সামনে এক ধরনের আচরণ, আর আড়ালে সম্পূর্ণ ভিন্ন রূপ—সমাজে এমন দ্বিমুখী চরিত্রের মানুষের দেখা মেলে প্রায়ই। মহানবী হজরত মুহাম্মদ (সা.) এ ধরনের ব্যক্তিকে মানুষের মধ্যে সবচেয়ে নিকৃষ্টদের একজন হিসেবে বর্ণনা করেছেন। একইভাবে অতিরিক্ত ঝগড়াটে স্বভাবের মানুষকেও আল্লাহর কাছে সবচেয়ে অপছন্দনীয় বলে উল্লেখ করা হয়েছে। পবিত্র কোরআন ও হাদিসের আলোকে এসব বদঅভ্যাস থেকে দূরে থাকার আহ্বান জানিয়েছেন ইসলামিক স্কলার শায়েখ আহমাদুল্লাহ।
তিনি বলেন, ইসলামের দৃষ্টিতে সবচেয়ে নিকৃষ্ট মানুষের মধ্যে রয়েছে সেই ব্যক্তি, যে অন্যদের সঙ্গে দ্বিমুখী আচরণ করে। অর্থাৎ একজনের কাছে গিয়ে এক ধরনের কথা বলে, আবার অন্য ব্যক্তির কাছে গিয়ে তার বিপরীত কথা বলে। মানুষের সঙ্গে কপটতা করা, চোগলখুরি করা এবং পরিস্থিতি অনুযায়ী নিজের অবস্থান বদলে ফেলাই এ ধরনের মানুষের বৈশিষ্ট্য। রাসুলুল্লাহ (সা.) এমন ব্যক্তিকে দুই মুখবিশিষ্ট মানুষ হিসেবে অভিহিত করেছেন।
আবু হুরায়রা (রা.) থেকে বর্ণিত, রাসুলুল্লাহ (সা.) বলেছেন, নিশ্চয়ই মানুষের মধ্যে সবচেয়ে নিকৃষ্ট হলো দুই মুখবিশিষ্ট ব্যক্তি। যে একদল মানুষের কাছে এক চেহারা নিয়ে আসে, আর অন্য দলের কাছে আসে অন্য চেহারা নিয়ে। (সহিহ মুসলিম, হাদিস ২৫২৬)
শায়েখ আহমাদুল্লাহ বলেন, যাদের মধ্যে মুনাফিকি, চোগলখুরি, কপটতা, দ্বিচারিতা ও দ্বিমুখী মানসিকতা রয়েছে, তারা সবচেয়ে নিকৃষ্ট মানুষের অন্তর্ভুক্ত।
একজন ঈমানদার হিসেবে প্রত্যেকেরই চেষ্টা করা উচিত, যেন তার ভেতর ও বাইরের আচরণে কোনো ভিন্নতা না থাকে। মানুষের কাছে ভালো সাজতে গিয়ে একজনের সামনে এক রকম এবং অন্যজনের সামনে আরেক রকম কথা বলা থেকে বিরত থাকতে হবে। একইভাবে চোগলখুরি করা কিংবা কারও সামনে এক কথা বলে আড়ালে গিয়ে তার বিপরীত কথা বলার অভ্যাসও পরিহার করতে হবে। নিজের মধ্যে যেন এমন দ্বিমুখী চরিত্র গড়ে না ওঠে, সে বিষয়ে সতর্ক থাকার পরামর্শ দেন তিনি।
আলোচনায় আল্লাহর কাছে সবচেয়ে অপছন্দনীয় মানুষ সম্পর্কে আরও একটি হাদিসের উল্লেখ করেন শায়েখ আহমাদুল্লাহ। হজরত আয়েশা (রা.) থেকে বর্ণিত, নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেছেন, আল্লাহর নিকট সেই লোক সবচেয়ে বেশি ঘৃণিত, যে অতি ঝগড়াটে। (সহিহ বুখারি, হাদিস ২৪৫৭; সহিহ মুসলিম, হাদিস ২৬৬৮)
এই হাদিসের ব্যাখ্যায় শায়েখ আহমাদুল্লাহ বলেন, কিছু মানুষ স্বভাবগতভাবেই ঝগড়াটে হয়ে থাকে। তারা কথায় কথায় বিবাদে জড়িয়ে পড়ে, যেখানে-সেখানে ঝগড়া বাধায় এবং বিভিন্ন জায়গায় গণ্ডগোল ও ফ্যাসাদ সৃষ্টি করে। এ ধরনের মানুষ আল্লাহর কাছে সবচেয়ে অপছন্দনীয়।
তিনি আরও বলেন, দুই মুখবিশিষ্ট ব্যক্তি শুধু আল্লাহর কাছেই অপছন্দনীয় নয়, মানুষের কাছেও ঘৃণিত। কারণ, মানুষ যখন তার প্রকৃত চরিত্র বুঝতে পারে, তখন তাকে সবচেয়ে বেশি অপছন্দ করতে শুরু করে। তাই কারও মধ্যে এ ধরনের বদস্বভাব থাকলে তা থেকে তওবা করে ফিরে আসা এবং নিজের চরিত্র সংশোধন করা জরুরি।
মুনাফিকের বৈশিষ্ট্য প্রসঙ্গে শায়েখ আহমাদুল্লাহ বলেন, অধিকাংশ মানুষ সাধারণত একটি হাদিসে বর্ণিত মুনাফিকের তিন বা চারটি পরিচিত লক্ষণ সম্পর্কেই জানেন। কিন্তু পবিত্র কোরআন ও হাদিসে মুনাফিকদের আরও অনেক বৈশিষ্ট্যের কথা উল্লেখ রয়েছে। এসব বৈশিষ্ট্যের অনেকগুলো মানুষের নিজেদের মধ্যেও থাকতে পারে, অথচ তারা সে বিষয়ে অবগত নন।
এ কারণে নিজের মধ্যে মুনাফিকের কোনো বৈশিষ্ট্য রয়েছে কি না, তা খুঁজে দেখা প্রয়োজন বলে মনে করেন তিনি। পাশাপাশি মুনাফিকের চরিত্র ও বৈশিষ্ট্য সম্পর্কে আরও জানাশোনা বাড়ানো এবং সেসব থেকে নিজেকে রক্ষা করার চেষ্টা করতে হবে।
আলোচনার শেষ পর্যায়ে শায়েখ আহমাদুল্লাহ বলেন, প্রত্যেক মুমিনের উচিত নিজের চরিত্র নিয়মিত পর্যালোচনা করা। দ্বিমুখী আচরণ ও ঝগড়াটে স্বভাব থেকে দূরে থাকার পাশাপাশি নিজের মধ্যে থাকা এ ধরনের বদঅভ্যাস চিহ্নিত করে সংশোধনের উদ্যোগ নিতে হবে।
/এসএন