প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়, প্রায় ১৫ বছর বাংলাদেশ শাসনের পর ২০২৪ সালের ৫ আগস্ট কয়েক সপ্তাহব্যাপী বিক্ষোভ এবং বিক্ষোভকারীদের বিরুদ্ধে সরকারি বাহিনীর কঠোর অভিযানের পর শেখ হাসিনা পদত্যাগ করে ভারতে চলে যান। আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনালের তথ্য অনুযায়ী, ওই আন্দোলনকে কেন্দ্র করে আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর অভিযানে ১ হাজার ৪০০ জন নিহত এবং ২০ হাজারের বেশি মানুষ আহত হন।
আল জাজিরা জানায়, কথিত ফোনালাপের রেকর্ডে কোনো কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা (এআই) দিয়ে কারসাজি হয়েছে কি না, তা যাচাই করতে অডিও ফরেনসিক বিশেষজ্ঞদের দিয়ে বিশ্লেষণ করানো হয়েছে। পাশাপাশি ভয়েস ম্যাচিং প্রযুক্তির মাধ্যমে ফোনালাপে অংশ নেওয়া ব্যক্তিদের কণ্ঠও শনাক্ত করা হয়েছে বলে প্রতিবেদনে দাবি করা হয়।
প্রতিবেদন অনুযায়ী, ন্যাশনাল টেলিকমিউনিকেশন মনিটরিং সেন্টার (এনটিএমসি) ২০২৪ সালের ১৮ জুলাই একটি ফোনালাপ রেকর্ড করে। সেই কথোপকথনে শেখ হাসিনা তার এক সহযোগীকে বলেন, তিনি নিরাপত্তা বাহিনীকে প্রাণঘাতী অস্ত্র ব্যবহারের নির্দেশ দিয়েছেন।
কথিত ফোনালাপে শেখ হাসিনাকে বলতে শোনা যায়, ‘আমার নির্দেশনা দেওয়া আছে। ওপেন নির্দেশনা দিয়ে দিয়েছি একদম। এখন লিথাল ওয়েপনস (প্রাণঘাতী অস্ত্র) ব্যবহার করবে। যেখানে পাবে, সোজা গুলি করবে। ওইটা বলা আছে। আমি এত দিন বাধা দিয়ে রাখছিলাম… ওই যে স্টুডেন্টরা ছিল, ওদের সেফটির (নিরাপত্তার) কথা চিন্তা করে।’
প্রতিবেদনটিতে আরও বলা হয়, পরে তৎকালীন ঢাকা দক্ষিণ সিটি করপোরেশনের মেয়র ফজলে নূর তাপসের সঙ্গে আরেকটি কথোপকথনে বিক্ষোভ দমনে হেলিকপ্টার ব্যবহারের বিষয়েও আলোচনা করেন শেখ হাসিনা। সেখানে তাকে বলতে শোনা যায়, ‘যেখানেই গ্যাদারিং (জমায়েত) দেখবে, সেখানে ওপর থেকে… এখন ওপর থেকে করা হচ্ছে, অলরেডি শুরু হয়ে গেছে কয়েকটা জায়গায়। কিছু (বিক্ষোভকারী) সরে গেছে।’
যদিও সে সময় বাংলাদেশের নিরাপত্তা বাহিনী হেলিকপ্টার থেকে গুলি চালানোর অভিযোগ অস্বীকার করেছিল। তবে ঢাকার পপুলার মেডিকেল কলেজ হাসপাতালের জরুরি বিভাগের চিকিৎসক শাবির শরিফ আল জাজিরাকে বলেন, তাদের হাসপাতালের সামনে হেলিকপ্টার থেকে লক্ষ্য করে গুলি ও টিয়ার শেল নিক্ষেপ করা হয়েছিল।
শাবির শরিফ আরও জানান, আহত বিক্ষোভকারীদের শরীরে এমন ধরনের গুলির আঘাত ছিল, যা ছিল অস্বাভাবিক। তার ভাষ্য, অনেকের শরীরে গুলি কাঁধ বা বুক দিয়ে ঢুকে শরীরের ভেতরেই থেকে গিয়েছিল। এক্স-রে করতে গিয়ে চিকিৎসকেরা শরীরে এত বেশি গুলি দেখে বিস্মিত হয়েছিলেন। তবে কী ধরনের গুলি ব্যবহার করা হয়েছিল, তা আল জাজিরা স্বাধীনভাবে যাচাই করতে পারেনি।
প্রতিবেদনে বলা হয়, এসব কথিত ফোনালাপ আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনালে তথ্যপ্রমাণ হিসেবে উপস্থাপন করতে পারেন প্রসিকিউটররা। ইতোমধ্যে শেখ হাসিনা, তার কয়েকজন মন্ত্রী এবং নিরাপত্তা বাহিনীর সদস্যদের বিরুদ্ধে মানবতাবিরোধী অপরাধের অভিযোগ গঠন করা হয়েছে। গত ১০ জুলাই শেখ হাসিনা ও আরও দুজন কর্মকর্তার বিরুদ্ধে অভিযোগ গঠন করা হয়। আগামী আগস্ট মাসে তাদের আনুষ্ঠানিক বিচার শুরু হওয়ার কথা রয়েছে।
আল জাজিরার ভাষ্য অনুযায়ী, শেখ হাসিনার সময়কার নজরদারি সংস্থা এনটিএমসিই এসব ফোনালাপ রেকর্ড করে। সংস্থাটির বিরুদ্ধে আগে থেকেই বিরোধী রাজনীতিকদের পাশাপাশি আওয়ামী লীগের রাজনৈতিক মিত্রদের ওপরও নজরদারির অভিযোগ ছিল।
আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনালের চিফ প্রসিকিউটর তাজুল ইসলাম বলেন, সাবেক প্রধানমন্ত্রী জানতেন তার ফোনালাপ রেকর্ড করা হচ্ছে। তার দাবি, কিছু ক্ষেত্রে ফোনের অপর প্রান্ত থেকে এ বিষয়ে ফোনে কথা না বলার পরামর্শ দেওয়া হলেও শেখ হাসিনা জবাবে বলতেন, ‘হ্যাঁ, আমি জানি… এটা রেকর্ড করা হচ্ছে, সমস্যা নেই।’
তাজুল ইসলাম আরও বলেন, ‘তিনি (শেখ হাসিনা) অন্যের জন্য অনেক গভীর গর্ত খুঁড়েছিলেন। এখন তিনিই সেই গর্তে পড়েছেন।’
প্রতিবেদনটিতে ২০২৪ সালের ১৬ জুলাই রংপুরে পুলিশের গুলিতে নিহত শিক্ষার্থী আবু সাঈদের ঘটনাও তুলে ধরা হয়েছে। আল জাজিরার দাবি, গোপনে রেকর্ড হওয়া আরেকটি ফোনালাপে শেখ হাসিনার তৎকালীন বেসরকারি বিনিয়োগ ও শিল্পবিষয়ক উপদেষ্টা সালমান এফ রহমানকে আবু সাঈদের ময়নাতদন্ত প্রতিবেদন দ্রুত সংগ্রহের বিষয়ে তৎকালীন পুলিশ মহাপরিদর্শক (আইজিপি) চৌধুরী আবদুল্লাহ আল-মামুনের কাছে জানতে চাইতে শোনা যায়।
সালমান এফ রহমান কথিত ফোনালাপে বলেন, ‘ময়নাতদন্ত প্রতিবেদন পেতে এত দেরি হচ্ছে কেন? কে লুকোচুরি খেলছে? রংপুর মেডিকেল?’
এ বিষয়ে রংপুর মেডিকেল কলেজ হাসপাতালের চিকিৎসক রাজিবুল ইসলাম আল জাজিরাকে বলেন, একাধিক গুলির জখমের বিষয়টি বাদ দিতে পুলিশ তাকে পাঁচবার আবু সাঈদের ময়নাতদন্ত প্রতিবেদন পরিবর্তন করতে বাধ্য করেছিল। তার ভাষ্য, পুলিশ এমন একটি প্রতিবেদন চেয়েছিল যাতে উল্লেখ থাকবে, আবু সাঈদ ইটপাটকেলের আঘাতে মারা গেছেন, যদিও তিনি পুলিশের গুলিতে নিহত হন।
অন্যদিকে, আল জাজিরাকে দেওয়া লিখিত বক্তব্যে আওয়ামী লীগের একজন মুখপাত্র দাবি করেছেন, শেখ হাসিনা কখনোই ‘প্রাণঘাতী অস্ত্র’ শব্দবন্ধ ব্যবহার করেননি এবং নিরাপত্তা বাহিনীকে প্রাণঘাতী শক্তি প্রয়োগের কোনো সুনির্দিষ্ট অনুমোদনও দেননি। তার দাবি, প্রকাশিত ফোনালাপের রেকর্ড হয় খণ্ডিত, নয়তো বিকৃত করা হয়েছে, অথবা দুটি বিষয়ই ঘটেছে।
একই লিখিত বক্তব্যে আরও বলা হয়েছে, আবু সাঈদের মৃত্যুর প্রকৃত কারণ অনুসন্ধানে সরকার আন্তরিকভাবে কাজ করেছে।
/এসএন