জুলাই গণ-অভ্যুত্থানে মানুষের আত্মত্যাগ এবং পরবর্তী নির্বাচনের মাধ্যমে রাষ্ট্র ও প্রশাসনে প্রত্যাশিত পরিবর্তন না হওয়ায় আক্ষেপ প্রকাশ করেছেন বিএনপির মহাসচিব ও স্থানীয় সরকার, পল্লী উন্নয়ন ও সমবায়মন্ত্রী মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীর। তিনি বলেন, সরকার গঠনের পর মন্ত্রী হিসেবে দায়িত্ব পালন করতে গিয়ে দেখছেন, প্রশাসনের পুরোনো চিত্র এখনো অনেকাংশে বহাল রয়েছে।বৃহস্পতিবার (৩০ জুলাই) জুলাই গণ-অভ্যুত্থান দিবস উপলক্ষে তথ্য ও সম্প্রচার মন্ত্রণালয়ের আয়োজিত আলোচনা সভায় প্রধান অতিথির বক্তব্যে তিনি এসব কথা বলেন। রাজধানীর সার্কিট হাউস এলাকায় তথ্য ভবনের মিলনায়তনে আয়োজিত অনুষ্ঠানে তথ্য অধিদপ্তরের প্রকাশনার মোড়ক উন্মোচন এবং একটি আলোকচিত্র প্রদর্শনীর উদ্বোধনও করা হয়।মির্জা ফখরুল বলেন, আগে যারা ঘুষ নিত, তারা এখনো একই প্রবণতা বজায় রেখেছে। ফাইল আটকে রাখা, অযথা জটিলতা সৃষ্টি করা কিংবা ভালো কাজ বাধাগ্রস্ত করার মানসিকতায় তেমন কোনো পরিবর্তন তিনি দেখছেন না। তাঁর ভাষায়, অনেকে শুধু ‘ভোল পাল্টেছে’, কিন্তু আচরণ বদলায়নি। বরং এদের অনেকেই এখন নিজেদের সবচেয়ে বড় জুলাই যোদ্ধা হিসেবে তুলে ধরছে।তিনি বলেন, এসব কথা তিনি আক্ষেপ থেকেই বলছেন। দীর্ঘ রাজনৈতিক জীবনের অভিজ্ঞতায় এবার সত্যিকার অর্থে পরিবর্তন দেখতে চেয়েছিলেন, কিন্তু এখনো সেই কাঙ্ক্ষিত পরিবর্তনের প্রতিফলন সমাজ ও প্রশাসনে দেখতে পাচ্ছেন না।স্থানীয় সরকারমন্ত্রী বলেন, শুধু সরকার বা রাজনৈতিক নেতৃত্বের পরিবর্তন যথেষ্ট নয়; সমাজের প্রতিটি মানুষের মন-মানসিকতারও পরিবর্তন প্রয়োজন। তা না হলে জুলাই গণ-অভ্যুত্থানে মানুষের আত্মত্যাগের প্রকৃত মূল্যায়ন সম্ভব হবে না।তবে হতাশার মধ্যেও আশার কথা তুলে ধরে মির্জা ফখরুল বলেন, প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানের নেতৃত্বে তিনি পরিবর্তনের একটি ইতিবাচক প্রচেষ্টা দেখতে পাচ্ছেন। তাঁর দাবি, তারেক রহমান নতুন নতুন দৃষ্টান্ত স্থাপনের চেষ্টা করছেন। সবাই মিলে সেই উদ্যোগকে এগিয়ে নিতে পারলে কাঙ্ক্ষিত পরিবর্তন বাস্তবায়ন সম্ভব হবে। এজন্য প্রধানমন্ত্রীকে সহযোগিতা ও সমর্থন দেওয়ার আহ্বান জানান তিনি।বিএনপির মহাসচিব বলেন, বাংলাদেশের ইতিহাস মূলত পরিবর্তনের ইতিহাস। ভাষা আন্দোলন, মুক্তিযুদ্ধ এবং ২০২৪ সালের জুলাই গণ-অভ্যুত্থান—প্রতিটি গুরুত্বপূর্ণ পরিবর্তনের পেছনেই মানুষের আত্মত্যাগ রয়েছে। তরুণদের নেতৃত্বে শুরু হওয়া জুলাই আন্দোলন প্রথমে একটি নির্দিষ্ট দাবিকে কেন্দ্র করে শুরু হলেও পরে তা রাষ্ট্র ও সমাজ পরিবর্তনের গণআন্দোলনে রূপ নেয়। এতে বহু তরুণ প্রাণ দিয়েছেন এবং অসংখ্য পরিবার স্বজন হারানোর বেদনা বহন করছে। এই আত্মত্যাগ তখনই সার্থক হবে, যখন রাষ্ট্র ও সমাজে প্রকৃত পরিবর্তন প্রতিষ্ঠিত হবে।তিনি আরও বলেন, রাজনৈতিক নেতৃত্বের মাধ্যমে পরিবর্তনের কিছু উদ্যোগ ইতোমধ্যে দেখা যাচ্ছে। সেই প্রচেষ্টাকে সফল করতে সবাইকে ঐক্যবদ্ধভাবে কাজ করতে হবে। এ
কটি গণতান্ত্রিক, অসাম্প্রদায়িক, মেধাভিত্তিক ও তরুণবান্ধব বাংলাদেশ গড়ে তোলার আহ্বান জানিয়ে তিনি বলেন, জুলাইয়ের চেতনার প্রতি প্রকৃত শ্রদ্ধা হবে এমন একটি রাষ্ট্র গঠন করা, যেখানে মানুষের আত্মত্যাগ বৃথা যাবে না এবং কাঙ্ক্ষিত পরিবর্তন বাস্তবে রূপ নেবে। তাঁর মতে, জুলাইয়ের চেতনার ভিত্তি মুক্তিযুদ্ধের চেতনার মধ্যেই নিহিত।অনুষ্ঠানে সভাপতির বক্তব্যে তথ্য ও সম্প্রচারমন্ত্রী জহির উদ্দিন স্বপন বলেন, দীর্ঘ ১৭ বছরের রাজনৈতিক আন্দোলন, নেতা-কর্মীদের কারাবরণ, নির্যাতন ও মিথ্যা মামলার ধারাবাহিকতার মধ্য দিয়েই জুলাই গণ-অভ্যুত্থানের সৃষ্টি হয়েছে। রাজনৈতিক নেতৃত্বের কৌশল এবং ছাত্রদের সক্রিয় অংশগ্রহণের ফলে আন্দোলন সর্বজনীন রূপ নেয় এবং শেষ পর্যন্ত স্বৈরাচার পতনের পথ তৈরি হয়।তিনি বলেন, মুক্তিযুদ্ধকে যেমন ব্যক্তিগত বা ব্যবসায়িক স্বার্থে ব্যবহার করা উচিত নয়, তেমনি জুলাই গণ-অভ্যুত্থানের চেতনাকেও কোনো স্বার্থান্বেষী উদ্যোগের অংশ হতে দেওয়া যাবে না। তাঁর মতে, মুক্তিযুদ্ধ ও জুলাই গণ-অভ্যুত্থান একই গণতান্ত্রিক আকাঙ্ক্ষার ধারাবাহিকতা এবং ভবিষ্যতের রাজনৈতিক চর্চায় এই চেতনাই পথনির্দেশক হওয়া উচিত।বাংলাদেশ প্রেস কাউন্সিলের চেয়ারম্যান এ কে এম আবদুল হাকিম জুলাই গণ-অভ্যুত্থানের সময় সংঘটিত হত্যা ও মানবাধিকার লঙ্ঘনের ঘটনার সুষ্ঠু ও নিরপেক্ষ বিচার নিশ্চিত করার ওপর গুরুত্বারোপ করেন।বাংলাদেশ ফেডারেল সাংবাদিক ইউনিয়নের (বিএফইউজে) মহাসচিব কাদের গনি চৌধুরী বলেন, অতীতে ফ্যাসিবাদী শাসন টিকিয়ে রাখতে গণমাধ্যমের একটি অংশ ভূমিকা রেখেছিল।
তিনি জুলাইয়ের শহীদদের স্মরণে স্মৃতিসৌধ নির্মাণ, শহীদ পরিবারের জন্য সম্মানজনক সহায়তা এবং হত্যাকাণ্ডের দৃশ্যমান বিচার নিশ্চিত করার দাবি জানান।জাতীয় প্রেসক্লাবের সভাপতি হাসান হাফিজ বলেন, জুলাই গণ-অভ্যুত্থান কোনো আকস্মিক ঘটনা ছিল না; এর পেছনে ছিল দীর্ঘ ১৭ বছরের দমন-পীড়ন, গুম, হত্যা ও রাজনৈতিক নিপীড়নের ইতিহাস।বাংলাদেশ স্কাউটসের উপপ্রধান জাতীয় কমিশনার এবং শহীদ মীর মাহফুজুর রহমান মুগ্ধর ভাই মীর মাহবুবুর রহমান স্নিগ্ধ বলেন, জুলাই আন্দোলনে অংশ নেওয়া তরুণরা সহযোদ্ধাদের নিহত হতে দেখেও পিছু হটেননি। দীর্ঘদিনের দমনমূলক রাষ্ট্রব্যবস্থা থেকে মুক্তির আকাঙ্ক্ষাই তাদের সাহস জুগিয়েছিল।
এ ছাড়া অনুষ্ঠানে তথ্য ও সম্প্রচার মন্ত্রণালয়ের অতিরিক্ত সচিব মো. শাহ আলম, বাংলাদেশ সরকারি কর্মকমিশনের সদস্য চৌধুরী সায়মা ফেরদৌসসহ বিভিন্ন পর্যায়ের ব্যক্তিরা বক্তব্য দেন।জুলাই গণ-অভ্যুত্থান দিবস উপলক্ষে তথ্য ভবন প্রাঙ্গণে দিনব্যাপী একটি বিশেষ আলোকচিত্র প্রদর্শনীর আয়োজন করা হয়। এতে ২০২৪ সালের জুলাই গণ-অভ্যুত্থানের বিভিন্ন মুহূর্তের আলোকচিত্র এবং ৬ আগস্ট প্রকাশিত কয়েকটি জাতীয় দৈনিকের প্রথম পাতাও প্রদর্শিত হয়, যেখানে তৎকালীন প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার দেশত্যাগের খবর স্থান পেয়েছে।
/বিএসএস