কনটেন্ট ক্রিয়েটর সালমান মুক্তাদিরের শ্বশুর শেখ নুর ইসলামের ‘অননুমোদিত’ ওয়্যারহাউসে শুল্কমুক্ত মদ রাখার অভিযোগে চারটি ওয়্যারহাউস সিলগালা করা হয়েছে।
বৃহস্পতিবার (১ অক্টোবর) গভীর রাতে দক্ষিণ গুলশানের ‘টস বন্ড প্রাইভেট লিমিটেড’-এ যৌথ অভিযান চালিয়ে গুদামগুলো সিলগালা করা হয় বলে জাতীয় রাজস্ব বোর্ডের (এনবিআর) এক সংবাদ বিজ্ঞপ্তিতে জানানো হয়েছে।
এনবিআর জানায়, কাস্টমস গোয়েন্দা ও তদন্ত অধিদপ্তর (সিআইআইডি), মাদকদ্রব্য নিয়ন্ত্রণ অধিদপ্তর এবং স্পেশাল রেসপন্স ব্যাটালিয়ন (এসআরবি) যৌথভাবে অভিযানটি পরিচালনা করে। অভিযানে প্রাথমিকভাবে ‘গুরুতর অসংগতি’ পাওয়া যাওয়ায় ‘অধিকতর যাচাইয়ের জন্য’ ওয়্যারহাউসগুলো সিলগালা করা হয়েছে।
জানা গেছে, সিলগালা করা ‘টস বন্ড প্রাইভেট লিমিটেড’ সরাসরি সালমান মুক্তাদিরের শ্বশুর শেখ নুর ইসলামের মালিকানাধীন না হলেও তার ছত্রছায়াতেই প্রতিষ্ঠানটি পরিচালিত হতো।
গোয়েন্দা কর্মকর্তারা জানান, ‘টস বন্ড’ একটি ডিপ্লোমেটিক ওয়্যারহাউস, যেখান থেকে বিদেশি কূটনীতিকদের শুল্কমুক্ত অ্যালকোহল সরবরাহ করা হয়। তবে প্রতিষ্ঠানটির বিরুদ্ধে শুল্কমুক্ত পণ্য খোলাবাজারে বিক্রির অভিযোগ ওঠার পর কয়েক মাস ধরে বিষয়টি নিয়ে অনুসন্ধান চলছিল।
এদিকে এনবিআরের সিআইসি ও আয়কর গোয়েন্দা ইউনিট কানাডা থেকেও গোয়েন্দা প্রতিবেদন সংগ্রহ করেছে। এসব প্রতিবেদনে নুর ইসলাম ও তার পরিবারের সদস্যদের কানাডার নাগরিকত্বসহ ‘সন্দেহজনক’ লেনদেন এবং অন্তত চারটি কোম্পানির মালিকানায় থাকার তথ্য পাওয়া গেছে বলে জানা গেছে।
কানাডা থেকে পাওয়া গোয়েন্দা প্রতিবেদনে ঢাকার এই কূটনৈতিক বন্ডেড ওয়্যারহাউসের পরিচালক হিসেবে নুর ইসলাম, তার স্ত্রী শীলা ইসলাম এবং মেয়ে তাসনিম ইসলামের নাম রয়েছে।
এনবিআরের ভাষ্য, প্রতিষ্ঠানটির ‘অনুমোদিত’ বা ‘ঘোষিত’ গুদামের সংখ্যা দুটি। কিন্তু অভিযানের সময় সেখানে মোট চারটি গুদামে পণ্য মজুত থাকার তথ্য পাওয়া যায়।
এ বিষয়ে শুল্ক গোয়েন্দা ও তদন্ত অধিদপ্তরের মহাপরিচালক মোহাম্মদ সফিউর রহমান কালবেলাকে বলেন, ‘আমরা টস বন্ডের অনুমোদনের বাইরে দুটি অবৈধ গুদামে মজুতের প্রমাণ পেয়েছি। তাই গুদামগুলো সিলগালা করা হয়েছে।’
তিনি আরও জানান, অধিকতর যাচাই-বাছাইয়ের জন্য বন্ড কমিশনারেট থেকে নথিপত্র নেওয়ার ব্যবস্থাও করা হয়েছে।
সংস্থাটির কর্মকর্তারা বলেন, বন্ড সুবিধায় আমদানি করা শুল্কমুক্ত পণ্য যেন অননুমোদিত গুদামে স্থানান্তর বা অপসারণ করা না হয় এবং সুষ্ঠু তদন্ত নিশ্চিত করা যায়, সে জন্য প্রতিষ্ঠানটির চারটি গুদামই সিলগালা করা হয়েছে।
এনবিআরের সংবাদ বিজ্ঞপ্তিতে বলা হয়েছে, তদন্ত ও বিস্তারিত ‘যাচাই কার্যক্রম’ চলমান রয়েছে।
শুল্ক গোয়েন্দার এক কর্মকর্তা জানান, বৃহস্পতিবার রাত সাড়ে ১০টা থেকে ভোর সাড়ে ৪টা পর্যন্ত অভিযানটি চলে।
দেশে মদ ও বারের ব্যবসায় বিভিন্ন অনিয়মের অভিযোগের পাশাপাশি কানাডায় নুর ইসলাম ও তার পরিবারের নাগরিকত্ব এবং সম্পদের তথ্য পাওয়ার পর কর আদায়কারী গোয়েন্দা সংস্থাগুলোও বিষয়টি নিয়ে তদন্ত করছিল।
তবে সম্প্রতি ঢাকার নিউ গিনি প্রপার্টিজের প্রকল্প এলাকায় সালমান মুক্তাদিরের স্টুডিওতে হামলার ঘটনায় ক্ষমতাসীনদের দায়ী করার পর এই তদন্ত আরও গতি পায়।
কানাডা থেকে সিআইসি এবং আয়কর গোয়েন্দা ইউনিট যে তথ্য সংগ্রহ করেছে, তাতে ২০১২ সালের ২৬ এপ্রিল থেকে ২০২২ সালের ১৯ এপ্রিল পর্যন্ত নুরুল ইসলামের পরিবারের লেনদেনের হিসাব বিশ্লেষণ করা হয়েছে। ওই সময়ের মোট ১৬৩টি আর্থিক প্রতিবেদনও খতিয়ে দেখা হয়েছে। এতে এক বছরে প্রায় ৯৫ কোটি টাকা রেমিট্যান্স আনার তথ্য পাওয়া গেছে।
সিআইসি, আয়কর গোয়েন্দা ও এনবিআরের একাধিক জ্যেষ্ঠ কর্মকর্তা এসব তথ্য জানিয়েছেন। সংশ্লিষ্ট নথির সারাংশের অনুলিপিও গণমাধ্যমকে দেখানো হয়েছে।
তদন্ত কর্মকর্তারা দাবি করছেন, এই অভিযান ও তদন্ত সালমান মুক্তাদিরের সাম্প্রতিক ‘ঘটনার সঙ্গে সম্পৃক্ত নয়’।
সিআইসির একজন কর্মকর্তা বলেন, ‘সালমান মুক্তাদির এখানে ইস্যু নয়। সব গোয়েন্দা সংস্থাই আগে থেকে কাজ করছিল। তা থেকে কিছু প্রমাণও মিলেছে। সামনে হয়তো অভিযানও দেখবেন।’
আয়কর গোয়েন্দা ইউনিটের একজন কর্মকর্তা বলেন, ‘দেখেন, নুর ইসলামের তো নানান ব্যবসা। মদের ব্যবসা। তার বন্ডেড ওয়্যারহাউজ আছে। তার বিরুদ্ধে নানান অভিযোগ ছিলই। আমরা এরমধ্যে জানতে পেলাম যে তার ও তার পরিবারের কারো কারো বিদেশি নাগরিকত্ব আছে।’
তিনি আরও বলেন, ‘এসব কিছুই কর নথিতে নেই। তখন আমরা কাজ শুরু করি। কিন্তু যেহেতু কেবল এখানে আয়কর নয়, ভ্যাট (মূল্য সংযোজন কর-মূসক বা ভ্যাট), আমদানির ক্ষেত্রে শুল্কের ব্যাপার আছে। সবাই মিলেই কাজ করছি।’
এর আগে গত ২৬ সেপ্টেম্বর রাতে ঢাকার দক্ষিণ মানিকদীতে নিউ গিনি আবাসন প্রকল্পের বিভিন্ন স্থাপনায় হামলা ও ভাঙচুরের ঘটনা ঘটে। ওই হামলায় ক্ষতিগ্রস্ত হয় কনটেন্ট ক্রিয়েটর সালমান মুক্তাদিরের স্টুডিও ‘ব্রাউনফিশ’ও।
ঘটনার পর ফেসবুক লাইভে সালমান মুক্তাদির হামলার জন্য ‘বিএনপির চাঁদাবাজিকে’ দায়ী করেন। এ সময় তিনি স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী সালাহউদ্দিন আহমদকে উদ্দেশ করেও বিভিন্ন মন্তব্য করেন। পরে অবশ্য ক্ষমতাসীনদের বিরুদ্ধে চাঁদাবাজির অভিযোগ থেকে সরে আসেন এই কনটেন্ট ক্রিয়েটর।
তবে হামলার ঘটনায় নিউ গিনি প্রোপার্টিজের পরিচালক সাইফুল ইসলাম ভূঁইয়া যে মামলা করেন, সেখানে জমি দখল ও পূর্বশত্রুতার জেরে হামলা চালানোর কথা উল্লেখ করা হয়।
ওই মামলায় অবসরপ্রাপ্ত মেজর জেনারেল গোলাম মহিউদ্দিন চৌধুরীসহ ১৩ জনকে আসামি করা হয়। এ ছাড়া অজ্ঞাতনামা আসামি করা হয় ১৫০ থেকে ২০০ জনকে।
মামলায় এখন পর্যন্ত গোলাম মহিউদ্দিন চৌধুরী এবং কুষ্টিয়া-২ আসনের জামায়াতে ইসলামীর সংসদ সদস্য আব্দুল গফুরের জামাতা মিজানুর রহমানসহ সাতজনকে গ্রেপ্তারের খবর জানিয়েছে পুলিশ। এর মধ্যে বুধবার সালমান মুক্তাদিরের ব্যাংক হিসাব তলব করে বাংলাদেশ ফাইন্যান্সিয়াল ইন্টেলিজেন্স ইউনিট (বিএফআইইউ)।
/এসএন