• ঢাকা
  • শুক্রবার, ০৬ নভেম্বর ২০২৬, ০৪:২৩ পিএম


‘জনগণের মনের ভাষা বুঝতে ব্যর্থ হলে ৭ নভেম্বরের মতো পরিণতি হবে’—জামায়াত আমির

দি পালস বিডি অনলাইন ডেস্ক
আপডেট টাইম: ৬ নভেম্বর ২০২৬ ৩:৩৫ পিএম


ফ্যাসিবাদ কোনো নির্দিষ্ট রাজনৈতিক দলের নাম নয়, বরং এটি একটি ভাইরাস বলে মন্তব্য করেছেন বাংলাদেশ জামায়াতে ইসলামীর আমির ও বিরোধীদলীয় নেতা ডা. শফিকুর রহমান। শুক্রবার (৬ নভেম্বর) সকালে জাতীয় বিপ্লবী ও সংহতি দিবস উপলক্ষে আয়োজিত এক আলোচনা সভায় বক্তব্য দিতে গিয়ে তিনি এ মন্তব্য করেন।

ডা. শফিকুর রহমান বলেন, ‘সমাজের সর্বক্ষেত্রে এই ভাইরাসের লক্ষণ এখন স্পষ্ট। জনগণের অধিকার নিশ্চিত না হলে দেশে বিপ্লব বারবার ফিরে আসবে। যারা জনগণের মনের ভাষা বুঝতে ব্যর্থ হবেন, তাদের পরিণতি ৭ নভেম্বরের মতোই হবে।’

৭ নভেম্বরের তাৎপর্য প্রসঙ্গে জামায়াত আমির বলেন, এই দিবসের গুরুত্ব ও তাৎপর্য শুনতে শুনতেই তার জীবনের ৫৫ বছর কেটে গেছে। কিন্তু দিবসটি থেকে রাজনীতিবিদদের যে শিক্ষা গ্রহণ করা প্রয়োজন ছিল, বর্তমান পরিস্থিতি বলছে, তারা সেই শিক্ষা নিতে পারেননি।

১৯৭৫ সালের ৭ নভেম্বর সিপাহিদের বিদ্রোহের পেছনের কারণ তুলে ধরে তিনি বলেন, ‘১৯৭৫ সালের ৭ নভেম্বর সিপাহিরা কেন বিদ্রোহ করেছিলেন, তার পেছনে অনেক কারণ ছিল। ১৯৭২ সালে ক্ষমতায় বসেই শেখ মুজিবুর রহমান দেশের সব ইসলামী সংগঠন নিষিদ্ধ করেছিলেন। অথচ ১৯৭০ সালের নির্বাচনে এসব সংগঠন সক্রিয় ছিল এবং নির্বাচনে অংশ নিয়েছিল। শেখ মুজিব নির্বাচনের আগে বারবার বলেছিলেন, আওয়ামী লীগ নির্বাচিত হলে কোরআন-সুন্নাহবিরোধী কোনো কাজ করবে না। অথচ ক্ষমতায় এসে ইসলামী সংগঠনগুলোকে নিষিদ্ধ করা হলো।’

শেখ মুজিবুর রহমানের শাসনামলের বিভিন্ন পদক্ষেপের সমালোচনা করে জামায়াত আমির বলেন, বিপুল জনসমর্থন নিয়ে নির্বাচিত হওয়ার পরও অল্প সময়ের মধ্যে তিনি জাতির প্রতি আস্থা হারিয়ে ফেলেন। দেশে সেনাবাহিনী, পুলিশ, গণমাধ্যম ও আনসার বাহিনী থাকার পরও নিজের এবং দলের কর্মকাণ্ড নিয়ে জনগণের কাছে জবাবদিহি করতে হতে পারে—এমন আশঙ্কা তার মধ্যে তৈরি হয়েছিল বলে মন্তব্য করেন শফিকুর রহমান।

তিনি বলেন, নিজেদের নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে রক্ষীবাহিনী গঠন করা হয়েছিল। সেনাবাহিনীকে উপেক্ষা ও তুচ্ছতাচ্ছিল্য করে রক্ষীবাহিনীর হাতে সীমাহীন ক্ষমতা এবং ভারী অস্ত্র তুলে দেওয়া হয়েছিল।

রক্ষীবাহিনীর ক্ষমতা নিয়ে অভিযোগ তুলে তিনি বলেন, ‘রক্ষীবাহিনীকে এমন ক্ষমতা দেওয়া হয়েছিল যে তারা চাইলে কাউকে হত্যা করতে পারত, কোনো জবাবদিহি করতে হতো না। কোনো নারীকে ঘর থেকে তুলে আনলেও তাদের জবাবদিহি করতে হতো না। তিনি দাবি করেন, এভাবে ৩৪ হাজার মানুষকে বিনা বিচারে হত্যা করা হয়েছিল। নিহতদের মধ্যে কমপক্ষে ১০ হাজার মুক্তিযোদ্ধা ছিলেন।’

বিরোধীদলীয় নেতা আরও বলেন, ‘মুক্তিযোদ্ধা সিরাজ শিকদারকে হত্যার পর তৎকালীন প্রধানমন্ত্রী সংসদে দাঁড়িয়ে বলেছিলেন, ‘কোথায় সে?’ একজন মানুষকে বিনা বিচারে হত্যা করা হলো, আর দেশের প্রধানমন্ত্রী এমন বক্তব্য দিলেন। এভাবে সেদিন বিচারের প্রতি অবজ্ঞা এবং অবিচারকে বৈধতা দেওয়া হয়েছিল।’

১৯৭৫ সালের ৭ নভেম্বরের ঘটনাপ্রবাহ ব্যাখ্যা করে ডা. শফিকুর রহমান বলেন, সেনাবাহিনীর কর্মকর্তাদের প্রতি অবজ্ঞা, অপমান এবং তাদের উপেক্ষা করার কারণে সামরিক কর্মকর্তাদের মধ্যে ক্ষোভ তৈরি হয়েছিল। মূলত সেই ক্ষোভের প্রতিশোধ নিতেই সেদিনের অভ্যুত্থান সংঘটিত হয়েছিল। শুরুতে এ ঘটনায় জনগণের সরাসরি সম্পৃক্ততা ছিল না বলেও মন্তব্য করেন তিনি।

তিনি বলেন, ৭ নভেম্বরের পরদিন শুক্রবার সারা দেশে কারফিউ জারি করা হয়েছিল। পরবর্তী নির্দেশ না দেওয়া পর্যন্ত কারফিউ বলবৎ থাকবে বলে ঘোষণা দেওয়া হয়। তবে শুক্রবার জুমার নামাজ আদায়ের জন্য তিন ঘণ্টার জন্য কারফিউ শিথিল করা হয়েছিল।

নিজের স্মৃতিচারণ করে জামায়াত আমির বলেন, তখন তিনি সিলেটের এমসি কলেজের শিক্ষার্থী ছিলেন। জুমার নামাজ আদায় করতে বাইরে বের হয়ে তিনি দেখেছিলেন, মসজিদ, বাড়িঘরের ছাদ ও রাস্তাঘাটে শিশু-কিশোর থেকে শুরু করে বৃদ্ধ বয়সী মানুষের উপস্থিতি ছিল। সেদিন মানুষের মধ্যে ব্যাপক উচ্ছ্বাস লক্ষ্য করেছিলেন তিনি।

শফিকুর রহমান বলেন, কারফিউ জারি থাকায় মানুষ স্বাভাবিকভাবে রাস্তায় বের হতে পারেনি। কারফিউ শিথিল করা না হলে জনগণের প্রতিক্রিয়া আরও স্পষ্টভাবে বোঝা যেত। তবে জুমার নামাজের সময়ই মানুষের সমর্থনের একটি চিত্র দেখা গিয়েছিল বলে তিনি উল্লেখ করেন।

স্বাধীনতার ইতিহাস প্রসঙ্গে তিনি বলেন, এ ইতিহাসে কাউকে ছোট করার প্রয়োজন নেই। স্বাধীনতার ঘোষণা যিনি দিয়েছেন, তা মানুষ শুনেছে। একইভাবে স্বাধীনতার পতাকা একজন তরুণ নেতা সেদিন উড়িয়েছিলেন, তার নামও আলোচনায় আসা উচিত। মুক্তিযুদ্ধের সফল নেতৃত্ব দিয়েছিলেন জেনারেল ওসমানী, অথচ অনেক সময় তার অবদানও আলোচনায় আসে না বলে মন্তব্য করেন তিনি।

বিরোধীদলীয় নেতা বলেন, ‘নিজের এবং নিজের দলের নেতৃত্ব ছাড়া অন্য কারও অবদান স্বীকার না করার হীনমন্যতা থেকে বের হয়ে আসতে হবে। যার যেখানে অবদান রয়েছে, তাকে সেই স্বীকৃতি দিতে হবে।’

আলোচনা সভায় সভাপতিত্ব করেন জামায়াতে ইসলামীর কেন্দ্রীয় নির্বাহী পরিষদের সদস্য ও ঢাকা মহানগর উত্তর জামায়াতের আমির মোহাম্মদ সেলিম উদ্দিন। সভায় দলের কেন্দ্রীয় নেতারাও উপস্থিত ছিলেন।

/এসএন