীয় চিকিৎসা করাতে পারছেন না তিনি। অসুস্থ শরীর নিয়েও অবশ্য থেমে নেই তার বৃক্ষরোপণের কাজ।পটুয়াখালী শহর থেকে প্রায় ৪০ কিলোমিটার দক্ষিণে ডাকুয়া ইউনিয়নের একটি টিনশেড ঘরে পরিবার নিয়ে বসবাস করেন সিরাজুল ইসলাম। ইউনিয়নের বিভিন্ন গ্রামে ঘুরলে এখনো চোখে পড়ে তার হাতে লাগানো অসংখ্য গাছ। কোনো কোনো গাছের বয়স ৪০ থেকে ৫০ বছর। দীর্ঘ সময় ধরে এসব গাছকে নিজের সন্তানের মতো যত্ন করে বড় করেছেন তিনি।সিরাজুল ইসলাম জানান, ছোটবেলা থেকেই গাছ লাগানোর প্রতি তার আলাদা টান ছিল। বাড়িতে নিজেই বিভিন্ন প্রজাতির চারা তৈরি করতেন। প্রয়োজন হলে বাজার থেকেও চারা কিনে আনতেন। বর্ষাকালেই মূলত বেশি গাছ লাগাতেন তিনি। বছরের অন্য সময়গুলোতে লাগানো গাছের পরিচর্যা করতেন।তার লাগানো গাছের মধ্যে রয়েছে সুপারি, নারিকেল, পেয়ারা, জাম্বুরা, গাব, তাল, মেহগনি, রেইনট্রি ও সুন্দরীসহ বিভিন্ন প্রজাতির গাছ।সিরাজুল ইসলাম বাবা আলতাফ হোসেন হাওলাদারের সাত ছেলের মধ্যে সবার ছোট। ১৯৮৬ সালে ঢাকা নেছারিয়া কামিল মাদ্রাসা থেকে কামিল (এমএ) পাস করেন তিনি। এরপর গলাচিপা শহর ও নিজ গ্রামের বিভিন্ন মসজিদে প্রায় ৪৫ বছর ইমাম হিসেবে দায়িত্ব পালন করেছেন।স্বল্প বেতনের ইমামতির আয় দিয়েই কোনোভাবে সংসার চালিয়েছেন তিনি। দীর্ঘদিনের অভাব-অনটনের মধ্যেও বৃক্ষরোপণ থেকে নিজেকে কখনো দূরে রাখেননি। নিজের সামর্থ্যের বাইরে গিয়েও চারা কিনে গাছ লাগিয়েছেন।বর্তমানে অর্থের সংকট আরও তীব্র হয়েছে। এরপরও গাছ লাগানোর অভ্যাস ছাড়েননি সিরাজুল ইসলাম। তিনি জানান, এখন বাজার থেকে ধার-দেনা করে চারা কিনে সেগুলো রোপণ করছেন।যে মানুষটি জীবনের সাত দশক ধরে নিজের সামর্থ্য অনুযায়ী চারদিকে সবুজ ছড়িয়ে দিয়েছেন, জীবনের শেষ সময়ে এসে তার নিজের চিকিৎসা ও জীবনযাপনের জন্য প্রয়োজনীয় সহায়তার অভাবই এখন বড় হয়ে দেখা দিয়েছে।
/বিএসএস