ইরানকে সোমবার ‘অবিশ্বাস্য রকমের প্রতারক’ বলে মন্তব্য করেছেন মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প। তেহরানের নেতৃত্বকে বোঝা এবং তাদের সঙ্গে গ্রহণযোগ্য কোনো সমঝোতায় পৌঁছানোর চেষ্টায় তিনি যে ক্রমেই হতাশ হচ্ছেন, তার সাম্প্রতিক বক্তব্যে সেই হতাশারই প্রতিফলন দেখা গেছে।
প্রতিপক্ষকে বোঝা ও মোকাবিলার ক্ষেত্রে নিজেকে দক্ষ বলে দাবি করলেও ইরানের নেতৃত্বের ক্ষেত্রে বারবার বিপাকে পড়েছেন ট্রাম্প। গত সপ্তাহে সাংবাদিকদের তিনি বলেন, ‘ওরা যা করে, তাতে আমি শুধু রেগে হই। ওরা শুধু আমাকে রাগিয়ে দেয়।’
ট্রাম্প প্রশাসনের কর্মকর্তারা জানিয়েছেন, হরমুজ প্রণালি পুনরায় খুলে দেওয়ার বিষয়ে একটি নতুন চুক্তি প্রায় চূড়ান্ত পর্যায়ে রয়েছে। তবে ইরান সেখানে জাহাজ চলাচলের জন্য ফি আদায়ে অনড় অবস্থানে রয়েছে, যা ট্রাম্প মেনে নিতে রাজি নন।
ইরানের সঙ্গে গ্রহণযোগ্য সমঝোতায় পৌঁছাতে না পারায় ট্রাম্প রাজনৈতিক চাপের মুখেও পড়েছেন। একই সময়ে হরমুজ প্রণালিকে ঘিরে উত্তেজনা অব্যাহত থাকায় আন্তর্জাতিক তেলের বাজারে অস্থিরতা দেখা দিয়েছে, যার প্রভাব পড়ছে যুক্তরাষ্ট্রের ভোক্তা ও বৈশ্বিক অর্থনীতিতেও।
১৯৭৯ সালের ইসলামি বিপ্লবের পর থেকে প্রায় সব মার্কিন প্রেসিডেন্টই ইরানের জটিল ক্ষমতা কাঠামো ও নেতৃত্বকে বোঝার চেষ্টা করেছেন। এ ক্ষেত্রে ব্যতিক্রম ছিলেন সাবেক প্রেসিডেন্ট বারাক ওবামা, যিনি প্রায় ২০ মাসের আলোচনার পর ২০১৫ সালে ইরানের সঙ্গে পারমাণবিক চুক্তি করতে সক্ষম হন।
দীর্ঘদিন ইরান নিয়ে গবেষণা করা সাবেক সিআইএ বিশ্লেষক ও জাতীয় নিরাপত্তা পরিষদের কর্মকর্তা কেনেথ পোলাকের মতে, ‘অনেক দিক থেকেই ট্রাম্প ইরানকে ঘিরে যুক্তরাষ্ট্রের হতাশার প্রতিচ্ছবি। তিনি যেমন ইরানের সঙ্গে চুক্তি করতে সবচেয়ে বেশি আগ্রহী ছিলেন, তেমনি দেশটির বিরুদ্ধে সবচেয়ে বেশি শক্তিও প্রয়োগ করেছেন। কিন্তু কোনো পথেই তিনি নিজের কাঙ্ক্ষিত ফল পাননি।’
ট্রাম্প প্রায়ই এমনভাবে বক্তব্য দিয়েছেন, যেন ব্যাপক সামরিক শক্তি প্রয়োগের মাধ্যমে দ্রুত সমঝোতা সম্ভব হবে। ২৮ ফেব্রুয়ারির বিমান হামলায় প্রায় চার দশক ধরে ক্ষমতায় থাকা ইরানের সর্বোচ্চ নেতা আলি খামেনি নিহত হওয়ার পর তিনি ইরানের জনগণকে সরকার উৎখাতের আহ্বান জানিয়ে বলেন, ‘নিজেদের সরকার নিজেদেরই দখলে নিন।’ পরে তিনি আরও বলেন, ‘আমি তারপর ইরানের পরবর্তী নেতা বেছে নেব।’
তবে ইসরায়েল ও যুক্তরাষ্ট্রের বিমান হামলায় ইরানের কয়েকজন শীর্ষ কর্মকর্তা নিহত হলেও দেশটিতে কোনো গণঅভ্যুত্থান হয়নি। বরং বর্তমান নেতৃত্ব আরও কঠোর অবস্থান নেয়। মার্চ মাসে আলি খামেনির ছেলে মোজতবা খামেনিকে নতুন সর্বোচ্চ নেতা নির্বাচিত করা হয়। মার্কিন কর্মকর্তাদের মতে, তিনি তার বাবার চেয়েও কঠোর এবং পারমাণবিক অস্ত্র অর্জনের বিষয়ে আরও আগ্রহী।
ট্রাম্প আগে থেকেই মোজতবা খামেনির নেতৃত্বকে ‘গ্রহণযোগ্য নয়’ বলে মন্তব্য করেছিলেন। তবে ইরান সেই মন্তব্যকে গুরুত্ব দেয়নি। একইভাবে, ট্রাম্পের সরাসরি বৈঠকের প্রস্তাবেও সাড়া দেননি মোজতবা খামেনি।
এরপরও এপ্রিলের শেষ দিকে ট্রাম্প আশাবাদ প্রকাশ করে বলেন, ‘ইরান যদি একটি চুক্তি করে, তাহলে তারা নিজেদের খুব ভালো অবস্থানে নিয়ে যেতে পারবে।’ একই সঙ্গে তিনি বলেন, ইরান ‘মৃত্যু ও আতঙ্কের ওপর দাঁড়িয়ে থাকা দেশ নয়, বরং একটি বৈধ রাষ্ট্রে’ পরিণত হতে পারে।
অন্যদিকে, ইরানের কর্মকর্তারা জানিয়েছেন, হরমুজ প্রণালি ও পারমাণবিক কর্মসূচির মতো বিষয় নিয়ে তারা ট্রাম্পের সঙ্গে আলোচনা করতে প্রস্তুত। তবে মার্কিন প্রেসিডেন্টের অনেক গুরুত্বপূর্ণ দাবি তারা মানতে রাজি নন। যুক্তরাষ্ট্রবিরোধী আদর্শের ওপর প্রতিষ্ঠিত দেশটির রাজনৈতিক ব্যবস্থায় ওয়াশিংটনের সঙ্গে বৃহত্তর সমঝোতারও তেমন আগ্রহ নেই।
পুরো সংকটজুড়ে ট্রাম্পও ইরানের নেতৃত্ব সম্পর্কে নিজের মূল্যায়ন একাধিকবার পরিবর্তন করেছেন। কখনও তাদের ‘পাগল’, কখনও ‘যুক্তিসঙ্গত’, কখনও ‘উন্মাদ’, কখনও ‘খুব বুদ্ধিমান’, আবার কখনও ‘পুরোপুরি উন্মাদ’ বলে অভিহিত করেছেন।
ওয়াশিংটনের ব্রুকিংস ইনস্টিটিউশনের ভাইস প্রেসিডেন্ট সুজান ম্যালোনি বলেন, ‘দশকের পর দশক ধরে মার্কিন নীতিনির্ধারকেরা ইসলামি প্রজাতন্ত্রের আদর্শিক অঙ্গীকার এবং প্রাতিষ্ঠানিকভাবে গড়ে ওঠা ক্ষমতা কাঠামোর গুরুত্ব ধারাবাহিকভাবে খাটো করে দেখেছেন।’
তার মতে, যুদ্ধ ইরানের ধর্মীয় ও সামরিক নেতৃত্বকে আরও শক্তিশালী করেছে। ফলে সেখানে কার্যকর কোনো বিকল্প ক্ষমতার কেন্দ্র আর দেখা যাচ্ছে না।
মধ্যপ্রাচ্যবিষয়ক অভিজ্ঞ কূটনীতিক ডেনিস রস বলেন, ‘ইরানিরা আমাদের যতটা বোঝে, আমরা তাদের ততটা বুঝি না।’
প্রতিবেদন অনুযায়ী, ইরানের সঙ্গে সমঝোতা করতে গিয়ে অতীতের মার্কিন প্রেসিডেন্টরাও একই ধরনের জটিলতার মুখে পড়েছেন।
১৯৮০ সালে প্রেসিডেন্ট জিমি কার্টার তেহরানে জিম্মি হওয়া ৫২ মার্কিন নাগরিককে মুক্ত করতে গোপন আলোচনা শুরু করেছিলেন। তিনি ধারণা করেছিলেন, জব্দ করা ইরানি সম্পদের কয়েক বিলিয়ন ডলার ছাড় এবং ইরানের অভ্যন্তরীণ বিষয়ে যুক্তরাষ্ট্রের হস্তক্ষেপ না করার প্রতিশ্রুতির বিনিময়ে সমঝোতা হবে। কিন্তু আয়াতুল্লাহ রুহুল্লাহ খোমেনি সেই প্রস্তাব প্রত্যাখ্যান করেন। পরে সামরিক অভিযানও ব্যর্থ হয়। শেষ পর্যন্ত প্রেসিডেন্ট হিসেবে দায়িত্ব ছাড়ার শেষ দিনেই কার্টার জিম্মি মুক্তির চুক্তি চূড়ান্ত করতে সক্ষম হন।
১৯৮৫ সালে প্রেসিডেন্ট রোনাল্ড রিগ্যানও ইরানের মধ্যপন্থী নেতৃত্বের সঙ্গে সম্পর্ক গড়ার আশায় লেবাননে জিম্মি মার্কিন নাগরিকদের মুক্তির বিনিময়ে গোপনে ইরানের কাছে অস্ত্র বিক্রির অনুমোদন দেন। পরে এই ঘটনাই ‘ইরান-কন্ট্রা কেলেঙ্কারি’ নামে পরিচিত হয়। বিষয়টি প্রকাশ্যে এলে রিগ্যান প্রশাসন বড় রাজনৈতিক সংকটে পড়ে এবং শেষ পর্যন্ত ইরানের সঙ্গে সম্পর্ক উন্নয়নের সেই উদ্যোগও ব্যর্থ হয়।
১৯৯৭ সালে ইরানের প্রেসিডেন্ট নির্বাচিত হন সংস্কারপন্থী নেতা মোহাম্মদ খাতামি। তিনি যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে সম্পর্ক উন্নয়নের আহ্বান জানান এবং তেহরানে মার্কিন দূতাবাস জিম্মি সংকট নিয়েও দুঃখ প্রকাশ করেন।
এর জবাবে প্রেসিডেন্ট বিল ক্লিনটন ইরান থেকে পেস্তা বাদাম ও কার্পেট আমদানির ওপর নিষেধাজ্ঞা শিথিল করেন। তৎকালীন মার্কিন পররাষ্ট্রমন্ত্রী ম্যাডেলিন অলব্রাইট ১৯৫৩ সালে ইরানের প্রধানমন্ত্রীকে ক্ষমতাচ্যুত করার অভ্যুত্থানে সিআইএর ভূমিকার জন্যও প্রকাশ্যে দুঃখ প্রকাশ করেন।
তবে ইরানের কট্টরপন্থী নেতৃত্ব এই উদ্যোগের বিরোধিতা করে। পরে সর্বোচ্চ নেতা আলি খামেনি ওয়াশিংটনের সঙ্গে সংলাপের সম্ভাবনা নাকচ করে দেন। পরবর্তীতে খাতামি ব্যক্তিগতভাবে মন্তব্য করেছিলেন, খামেনির বিশ্বাস ছিল—ইরান কখনোই যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে স্থায়ী শান্তিতে পৌঁছাতে পারবে না।
যুক্তরাষ্ট্রের প্রেসিডেন্টদের মধ্যে কেবল বারাক ওবামাই ২০১৫ সালে ইরানের সঙ্গে বড় ধরনের কূটনৈতিক সমঝোতায় পৌঁছাতে সক্ষম হন। ওই পারমাণবিক চুক্তির আওতায় নিষেধাজ্ঞা শিথিলের বিনিময়ে ইরান ১৫ বছরের জন্য তার পারমাণবিক কর্মসূচিতে সীমাবদ্ধতা মেনে নেয়।
তবে ২০১৮ সালে প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প সেই চুক্তি থেকে যুক্তরাষ্ট্রকে প্রত্যাহার করে আরও কঠোর অর্থনৈতিক নিষেধাজ্ঞা আরোপ করেন। এর ফলে ইরানের মধ্যে যুক্তরাষ্ট্রের ওপর আস্থাহীনতা আরও গভীর হয় এবং দেশটি তার পারমাণবিক কর্মসূচি দ্রুত এগিয়ে নেয়। এতে দুই দেশের উত্তেজনা আরও বৃদ্ধি পায়।
মধ্যপ্রাচ্যবিষয়ক অভিজ্ঞ কূটনীতিক ডেনিস রসের মতে, এরপরও ইরান কৌশলগতভাবে যুক্তরাষ্ট্রকে বারবার ছাপিয়ে গেছে। ট্রাম্পের দ্রুত ফল পাওয়ার প্রবণতাকে তেহরান নিজেদের পক্ষে কাজে লাগিয়েছে।
রস বলেন, ‘তারা আমাদের তাড়াহুড়ো করার প্রবণতাকে নিজেদের জন্য চাপ তৈরির হাতিয়ার হিসেবে দেখে। আমরা সব সময় দ্রুত ফল চাই। আর তারা ধরে নেয়, সময় আমাদের চেয়ে তাদের পক্ষেই বেশি কাজ করে।’
/এসএন