ইরানের ক্ষেপণাস্ত্র ও ড্রোন হামলার ঝুঁকি থেকে মার্কিন সামরিক সম্পদকে আরও কার্যকরভাবে সুরক্ষিত রাখতে উপসাগরীয় অঞ্চলে থাকা যুক্তরাষ্ট্রের সামরিক ঘাঁটিগুলো ইসরায়েল ও মধ্যপ্রাচ্যের পশ্চিমাঞ্চলের অন্যান্য দেশে স্থানান্তরের পরামর্শ দিয়েছেন যুক্তরাষ্ট্রের সেন্ট্রাল কমান্ডের (সেন্টকম) সাবেক প্রধান জেনারেল ফ্র্যাঙ্ক ম্যাকেঞ্জি। লন্ডনভিত্তিক মধ্যপ্রাচ্যকেন্দ্রিক সংবাদমাধ্যম মিডল ইস্ট আই–এর এক প্রতিবেদনে এ তথ্য জানানো হয়েছে।
গত সপ্তাহে জিউইশ ইনস্টিটিউট ফর ন্যাশনাল সিকিউরিটি অব আমেরিকা আয়োজিত এক ওয়েবিনারে বক্তব্য দিতে গিয়ে ম্যাকেঞ্জি বলেন, কাতারের আল–উদেইদ বিমানঘাঁটিতে সেন্টকমের ফরোয়ার্ড সদর দপ্তর রাখা বর্তমান নিরাপত্তা বাস্তবতায় কৌশলগতভাবে যৌক্তিক নয়।
তার ভাষায়, ‘যে কোনো সুস্থ মস্তিষ্কের মানুষই ইরান থেকে মাত্র ১০০ মাইল দূরে, কাতারে সেন্টকমের ফরোয়ার্ড সদর দপ্তর রাখবে না। অথচ সেটিই এখন রয়েছে।’
২০১৯ সালের ২৮ মার্চ থেকে ২০২২ সালের ১ এপ্রিল পর্যন্ত মধ্যপ্রাচ্যে মোতায়েন মার্কিন বাহিনীর সর্বোচ্চ সামরিক কর্মকর্তা হিসেবে দায়িত্ব পালনকারী ম্যাকেঞ্জি জানান, ২০২২ সালেই তিনি এবং আরও কয়েকজন কর্মকর্তা তৎকালীন বাইডেন প্রশাসনকে সতর্ক করেছিলেন যে সংযুক্ত আরব আমিরাত, কুয়েত, কাতার ও বাহরাইনে অবস্থিত মার্কিন সামরিক ঘাঁটিগুলো ইরানের সম্ভাব্য হামলার জন্য অত্যন্ত ঝুঁকিপূর্ণ।
তিনি বলেন, ইরানের সঙ্গে সংঘাত শুরু হলে যুক্তরাষ্ট্রের উচিত হবে আরও পশ্চিমে অবস্থিত ঘাঁটি ব্যবহার করা। সম্ভাব্য স্থান হিসেবে তিনি ইসরায়েল, মিশরসহ কয়েকটি দেশের নাম উল্লেখ করেন।
ম্যাকেঞ্জির মতে, মধ্যপ্রাচ্যে যুক্তরাষ্ট্রের বর্তমান সামরিক ঘাঁটির কাঠামো মূলত শীতল যুদ্ধের সময়কার বাস্তবতার ওপর ভিত্তি করে গড়ে উঠেছিল। সে সময় তেলসমৃদ্ধ উপসাগরীয় দেশগুলোকে সম্ভাব্য সোভিয়েত আগ্রাসন থেকে রক্ষা করাই ছিল প্রধান লক্ষ্য। পরবর্তীতে ইরাক ও আফগানিস্তানে পরিচালিত সামরিক অভিযানের সময়ও একই কাঠামো বহাল থাকে।
তিনি বলেন, বর্তমান নিরাপত্তা বাস্তবতায় সেই কৌশল আর কার্যকর নয় এবং এটি পুনর্বিবেচনা করা প্রয়োজন।
ম্যাকেঞ্জির এই মন্তব্য গত জুনে প্রকাশিত মিডল ইস্ট আই–এর একটি প্রতিবেদনের সঙ্গেও সামঞ্জস্যপূর্ণ। ওই প্রতিবেদনে সাবেক মার্কিন কর্মকর্তা ও বিশ্লেষকদের বরাত দিয়ে বলা হয়েছিল, সাম্প্রতিক সংঘাতে ইরান যেভাবে মার্কিন ঘাঁটির দুর্বলতা তুলে ধরেছে, তাতে মধ্যপ্রাচ্যে যুক্তরাষ্ট্রের সামরিক অবস্থান পুনর্গঠনের প্রয়োজন দেখা দিয়েছে।
প্রতিবেদনটিতে আরও বলা হয়, সাম্প্রতিক সংঘাতে বাহরাইনে যুক্তরাষ্ট্রের পঞ্চম নৌবহরের সদর দপ্তর, কাতারে সেন্টকমের সদর দপ্তর এবং কুয়েত ও সংযুক্ত আরব আমিরাতের বিভিন্ন সামরিক স্থাপনাকে লক্ষ্য করে ইরান হামলা চালায়। তবে এসব হামলায় প্রকৃত ক্ষয়ক্ষতির পরিমাণ নিয়ে এখনো বিশ্লেষকদের মধ্যে মতভেদ রয়েছে।
এ বিষয়ে ম্যাকেঞ্জি বলেন, কেবল স্যাটেলাইট ছবি দেখে কোনো সামরিক ঘাঁটি কার্যকর আছে কি না, সে বিষয়ে নিশ্চিত হওয়া যায় না। তার মতে, কোনো ঘাঁটির হ্যাঙ্গার, রাডার বা সেনা ব্যারাক ক্ষতিগ্রস্ত হলেও ভূগর্ভস্থ জ্বালানি সরবরাহ ব্যবস্থা ও রানওয়ে অক্ষত থাকলে সেখানে সামরিক কার্যক্রম চালিয়ে যাওয়া সম্ভব।
তিনি আরও বলেন, শত্রুর কাছাকাছি অবস্থান করলে যুদ্ধক্ষেত্রে দ্রুত পৌঁছানো সম্ভব হলেও একই সঙ্গে দ্রুত হামলার ঝুঁকিও বেড়ে যায়।
তবে আরব মিত্রদের প্রতি সংহতি বজায় রাখতে উপসাগরীয় দেশগুলোতে যুক্তরাষ্ট্রের সীমিত সামরিক উপস্থিতি অব্যাহত রাখার পক্ষেও মত দেন ম্যাকেঞ্জি। তার মতে, এসব ঘাঁটি মূলত জ্বালানি ভরার মতো লজিস্টিক সহায়তায় ব্যবহার করা যেতে পারে। অন্যদিকে দীর্ঘমেয়াদি সামরিক উপস্থিতি ইসরায়েল, মিশর এবং সৌদি আরবের লোহিত সাগর উপকূলীয় অঞ্চলে স্থানান্তর করা উচিত।
তিনি বলেন, ‘আমাদের পশ্চিম দিকে তাকাতে হবে। ইসরায়েলে ঘাঁটি স্থাপনের বিষয়টি বিবেচনা করতে হবে। আমার মতে, এটি একটি চমৎকার ধারণা।’
ম্যাকেঞ্জির দাবি, প্রবেশাধিকার, সামরিক ঘাঁটি ব্যবহার এবং আকাশপথ ব্যবহারের অনুমতির ক্ষেত্রে ইসরায়েলে তুলনামূলকভাবে কম বিধিনিষেধ রয়েছে। পাশাপাশি দেশটির উন্নত আকাশ প্রতিরক্ষা ব্যবস্থাও যুক্তরাষ্ট্রের জন্য বাড়তি সুবিধা হতে পারে।
তিনি আরও বলেন, বিভিন্ন দেশে মার্কিন সামরিক ঘাঁটি থাকলেও সেখান থেকে অন্য দেশে সামরিক অভিযান পরিচালনার ক্ষেত্রে স্বাগতিক দেশের অনুমতি প্রয়োজন হয়। সাম্প্রতিক সংঘাতের শুরুতে উপসাগরীয় কয়েকটি দেশ ইরানের বিরুদ্ধে হামলায় তাদের আকাশসীমা ব্যবহারের অনুমতি দেয়নি। পরে সৌদি আরব ও সংযুক্ত আরব আমিরাত সেই অবস্থান পরিবর্তন করে।
ম্যাকেঞ্জির ভাষায়, ‘সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হলো স্বাগতিক দেশের অবস্থান। তারা চাইবে, তাদের ঘাঁটি থেকে উড্ডয়ন করা যুদ্ধবিমান কোথায় যাবে, সে বিষয়ে তাদেরও মতামত থাকুক। সম্ভবত ইসরায়েলই এমন একটি দেশ, যেখানে আপনার যুদ্ধবিমানগুলোর ওপর সবচেয়ে কম বিধিনিষেধ থাকবে। আর এ কারণেই ইসরায়েল বিশেষভাবে আকর্ষণীয় একটি অবস্থান।’
সূত্র: মিডল ইস্ট আই
/এএসএফ