• ঢাকা
  • বৃহস্পতিবার, ২৪ সেপ্টেম্বর ২০২৬, ০৬:২৪ এএম


হরমুজ প্রণালিতে ১১৫ দিন অবরুদ্ধ থাকার ভয়াবহ অভিজ্ঞতা শোনালেন বাংলাদেশি নাবিকেরা

দি পালস বিডি অনলাইন ডেস্ক
আপডেট টাইম: ২১ জুলাই ২০২৬ ১০:২৯ পিএম

পারস্য উপসাগরে চার মাসের বেশি সময় ধরে অবরুদ্ধ অবস্থায় থাকার সময় বহু জাহাজের নাবিক মানসিকভাবে বিপর্যস্ত হয়ে পড়েছিলেন। কেউ কেউ প্রাণও হারিয়েছেন। তবে তাঁদের চিকিৎসার জন্য কেউ এগিয়ে আসেনি। সেই সময় অনেক জাহাজ খাবার ও বিশুদ্ধ পানির সংকটে পড়ে, এমনকি হরমুজ প্রণালি অতিক্রম করতে গিয়ে কোনো কোনো জাহাজ ডুবেও যায়।

যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েলের সঙ্গে ইরানের যুদ্ধের মধ্যে হরমুজ প্রণালিতে আটকা পড়েছিল বাংলাদেশের পতাকাবাহী জাহাজ ‘বাংলার জয়যাত্রা’। টানা ৩ মাস ২৫ দিন অবরুদ্ধ থাকার পর গত ২৩ জুন রাতে জাহাজটি হরমুজ প্রণালি অতিক্রম করে। দেশে ফিরে আজ সেই দুঃসহ অভিজ্ঞতার কথা তুলে ধরেন জাহাজটির ক্যাপ্টেন মো. শফিকুল ইসলাম।

আজ সন্ধ্যায় ঢাকার হজরত শাহজালাল আন্তর্জাতিক বিমানবন্দরে আয়োজিত এক সংবাদ সম্মেলনে তিনি এসব কথা বলেন। এর আগে দক্ষিণ আফ্রিকার ডারবান থেকে রওনা হয়ে বিকেলে তাঁদের বহনকারী উড়োজাহাজটি দেশে পৌঁছায়।

সংবাদ সম্মেলনে ক্যাপ্টেন শফিকুল ইসলাম বলেন, ‘আলহামদুলিল্লাহ, আমরা দ্বিতীয় জীবন পেলাম… দেশবাসী যাঁরা দোয়া করেছেন, মানসিক সাপোর্ট দিয়েছেন, প্রতিনিয়ত খোঁজখবর নিয়েছেন, সবার কাছে আমরা কৃতজ্ঞ।’

তিনি জানান, বাংলাদেশ সরকারের সময়োপযোগী সিদ্ধান্তের কারণেই তাঁরা রাষ্ট্রীয় সম্পদ নিরাপদে দেশে ফিরিয়ে আনতে পেরেছেন। যুদ্ধ চলাকালে জাহাজের ওপর দিয়ে ক্ষেপণাস্ত্র ছুটে যাওয়া এবং আশপাশে জাহাজ ডুবে যাওয়ার মতো পরিস্থিতির মধ্যেও সরকারের পক্ষ থেকে তাঁদের নিরাপত্তার জন্য হোটেলে আশ্রয় নেওয়ার পরামর্শ দেওয়া হয়েছিল। কিন্তু রাষ্ট্রীয় সম্পদ রক্ষার স্বার্থে তাঁরা জাহাজ ছেড়ে যাননি।

সংযুক্ত আরব আমিরাতের জেবেল আলী বন্দরে অবস্থানকালের অভিজ্ঞতা তুলে ধরে ক্যাপ্টেন শফিকুল ইসলাম বলেন, এক রাতে তাঁদের পাশের বার্থে ক্ষেপণাস্ত্র হামলা হয়। এতে একটি তেলবাহী ট্যাংকারে আগুন ধরে যায়। ছয়টি টাগবোট দিয়েও সেই আগুন নিয়ন্ত্রণে আনা সম্ভব হয়নি। তিনি বলেন, ট্যাংকারটির ৪০টি ট্যাংকের যেকোনো একটি বিস্ফোরিত হলে আগুন তাঁদের জাহাজেও ছড়িয়ে পড়তে পারত।

জাহাজটির তৎকালীন কমান্ডিং অফিসার প্রণয় কৃষ্ণ সেন জানান, স্যাটেলাইটভিত্তিক নেভিগেশন ব্যবস্থা অকার্যকর হয়ে পড়ায় পুরো সময়ই তাঁদের ম্যানুয়াল নেভিগেশনের ওপর নির্ভর করতে হয়েছে। এলাকাজুড়ে মাইন থাকার কারণে সামান্য পথচ্যুত হলেও বিস্ফোরণের ঝুঁকি ছিল।

দেশে পৌঁছানোর পর বিমানবন্দরের টার্মিনালে বাংলাদেশ শিপিং করপোরেশনের (বিএসসি) কর্মকর্তারা ফুল দিয়ে নাবিকদের স্বাগত জানান। টার্মিনালের বাইরে অপেক্ষায় ছিলেন তাঁদের স্বজনেরা। সংবাদ সম্মেলন শেষে নাবিকেরা বাইরে এলে স্বজনেরা তাঁদের জড়িয়ে ধরেন। এতে বিমানবন্দর এলাকায় এক আবেগঘন পরিবেশের সৃষ্টি হয়।

বাংলাদেশ শিপিং করপোরেশনের এই জাহাজটি গত ২ ফেব্রুয়ারি ভারত থেকে পণ্য নিয়ে হরমুজ প্রণালি পেরিয়ে পারস্য উপসাগরে প্রবেশ করে। পরে কাতারের একটি বন্দর থেকে স্টিল কয়েল বোঝাই করে ২৭ ফেব্রুয়ারি সংযুক্ত আরব আমিরাতের জেবেল আলী বন্দরে পৌঁছায়। এর পরদিনই ইরানে হামলা চালায় যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েল। সংঘাত শুরু হলে নিরাপত্তাজনিত কারণে জাহাজটি পারস্য উপসাগরেই আটকা পড়ে। অবশেষে ১১৫ দিন পর ইরানি বাহিনীর অনুমতি পেয়ে জাহাজটি নিরাপদে হরমুজ প্রণালি অতিক্রম করতে সক্ষম হয়।