জুলাই শহীদ নারী মঞ্চের মাঝখানের স্তম্ভে থাকা নারী ভাস্কর্যগুলো কালো কাপড় দিয়ে ঢেকে রাখা হয়েছে। দিয়াবাড়ি, উত্তরা, ঢাকা। ২১ জুলাই ২০২৬ ছবি: তানভীর আহাম্মেদ
জুলাই গণ-অভ্যুত্থানে শহীদ ও অংশগ্রহণকারী নারীদের আত্মত্যাগ, সাহস এবং ঐতিহাসিক অবদান স্মরণে রাজধানীর উত্তরার দিয়াবাড়ি গোলচত্বরে (মাইলস্টোন স্কুল অ্যান্ড কলেজসংলগ্ন) নির্মিত ‘জুলাই শহীদ নারী মঞ্চ’–এর নারী ভাস্কর্যগুলো কালো কাপড় দিয়ে ঢেকে রাখা হয়েছে। কে বা কারা এবং কী কারণে শুধুমাত্র নারী ভাস্কর্যের অংশটি এভাবে ঢেকে রেখেছে, সে বিষয়ে নিশ্চিত কোনো তথ্য এখনো পাওয়া যায়নি।
আজ মঙ্গলবার দুপুরে সরেজমিনে দেখা যায়, গোলচত্বরের পূর্ব পাশে পশ্চিমমুখী করে নির্মিত স্মৃতিমঞ্চটিতে তিনটি স্তম্ভ রয়েছে। এক পাশের স্তম্ভে রয়েছে আন্দোলনের প্রতীক মুষ্টিবদ্ধ হাত এবং অন্য পাশের স্তম্ভে জুলাই অভ্যুত্থানের সময় বহুল উচ্চারিত বিভিন্ন প্রতিবাদী স্লোগান। এর মধ্যে লাল বৃত্তের ভেতরে লেখা রয়েছে, ‘দফা এক, দাবি এক, স্বৈরাচারের পদত্যাগ।’ তবে মাঝের স্তম্ভটি ওপর থেকে নিচ পর্যন্ত কালো কাপড় দিয়ে শক্ত করে ঢেকে রাখা হয়েছে। সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ছড়িয়ে পড়া একটি ছবিতে দেখা যায়, ওই স্তম্ভে ১০ জন নারীর আবক্ষ ভাস্কর্য ছিল।
ঘটনাটি সম্পর্কে জানতে স্থানীয় কয়েকজন দোকানির সঙ্গে কথা বলা হয়। গোলচত্বরসংলগ্ন চায়ের দোকানি শহীদুল ইসলাম জানান, শুরু থেকেই তিনি ভাস্কর্যের ওই অংশটি কালো কাপড়ে ঢাকা অবস্থায় দেখে আসছেন। রোদ, ঝড়-বৃষ্টি কিংবা বাতাসে কাপড় পুরোনো হয়ে ছিঁড়ে গেলে আবারও অজ্ঞাতপরিচয় ব্যক্তিরা নতুন কালো কাপড় দিয়ে সেটি ঢেকে দেন।
স্থানীয় বাসিন্দা মোহাম্মদ রাকিব জানান, সর্বশেষ গত শনিবার রাত দেড়টার দিকে তিনি তিন থেকে চারজন ব্যক্তিকে ওই মঞ্চে কালো কাপড় লাগাতে দেখেছেন। দিয়াবাড়ির বিআরটিএ কার্যালয়ের পাশে একটি খাবারের হোটেলে কর্মরত রাকিব বলেন, কাজ শেষে বাড়ি ফেরার পথে তিনি ঘটনাটি দেখলেও ওই ব্যক্তিদের কাউকে চিনতে পারেননি।
এদিকে নারী ভাস্কর্যের অংশটি কালো কাপড়ে ঢেকে রাখার বিষয়টি সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ব্যাপক আলোচনা-সমালোচনার জন্ম দিয়েছে। ‘চব্বিশের গণ-অভ্যুত্থানে উত্তরা’ (সংক্ষেপে ‘চব্বিশের উত্তরা’) নামের পেশাজীবী অভিভাবকদের একটি সংগঠনের সদস্য মনীষা মাফরুহা নিজের ফেসবুক পোস্টে দাবি করেছেন, কালো কাপড়ের নিচে থাকা কয়েকটি নারী ভাস্কর্য ভেঙে ফেলা হয়েছে।
ফেসবুক পোস্টে তিনি প্রশ্ন তোলেন, ‘জুলাই শহীদ নারী মঞ্চ আবার কালো কাপড়ে ঢাকা কেন? নারী ভাস্কর্যগুলো কোথায়?’ তিনি লেখেন, এটি শুধু একটি স্থাপনা নয়; বরং জুলাই আন্দোলনে নারীদের ভূমিকা স্মরণ, নতুন প্রজন্মের কাছে সেই ইতিহাস তুলে ধরা এবং সামাজিক-সাংস্কৃতিক কর্মকাণ্ডের কেন্দ্র হিসেবে পরিকল্পিত একটি স্মৃতিমঞ্চ। তবে উদ্বোধনের আগেই উদ্ভূত পরিস্থিতির কারণে এটি কালো কাপড়ে ঢেকে রাখা হয় এবং পরে আর আনুষ্ঠানিকভাবে উদ্বোধন করা হয়নি।
মনীষা মাফরুহা প্রথম আলোকে জানান, গত শনিবার ১০ জন নারীর স্মরণে তাঁদের সংগঠনের সদস্যরা মঞ্চসংলগ্ন এলাকায় গাছের চারা রোপণ করতে গেলে ভাস্কর্যের অংশটি খোলা অবস্থায় দেখেন। পরদিন সেখানে গিয়ে দেখেন, সেটি আবার কালো কাপড় দিয়ে ঢেকে দেওয়া হয়েছে। পরে কাপড় সরিয়ে তাঁদের দাবি, নারী অবয়বসংবলিত অংশ থেকে প্রায় চারটি ভাস্কর্য সম্পূর্ণভাবে অপসারণ করা হয়েছে।
তিনি আরও বলেন, গত ১৮ ডিসেম্বর মঞ্চটির আনুষ্ঠানিক উদ্বোধনের কথা ছিল। কিন্তু উদ্ভূত পরিস্থিতির কারণে উদ্বোধন স্থগিত হওয়ায় ঢাকা উত্তর সিটি করপোরেশনের নির্দেশে ঠিকাদার নারী ভাস্কর্যের অংশটি কালো কাপড় দিয়ে ঢেকে রেখেছিলেন। পরে দীর্ঘদিন সেখানে কোনো কাপড় ছিল না। সম্প্রতি নতুন করে কালো কাপড় দিয়ে ঢেকে দেওয়ার পাশাপাশি কয়েকটি নারী ভাস্কর্যও সরিয়ে ফেলা হয়েছে বলে তাঁর দাবি। কেন শুধু নারী ভাস্কর্য সরানো হয়েছে এবং কারা এ কাজ করেছে, তা দ্রুত তদন্ত করে প্রকাশের আহ্বান জানান তিনি।
ফেসবুক পোস্টে মনীষা আরও জানান, এ ঘটনায় ঢাকা উত্তর সিটি করপোরেশনের প্রশাসকের কাছে ‘চব্বিশের উত্তরা’র পক্ষ থেকে লিখিত অভিযোগ দেওয়া হয়েছে। একই সঙ্গে নিরপেক্ষ তদন্ত, অপসারিত নারী ভাস্কর্য উদ্ধার ও পুনঃস্থাপন, দায়ীদের চিহ্নিত করে ব্যবস্থা গ্রহণ, স্মৃতিমঞ্চের আনুষ্ঠানিক উদ্বোধন এবং ভবিষ্যতে এ ধরনের জাতীয় ও ঐতিহাসিক স্থাপনার নিরাপত্তা নিশ্চিতের দাবি জানানো হয়েছে।
স্মৃতিমঞ্চের ফলকে উদ্বোধক হিসেবে তৎকালীন ঢাকা উত্তর সিটি করপোরেশনের প্রশাসক মোহাম্মদ এজাজের নাম রয়েছে। এ বিষয়ে তিনি বলেন, ‘চব্বিশের উত্তরা’ সংগঠনের প্রস্তাব ও তাঁর উদ্যোগে মঞ্চটি নির্মাণ করা হয়েছিল এবং তাঁর দায়িত্বকালেই নির্মাণকাজ সম্পন্ন হয়। তবে নির্মাণকাজ চলাকালেই মঞ্চ ও নারী ভাস্কর্য নির্মাণকে কেন্দ্র করে তিনি উগ্রপন্থীদের হুমকি পেয়েছিলেন বলেও জানান।
ঘটনার বিষয়ে জানতে ঢাকা উত্তর সিটি করপোরেশনের অঞ্চল-৬–এর আঞ্চলিক নির্বাহী কর্মকর্তা জিয়াউর রহমান এবং নির্বাহী প্রকৌশলী হারুন অর রশীদের সঙ্গে একাধিকবার যোগাযোগের চেষ্টা করা হলেও তাঁদের কোনো বক্তব্য পাওয়া যায়নি।
তবে ঢাকা উত্তর সিটি করপোরেশনের বর্তমান প্রশাসক শফিকুল ইসলাম খান বিষয়টি সম্পর্কে অবগত থাকার কথা জানিয়ে বলেন, সংশ্লিষ্ট অঞ্চলের দায়িত্বপ্রাপ্ত কর্মকর্তাকে ঘটনাটি তদন্ত করে প্রতিবেদন দিতে বলা হয়েছে। প্রতিবেদন পাওয়ার পর প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা নেওয়া হবে।