মধ্যপ্রাচ্যে চলমান যুদ্ধ বন্ধ এবং কৌশলগতভাবে গুরুত্বপূর্ণ হরমুজ প্রণালী পুনরায় খুলে দেওয়ার লক্ষ্যে যুক্তরাষ্ট্রের কাছে নতুন একটি প্রস্তাব দিয়েছে ইরান।
নিউইয়র্কে জাতিসংঘ সাধারণ পরিষদের ৮১তম অধিবেশনে অংশ নেওয়া ইরানের পররাষ্ট্রমন্ত্রী আব্বাস আরাঘচি বৃহস্পতিবার (২৪ সেপ্টেম্বর) আন্তর্জাতিক সংবাদমাধ্যমকে দেওয়া সাক্ষাৎকারে এ তথ্য জানিয়েছেন। তিনি বলেন, নির্দিষ্ট কিছু শর্ত পূরণ করা হলে সাত দিনের মধ্যেই হরমুজ প্রণালী খুলে দেওয়া হবে এবং যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে আলোচনা পুনরায় শুরু হবে।
এর আগে মঙ্গলবার জাপানি বার্তা সংস্থা কিয়োডো এক জ্যেষ্ঠ ইরানি কর্মকর্তার বরাত দিয়ে একই ধরনের প্রস্তাবের খবর প্রকাশ করেছিল। তবে তখন ইরানের আধা-সরকারি ফার্স নিউজ ওই প্রতিবেদনকে অস্বীকার করে এবং ইরানি কর্মকর্তারাও বিষয়টি নিয়ে স্পষ্ট কোনো অবস্থান জানাননি। পরে আরাঘচির বক্তব্যে সাত দিনের মধ্যে হরমুজ খুলে দেওয়ার প্রস্তাবের বিষয়টি প্রকাশ্যে আসে।
এর আগে যুদ্ধ বন্ধ এবং হরমুজ প্রণালী পুনরায় চালুর বিষয়ে ইরান সাতটি শর্তের কথা জানিয়েছিল। গার্ডিয়ানের প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, নতুন প্রস্তাবে লেবাননসহ মধ্যপ্রাচ্যের বিভিন্ন ফ্রন্টে শত্রুতা বন্ধের বিষয়টি অন্তর্ভুক্ত রয়েছে।
প্রস্তাব অনুযায়ী, যুক্তরাষ্ট্রকে ইরানের ওপর সামরিক চাপ কমানো এবং দেশটির বন্দরগুলোর ওপর মার্কিন নৌ অবরোধ প্রত্যাহার করতে হবে। একই সঙ্গে ইরানি তেল রপ্তানির ওপর নিষেধাজ্ঞা শিথিল বা প্রত্যাহার এবং বিদেশে থাকা অন্তত ১২ বিলিয়ন ডলারের ইরানি সম্পদ অবমুক্ত করার দাবিও রয়েছে বলে বিভিন্ন প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়েছে।
আরাঘচি জানিয়েছেন, প্রস্তাবটি মধ্যস্থতাকারীদের মাধ্যমে যুক্তরাষ্ট্রের কাছে পৌঁছানো হয়েছে এবং এখন তেহরান ওয়াশিংটনের জবাবের অপেক্ষায় রয়েছে। তিনি বলেন, প্রস্তাবের শর্তগুলো নতুন কিছু নয়; এগুলো জুনে স্বাক্ষরিত ‘ইসলামাবাদ সমঝোতা স্মারক’-এর মূল বিষয়গুলোর ওপর ভিত্তি করে তৈরি।
আরাঘচির বক্তব্য অনুযায়ী, যুক্তরাষ্ট্র প্রস্তাব গ্রহণ করলে সাত দিনের সময়সীমা শুরু হবে। ওই সময়ের মধ্যে নির্ধারিত শর্তগুলো বাস্তবায়ন করা হলে সপ্তম দিনের শেষে হরমুজ প্রণালী বাণিজ্যিক জাহাজ চলাচলের জন্য পুনরায় খুলে দেওয়া হবে এবং এরপর ইরানের পারমাণবিক কর্মসূচিসহ সংশ্লিষ্ট বিষয় নিয়ে আলোচনা শুরু হবে।
এর আগে গত জুনে যুক্তরাষ্ট্র ও ইরানের মধ্যে একটি সমঝোতা স্মারক স্বাক্ষরিত হয়েছিল, যার লক্ষ্য ছিল যুদ্ধবিরতি, হরমুজ প্রণালী পুনরায় সচল করা এবং ইরানের পারমাণবিক কর্মসূচি নিয়ে আলোচনার পথ তৈরি করা। তবে পরবর্তী সময়ে ওই সমঝোতা ভেঙে যায় এবং দুই দেশের মধ্যে সংঘাত আবারও তীব্র হয়।
এদিকে আরাঘচি দাবি করেছেন, চীনের প্রেসিডেন্ট শি জিনপিং ইরানের নতুন প্রস্তাবকে সমর্থন জানিয়েছেন। চলতি সপ্তাহে জাতিসংঘ সাধারণ পরিষদের অধিবেশনের ফাঁকে শি জিনপিং মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্পের সঙ্গে বৈঠক করেছেন।
ইরানের প্রস্তাবের আরেকটি গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হলো আঞ্চলিক সংঘাতের পরিধি কমানো। তেহরানের কর্মকর্তারা জানিয়েছেন, লেবাননসহ মধ্যপ্রাচ্যের বিভিন্ন এলাকায় শত্রুতা বন্ধ করাকে হরমুজ পুনরায় খোলার প্রক্রিয়ার অংশ হিসেবে দেখা হচ্ছে। ইয়েমেনের সংঘাতের অবসানও ইরানের দাবিগুলোর মধ্যে রয়েছে বলে দেশটির ইসলামিক রেভল্যুশনারি গার্ড কর্পসের মুখপাত্র হোসেইন মোহেবি জানিয়েছেন।
হরমুজ প্রণালী বিশ্বের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ জ্বালানি পরিবহনপথ হওয়ায় এর ওপর দিয়ে জাহাজ চলাচল স্বাভাবিক হওয়া আন্তর্জাতিক জ্বালানি বাজারের জন্যও গুরুত্বপূর্ণ। ফলে ইরানের নতুন প্রস্তাবের পর যুক্তরাষ্ট্রের অবস্থান এবং দুই দেশের মধ্যে আলোচনার সম্ভাবনার দিকে আন্তর্জাতিক মহলের নজর রয়েছে।
/এএসএফ