আল্লামা দেলাওয়ার হোসাইন সাঈদীর তৃতীয় মৃত্যুবার্ষিকী আগামীকাল শুক্রবার (১৪ আগস্ট)। ২০২৩ সালের ১৪ আগস্ট রাতে ঢাকার বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিব মেডিকেল বিশ্ববিদ্যালয় (বিএসএমএমইউ) হাসপাতালে চিকিৎসাধীন অবস্থায় তিনি ইন্তেকাল করেন।আল্লামা দেলাওয়ার হোসাইন সাঈদী বাংলাদেশের একজন পরিচিত ইসলামি চিন্তাবিদ, বক্তা, লেখক ও রাজনীতিবিদ ছিলেন। সাবলীল ও আকর্ষণীয় বাচনভঙ্গি এবং বক্তব্যে সাহসী উচ্চারণের কারণে তিনি ব্যাপক পরিচিতি লাভ করেন। তাফসিরুল কুরআন মাহফিলের মাধ্যমে দেশের বিভিন্ন শ্রেণি-পেশার মানুষের কাছে তাঁর জনপ্রিয়তা তৈরি হয়।সংক্ষিপ্ত জীবনীজন্ম ও পরিবার: আল্লামা দেলাওয়ার হোসাইন সাঈদী ১৯৪০ সালের ২ ফেব্রুয়ারি পিরোজপুর জেলার ইন্দুরকানী গ্রামে জন্মগ্রহণ করেন। তাঁর বাবা মাওলানা ইউসুফ সাঈদীও একজন আলেম ও বক্তা ছিলেন।শিক্ষাজীবন: পিতার প্রতিষ্ঠিত মাদ্রাসায় তাঁর প্রাথমিক শিক্ষাজীবন শুরু হয়। পরে খুলনা আলিয়া মাদ্রাসায় পড়াশোনা করেন। ১৯৬২ সালে ছারছিনা আলিয়া মাদ্রাসা থেকে হাদিস ও তাফসিরে কামিল পাস করেন।রাজনৈতিক জীবন: ১৯৭৯ সালে তিনি বাংলাদেশ জামায়াতে ইসলামীতে যোগ দেন। পরবর্তীতে দলটির নায়েবে আমিরের দায়িত্ব পালন করেন। পিরোজপুর-১ আসন থেকে ১৯৯৬ ও ২০০১ সালে দুইবার সংসদ সদস্য নির্বাচিত হন।কারাজীবন ও মৃত্যু: ২০১০ সালে মানবতাবিরোধী অপরাধের মামলায় তিনি গ্রেপ্তার হন। ২০১৩ সালে বিশেষ ট্রাইব্যুনাল তাঁকে আমৃত্যু কারাদণ্ড দেন। দীর্ঘ কারাবাসের পর ২০২৩ সালের ১৪ আগস্ট চিকিৎসাধীন অবস্থায় তিনি মারা যান।তাফসিরের মাধ্যমে ব্যাপক পরিচিতিআল্লামা সাঈদীর সবচেয়ে বড় পরিচিতি গড়ে ওঠে দেশব্যাপী তাফসিরুল কুরআন মাহফিলের মাধ্যমে। ১৯৭২ সালে পিরোজপুরে তিনি প্রথম বড় পরিসরে তাফসির মাহফিল করেন। আশির দশকের শুরু থেকে তাঁর ওয়াজ ও তাফসির মাহফিল দেশজুড়ে ব্যাপক জনপ্রিয়তা লাভ করে।চট্টগ্রামের প্যারেড ময়দানে তাঁর উদ্যোগে শুরু হওয়া বার্ষিক তাফসির মাহফিল টানা তিন দশকেরও বেশি সময় ধরে অনুষ্ঠিত হয়। প্রতি বছর ওই মাহফিলে বিপুলসংখ্যক মানুষের সমাগম হতো।দেশের বাইরেও তিনি বিভিন্ন দেশে তাফসির পেশ করেন। লন্ডন, আমেরিকা, দুবাই ও সৌদি আরবসহ বিভিন্ন দেশে তিনি আমন্ত্রিত হয়ে তাফসির করেছেন। ১৯৯১ সালে উত্তর আমেরিকার ইসলামিক সার্কেল তাঁকে ‘আল্লামা’ উপাধিতে ভূষিত করে।বৈজ্ঞানিক তথ্য, যুক্তি, সুমিষ্ট কণ্ঠ ও প্রমিত ভাষার ব্যবহারের কারণে তাঁর বক্তব্য সাধারণ মানুষ ও যুবসমাজের মধ্যে ব্যাপক সাড়া ফেলেছিল। অডিও ক্যাসেট, সিডি এবং পরবর্তীতে ইন্টারনেটের মাধ্যমে তাঁর তাফসির দেশের গণ্ডি পেরিয়ে বিভিন্ন জায়গায় ছড়িয়ে পড়ে।লেখালেখিতে অবদানবক্তা ও রাজনীতিবিদ হিসেবে পরিচিতির পাশাপাশি আল্লামা সাঈদী একজন লেখকও ছিলেন। ইসলামি আকিদা, তাফসির, সমাজ ও সমসাময়িক বিভিন্ন বিষয় নিয়ে তিনি প্রায় ৭৫টি বই লিখেছেন।তাঁর উল্লেখযোগ্য বইয়ের মধ্যে রয়েছে ‘আল কুরআনুল করীম (সহজবোধ্য বঙ্গানুবাদ)’, ‘তাফসীরে সাঈদী’, ‘বিষয়ভিত্তিক তাফসীরুল কোরআন’, ‘পবিত্র কোরআনের মু’জিজা’, ‘জান্নাত লাভের সহজ আমল’, ‘আখিরাতের জীবনচিত্র’, ‘ঈমানের অগ্নিপরীক্ষা’, ‘চরিত্র গঠনে নামাযের অবদান’, ‘আল্লাহ কোথায় আছেন? এবং আল্লাহ মৃতদেহ নিয়ে কী করবেন?’, ‘রাসূলুল্লাহর (সাঃ) মোনাজাত’, ‘আমি কেন জামায়াতে ইসলামী করি’, ‘দেখে এলাম অবিশ্বাসীদের করুণ পরিণতি’, ‘দ্বীনে হক-এর প্রতি দাওয়াত না দেয়ার পরিণতি’ এবং ‘আল্লামা সাঈদী রচনাবলী’।তাঁর তাফসির, ইসলামি চিন্তা, আকিদা, আমল, সামাজিক ও রাজনৈতিক বিভিন্ন বিষয় নিয়ে লেখা বইগুলো পাঠকদের মধ্যে পরিচিতি লাভ করে।২০২৩ সালের ১৪ আগস্ট তাঁর মৃত্যুর মধ্য দিয়ে তাঁর জীবনের ইতি ঘটলেও তাফসির, বক্তৃতা ও লেখালেখির মাধ্যমে রেখে যাওয়া কাজ নিয়ে প্রতিবছর তাঁর মৃত্যুবার্ষিকীতে আলোচনা ও স্মরণ করা হয়।
/ দৈনিক সংগ্রাম
/বিএসএস