• ঢাকা
  • বুধবার, ০৫ আগস্ট ২০২৬, ০৯:৩৯ পিএম


পোড়া বঙ্গবাজারে নতুন ভবন, বরাদ্দের আগেই ব্যবসায়ীদের কাছ থেকে ‘চাঁদা’ আদায়ের অভিযোগ

দি পালস বিডি অনলাইন ডেস্ক
আপডেট টাইম: ২৫ জুন ২০২৬ ২:১৪ পিএম

রাজধানীর অগ্নিকাণ্ডে ধ্বংস হওয়া বঙ্গবাজার মার্কেটের ১০৬ কাঠা জমির ওপর নির্মাণ করা হচ্ছে ১০ তলা বিশিষ্ট ‘বঙ্গবাজার পাইকারি নগর বিপণিবিতান’। ইতোমধ্যে নতুন এই কমপ্লেক্সে ২ হাজার ৯৬১ জন ক্ষতিগ্রস্ত ব্যবসায়ী দোকান বরাদ্দ পেয়েছেন। তবে দোকান বুঝে পাওয়ার আগেই কিস্তির অর্থ জমা দেওয়ার পাশাপাশি অতিরিক্ত অর্থ দিতে হচ্ছে বলে অভিযোগ উঠেছে।

ব্যবসায়ীদের দাবি, কিস্তির টাকা জমা দেওয়ার সময় মালিক সমিতির নামে অতিরিক্ত ১০ হাজার টাকা নেওয়া হচ্ছে। এই অর্থ না দিলে কিস্তির রসিদ গ্রহণ করা হচ্ছে না বলেও অভিযোগ রয়েছে। তাদের অভিযোগ, প্রায় তিন হাজার ব্যবসায়ীর কাছ থেকে সংগৃহীত এই অতিরিক্ত অর্থের একটি অংশ ঢাকা দক্ষিণ সিটি করপোরেশনের কিছু অসাধু কর্মকর্তা ও মালিক সমিতির সংশ্লিষ্টদের কাছে যাচ্ছে। বিষয়টি নিয়ে ক্ষোভ প্রকাশ করেছেন ক্ষতিগ্রস্ত ব্যবসায়ীরা।

জানা গেছে, নতুন ভবনটিতে থাকবে একটি বেজমেন্ট, গ্রাউন্ড ফ্লোর এবং আটটি তলা। গ্রাউন্ড ফ্লোর থেকে সপ্তম তলা পর্যন্ত মোট ৩ হাজার ৪২টি দোকান নির্মাণ করা হবে। এর মধ্যে গ্রাউন্ড ফ্লোরে ৩৮৪টি, প্রথম তলায় ৩৬৬টি, দ্বিতীয় তলায় ৩৯৭টি, তৃতীয় ও পঞ্চম তলায় ৩৮৭টি করে মোট ৭৭৪টি, চতুর্থ ও ষষ্ঠ তলায় ৪০৪টি করে মোট ৮০৮টি এবং সপ্তম তলায় ৩১৩টি দোকান থাকবে।

পরিকল্পনা অনুযায়ী, ৩ হাজার ২০টি সাধারণ দোকানের মধ্যে বঙ্গবাজার হকার মার্কেটের জন্য ৯১৮টি, গুলিস্তান হকার্স মার্কেটের জন্য ৮২৯টি, মহানগর হকার্স মার্কেটের জন্য ৫৭২টি এবং আদর্শ হকার্স মার্কেটের জন্য ৭০১টি দোকান বরাদ্দ রাখা হয়েছে। নতুন ভবনে আগের তুলনায় ৮১টি বেশি দোকান থাকবে এবং প্রতিটি দোকানের আয়তন হবে ৮০ থেকে ১০০ বর্গফুট।

উল্লেখ্য, ২০২৩ সালের এপ্রিলে ভয়াবহ অগ্নিকাণ্ডে বঙ্গবাজারের চারটি মার্কেটের প্রায় ৫ হাজার দোকান পুড়ে যায়। এতে হাজারো ব্যবসায়ী ও কর্মচারী তাদের জীবিকার অবলম্বন হারান। ঢাকা দক্ষিণ সিটি করপোরেশনের তত্ত্বাবধানে নির্মাণাধীন এই বহুতল মার্কেট নির্মাণে ব্যয় ধরা হয়েছে প্রায় ৩৬৫ কোটি টাকা, যার অর্থ ব্যবসায়ীদের কাছ থেকেই নেওয়া হবে। বর্তমানে ভবনের তৃতীয় তলার নির্মাণকাজ দৃশ্যমান।

সিটি করপোরেশন সূত্র জানিয়েছে, একটি দোকান বরাদ্দ পেতে ব্যবসায়ীদের গড়ে প্রায় ২০ লাখ টাকা জমা দিতে হবে, যা পাঁচ কিস্তিতে পরিশোধের সুযোগ রাখা হয়েছে। ক্ষতিগ্রস্ত ব্যবসায়ীরা ইতোমধ্যে ধারদেনা করে কিস্তির অর্থ পরিশোধ শুরু করেছেন। প্রথম কিস্তিতে অতিরিক্ত অর্থ নেওয়া হয়নি। তবে দ্বিতীয় কিস্তির সময় প্রত্যেকের কাছ থেকে ১ হাজার ৫০০ টাকা এবং বর্তমানে তৃতীয় কিস্তির সঙ্গে অতিরিক্ত ১০ হাজার টাকা নেওয়া হচ্ছে বলে অভিযোগ রয়েছে।

অভিযোগ অনুযায়ী, এই অতিরিক্ত অর্থের একটি অংশ সিটি করপোরেশনের বিভিন্ন পর্যায়ে পৌঁছায়। গত ৫ মে ঢাকা দক্ষিণ সিটি করপোরেশন থেকে বঙ্গবাজার কমপ্লেক্স দোকান মালিক সমিতির সভাপতি ও সাধারণ সম্পাদকের কাছে পাঠানো এক চিঠিতে ২ হাজার ৯৬১ জন ক্ষতিগ্রস্ত সদস্যকে তৃতীয় কিস্তির ৩ লাখ টাকা অগ্রিম সালামি জমা দিতে বলা হয়। একই সঙ্গে যারা দ্বিতীয় কিস্তি পরিশোধ করেননি, তাদের ৬ লাখ টাকা জমা দেওয়ার নির্দেশনা দেওয়া হয়।

এরপর সমিতির পক্ষ থেকে ব্যবসায়ীদের পে-অর্ডারের মাধ্যমে অর্থ জমা দিতে বলা হয়। বঙ্গবাজারের সপ্তম তলায় সমিতির কার্যালয়ে গিয়ে দেখা যায়, চারটি পৃথক টেবিলে নিয়োজিত ব্যক্তিরা ব্যবসায়ীদের পে-অর্ডারের স্লিপ গ্রহণ করছেন। বঙ্গ ইউনিটের দায়িত্বে থাকা রাসেল পে-অর্ডারের তথ্য রেজিস্টারে লিপিবদ্ধ করার পর ব্যবসায়ীদের হাতে ১০ হাজার টাকার একটি রসিদ তুলে দেন।

এই অর্থ নেওয়ার কারণ জানতে চাইলে তিনি বলেন, ‘এটা সবাই জানে। নতুন করে বলার কিছু নেই।’ রসিদে উল্লেখ করা হয়েছে, অর্থটি বেতন-ভাতা ও অফিস পরিচালনার খাতে ব্যয় করা হবে। একইভাবে গুলিস্তান, মহানগর ও আদর্শ ইউনিটের টেবিলেও পে-অর্ডারের পাশাপাশি ১০ হাজার টাকা করে নেওয়া হচ্ছে। অনেক ব্যবসায়ী অভিযোগ করেছেন, কেউ প্রচলিত ‘সিস্টেম’ মেনে, আবার কেউ দোকান বরাদ্দ হারানোর আশঙ্কায় বাধ্য হয়ে এই অতিরিক্ত অর্থ দিচ্ছেন।

হিসাব অনুযায়ী, শুধু তৃতীয় কিস্তির সময় ২ হাজার ৯৬১ জন ব্যবসায়ীর কাছ থেকে ১০ হাজার টাকা করে আদায় করলে মোট অর্থের পরিমাণ দাঁড়ায় ২ কোটি ৯৬ লাখ ১০ হাজার টাকা। এই অর্থ কোথায় ব্যয় হবে বা কারা এর সুবিধাভোগী হবেন—তা নিয়ে ক্ষতিগ্রস্ত ব্যবসায়ীদের মধ্যে নানা প্রশ্ন তৈরি হয়েছে। তাদের ভাষ্য, এ বিষয়ে প্রশ্ন তুললে দোকানের বরাদ্দ বাতিল হওয়ার আশঙ্কা রয়েছে।

এর আগে প্রথম কিস্তির ১ লাখ টাকার সঙ্গে অতিরিক্ত কোনো অর্থ নেওয়া হয়নি। তবে দ্বিতীয় কিস্তির ৩ লাখ টাকার সঙ্গে প্রত্যেকের কাছ থেকে ১ হাজার ৫০০ টাকা নেওয়া হয়েছিল। সে সময় হাতে লেখা স্লিপের মাধ্যমে অর্থ সংগ্রহ করা হয় বলে অভিযোগ রয়েছে। ব্যবসায়ীদের দাবি, ওই অর্থের একটি বড় অংশও সিটি করপোরেশনের বিভিন্ন পর্যায়ে গেছে।

এ বিষয়ে ঢাকা দক্ষিণ সিটি করপোরেশনের উপ-প্রধান রাজস্ব কর্মকর্তা আতাহার আলী খান বলেন, কিস্তির টাকার বাইরে অতিরিক্ত অর্থ নেওয়ার কথা নয়। বিষয়টি তিনি খতিয়ে দেখবেন এবং কেউ জড়িত থাকলে প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা নেওয়া হবে।

অন্যদিকে, বঙ্গবাজার কমপ্লেক্স (গুলিস্তান ইউনিট) দোকান মালিক সমিতির সাধারণ সম্পাদক মো. আব্দুল বাসেত বলেন, এ বিষয়ে তিনি কিছু জানেন না এবং এর সঙ্গে তার কোনো সম্পৃক্ততা নেই। এ বিষয়ে বক্তব্য জানতে সমিতির সভাপতি মোজাম্মেল হক মজুর সঙ্গে একাধিকবার যোগাযোগের চেষ্টা করা হলেও তিনি ফোন রিসিভ করেননি।

/এসএন