পারস্পরিক রাজনৈতিক আস্থা আরও গভীর হওয়া, অর্থনৈতিক ও বাণিজ্যিক সহযোগিতায় অগ্রগতি এবং দুই দেশের জনগণের মধ্যে ক্রমবর্ধমান উষ্ণ যোগাযোগের কারণে চীন-বাংলাদেশ দ্বিপক্ষীয় সম্পর্ক বর্তমানে ইতিহাসের সর্বোচ্চ পর্যায়ে রয়েছে বলে মন্তব্য করেছেন বাংলাদেশে নিযুক্ত চীনের রাষ্ট্রদূত ইয়াও ওয়েন।
গণপ্রজাতন্ত্রী চীনের প্রতিষ্ঠার ৭৭তম বার্ষিকী উপলক্ষে ‘অর্ধশতাব্দীরও বেশি সময় হাতে হাত রেখে, আরও উজ্জ্বল ভবিষ্যতের পথে’ শীর্ষক এক বিবৃতিতে তিনি এ কথা বলেন। তিনি বলেন, এই বন্ধুত্ব দুই দেশ ও তাদের জনগণের মৌলিক স্বার্থে কাজ করে। নানা চ্যালেঞ্জ সত্ত্বেও দ্বিপক্ষীয় সহযোগিতা অব্যাহতভাবে এগিয়ে যাবে বলেও তিনি আশা প্রকাশ করেন।
চীনের রাষ্ট্রদূত বলেন, বেইজিং বাংলাদেশের নতুন সরকারকে দেশ পরিচালনায় সমর্থন করে যাচ্ছে। একই সঙ্গে বাংলাদেশের স্বাধীনতা, সার্বভৌমত্ব ও ভৌগোলিক অখণ্ডতা রক্ষায় চীন সমর্থন অব্যাহত রাখবে, বহিরাগত হস্তক্ষেপের বিরোধিতা করবে এবং আঞ্চলিক ও আন্তর্জাতিক অঙ্গনে বাংলাদেশের আরও বড় ভূমিকা পালনে সহযোগিতা করবে।
তিনি বলেন, অর্ধশতাব্দীরও বেশি সময়ের অভিন্ন অভিজ্ঞতার মধ্য দিয়ে চীন ও বাংলাদেশ ভালো প্রতিবেশী, বন্ধু ও অংশীদার হিসেবে সম্পর্ক বজায় রেখেছে। পারস্পরিক সম্মান ও আন্তরিকতার ভিত্তিতেই এ সম্পর্ক এগিয়ে চলেছে।
ইয়াও ওয়েন উল্লেখ করেন, এ বছর বাংলাদেশ ও চীনের কূটনৈতিক সম্পর্কের ৫১তম এবং বেল্ট অ্যান্ড রোড সহযোগিতার ১০ম বার্ষিকী।
এ বছর প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানের চীন সফরকে দ্বিপক্ষীয় সম্পর্ক এগিয়ে নেওয়ার ক্ষেত্রে গুরুত্বপূর্ণ অগ্রগতি হিসেবে উল্লেখ করে তিনি বলেন, প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান প্রথমবারের মতো চীন সফর করেন। এ সময় দুই দেশের নেতারা একাধিক গুরুত্বপূর্ণ বিষয়ে সমঝোতায় পৌঁছান এবং দ্বিপক্ষীয় সম্পর্ককে নতুন যুগে চীন-বাংলাদেশ অভিন্ন ভবিষ্যতের অংশীদারত্বের পর্যায়ে উন্নীত করেন। তাঁর মতে, এই সিদ্ধান্ত দুই দেশের সম্পর্কের দীর্ঘমেয়াদি উন্নয়নে শক্তিশালী গতি এনেছে।
বাংলাদেশের রাজনৈতিক পরিবর্তনের প্রসঙ্গ উল্লেখ করে ইয়াও ওয়েন বলেন, তিনি বাংলাদেশের জনগণের দৃঢ়তা ও জাতীয় মর্যাদাবোধ দেখে গভীরভাবে মুগ্ধ হয়েছেন। তিনি বলেন, গত তিন বছর নয় মাসে তিনি ব্যক্তিগতভাবে বাংলাদেশের রাজনৈতিক পরিবর্তন এবং একটি গুরুত্বপূর্ণ সন্ধিক্ষণে এই জাতির নেওয়া ঐতিহাসিক সিদ্ধান্তগুলো প্রত্যক্ষ করেছেন।
তিনি বলেন, প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানের নেতৃত্বে সংস্কার ও উন্নয়নের নতুন পথে এগিয়ে চলা বাংলাদেশের জনগণের অসাধারণ দৃঢ়তা ও জাতীয় মর্যাদাবোধের প্রতি তাঁর গভীর শ্রদ্ধা রয়েছে।
রাষ্ট্রদূত স্বীকার করেন, দ্বিপক্ষীয় সম্পর্ক নানা সময়ে প্রতিকূলতার মুখোমুখি হয়েছে। তবে এসব চ্যালেঞ্জের মধ্যেও দুই দেশের অংশীদারত্ব তার প্রাণবন্ততা ধরে রেখেছে এবং সম্পর্ক অব্যাহতভাবে এগিয়ে চলেছে বলে তিনি উল্লেখ করেন।
ইয়াও ওয়েনের বিবৃতিতে দুই দেশের অর্থনৈতিক সম্পর্কের অগ্রগতির কথাও তুলে ধরা হয়েছে। তাঁর দেওয়া তথ্য অনুযায়ী, ২০২৬ সালের প্রথমার্ধে চীন-বাংলাদেশ দ্বিপক্ষীয় বাণিজ্যের পরিমাণ ১২ দশমিক ৮ বিলিয়ন মার্কিন ডলারে পৌঁছেছে, যা আগের বছরের একই সময়ের তুলনায় ১০ দশমিক ৬ শতাংশ বেশি। ২০২৫ সাল পর্যন্ত টানা ১৬ বছর চীন বাংলাদেশের বৃহত্তম বাণিজ্যিক অংশীদার ছিল বলেও তিনি উল্লেখ করেন।
চীনা রাষ্ট্রদূত জানান, ২০২৬ সালের জুন পর্যন্ত বাংলাদেশে চীনের ক্রমপুঞ্জীভূত বিনিয়োগের পরিমাণ প্রায় ৩ দশমিক ৬ বিলিয়ন মার্কিন ডলার। একই সঙ্গে চীনা বিনিয়োগে চট্টগ্রামে চায়না ইকোনমিক অ্যান্ড ইন্ডাস্ট্রিয়াল জোনের কার্যক্রমও এগিয়ে যাচ্ছে।
প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানের জুনের চীন সফরের সময় দুই দেশের মধ্যে বাণিজ্য, বিনিয়োগ, কৃষি, শিক্ষা, মানবসম্পদ উন্নয়ন ও গণমাধ্যমসহ বিভিন্ন খাতে সহযোগিতার নথি স্বাক্ষরিত হয়েছিল। দুই দেশ চীন-বাংলাদেশ ‘অভিন্ন ভবিষ্যতের অংশীদারত্ব’ আরও এগিয়ে নেওয়ার বিষয়েও একমত হয়।
ইয়াও ওয়েন আরও বলেন, বাংলাদেশ ও চীনের সম্পর্ক কেবল সরকার ও রাষ্ট্রের পর্যায়ে সীমাবদ্ধ নয়; দুই দেশের জনগণের মধ্যকার যোগাযোগও ক্রমেই উষ্ণ ও বিস্তৃত হচ্ছে। তাঁর মতে, পারস্পরিক স্বার্থ ও সহযোগিতার ভিত্তিতে এ সম্পর্ক ভবিষ্যতেও আরও এগিয়ে যাবে।
/এএসএফ