• ঢাকা
  • রোববার, ০২ আগস্ট ২০২৬, ০৩:০৯ পিএম


‘মনরে বোঝ দিবার লাগি আধা পচা ধান কাটছি’

দি পালস বিডি অনলাইন ডেস্ক
আপডেট টাইম: ৫ মে ২০২৬ ১২:৩৭ পিএম

সুনামগঞ্জ জেলার সুনামগঞ্জ সদর উপজেলার গৌরারং ইউনিয়নের নিয়ামতপুর গ্রামের কৃষক মো. শরিয়ত উল্লাহর পরিবারের পুরো জীবিকা নির্ভর করে হাওরের ধানের ওপর। কিন্তু চলতি মৌসুমে ভারী বৃষ্টি ও উজান থেকে আসা পাহাড়ি ঢলে তাঁর ফসলের বড় অংশ তলিয়ে যাওয়ায় এখন সংসার চালানো নিয়েই পড়েছেন চরম দুশ্চিন্তায়।

“পরতি বছর ধান পাই ১২০ থাকি ১৩০ মণ। ইবার অর্ধেক ধান পানিতে গেছে। মনরে খালি বোঝ দিবার লাগি আধা পচা ধান কাটছি। এখন বছরের খোরাকি নিয়া চিন্তাত আছি। আমরার একবারের ক্ষতি পোষাইতে পাঁচ বছর টানতে অয়”—হাওরের খলায় স্তূপ করে রাখা আধাপাকা ধানের আঁটি দেখিয়ে এভাবেই নিজের কষ্টের কথা জানান শরিয়ত উল্লাহ।

সোমবার দুপুরে জোয়ালভাঙা হাওরপাড়ে তাঁর সঙ্গে কথা হয়। ৬৭ বছর বয়সী এই কৃষকের সব জমিই এই হাওরে অবস্থিত। নিয়ামতপুরসহ আশপাশের ১৫ থেকে ২০টি গ্রামের কৃষকেরাও একই হাওরের ওপর নির্ভরশীল। তিনি তখন অন্য কৃষকদের সঙ্গে ধান শুকানোর কাজে ব্যস্ত ছিলেন। কিছু ধান এখনো মাড়াই করা হয়নি, পাশেই স্তূপ করে রাখা ছিল।

বাপ-দাদার সময় থেকে কৃষিকাজ করে আসা শরিয়ত উল্লাহ এবার হাওরে আট একর জমিতে বোরো ধানের আবাদ করেছিলেন। এর মধ্যে সাড়ে চার একর জমির ধান কাটতে পারলেও বাকি সাড়ে তিন একর জমির ফসল বৃষ্টি ও ঢলের পানিতে ডুবে গেছে।

তিনি জানান, যেসব জমির ধান কাটা হয়েছে, সেগুলোও পুরোপুরি পাকা ছিল না। পানি ঢোকার সময় শ্রমিকের সংকট থাকায় তিনি নিজে এবং গ্রামের কয়েকজনকে নিয়ে আধিভাগিতে ধান কাটেন। ফলে কাটা ধানের অর্ধেকই শ্রমিকদের দিতে হয়েছে। তখন এমন পরিস্থিতি ছিল যে, এক হাজার টাকা দিয়েও শ্রমিক পাওয়া যায়নি। আবার পানির কারণে কম্বাইন্ড হারভেস্টার মেশিন ব্যবহার করাও সম্ভব হয়নি।

এ বছর মার্চের মাঝামাঝি থেকে বৃষ্টি শুরু হয় এবং এপ্রিলের শেষ দিকে তা বাড়তে থাকে। এর সঙ্গে উজান থেকে নেমে আসা ঢল যুক্ত হয়ে হাওরের ফসল তলিয়ে যায়। কৃষি বিভাগের তথ্য অনুযায়ী, সুনামগঞ্জসহ কিশোরগঞ্জ ও নেত্রকোনার হাওরাঞ্চলের ৪২ হাজার হেক্টরের বেশি জমির ধানক্ষেত এভাবে ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে।

শরিয়ত উল্লাহ জানান, ২৫ এপ্রিল পর্যন্ত হাওরে পানি তুলনামূলক কম ছিল। কিন্তু পরদিন সকালেই দেখা যায় জমি দ্রুত তলিয়ে যাচ্ছে। এমন পরিস্থিতিতে ধান কাটা ও মাড়াই করা নিয়ে চরম সংকটে পড়েন তাঁরা। তিনি বলেন, “পানির তলের সব ধান পচি গিছে। এই ধান আর কাটা যাইত না। আর কাটলেও কোনো কামে আইত না।”

অতিবৃষ্টির কারণে কাটা ধান নিয়েও বিপাকে পড়তে হয়েছে। প্রায় এক সপ্তাহ ধরে খলায় ধান স্তূপ করে রাখা ছিল। ঝড়, বৃষ্টি ও বজ্রপাতের কারণে কাজ বন্ধ রাখতে হয়। পরে রোববার রোদ ওঠায় একটি মেশিন এনে ধান মাড়াই করা হয় এবং এখন তা শুকানোর চেষ্টা চলছে।

ভেজা ধান হাতে নিয়ে শরিয়ত উল্লাহ বলেন, ধানগুলো ময়লা হয়ে গেছে এবং ভালো চাল পাওয়া যাবে না। ফলে দামও কম পাওয়া যাবে। দীর্ঘ সময় স্তূপে থাকায় ধানে দুর্গন্ধও ধরে গেছে। যেখানে ৩০ শতক জমিতে ১৫ থেকে ২০ মণ ধান হওয়ার কথা, সেখানে এখন পাওয়া যাচ্ছে ১০ থেকে ১২ মণ। তাঁর কাটা ধানের প্রায় অর্ধেকই খলায় নষ্ট হয়ে গেছে।

ছয় সদস্যের পরিবারে স্ত্রী ও দুই ছেলে রয়েছে। বড় ছেলের বয়স ২২ বছর, ছোট ছেলের বয়স ছয়। তাঁরা সবাই মিলে কৃষিকাজ করেন। এবারের আবাদে নিজের সঞ্চয়ের পাশাপাশি অতিরিক্ত ২৮ হাজার টাকা ঋণ নিয়েছিলেন তিনি। একটি এনজিওর ঋণের সাপ্তাহিক কিস্তিও রয়েছে। বৈশাখ মাসে ধান বিক্রি করে ঋণ শোধ করার পরিকল্পনা ছিল, কিন্তু এখন কিস্তি চালানোই কঠিন হয়ে দাঁড়িয়েছে।

পরিবারের বছরে খাবারের জন্য প্রয়োজন হয় ৪০ থেকে ৫০ মণ ধান। পাশাপাশি মাসিক আনুষঙ্গিক খরচ কমপক্ষে ১০ হাজার টাকা। প্রতি বছর নিজের প্রয়োজন মিটিয়ে ২০ থেকে ৩০ মণ ধান বিক্রি করতেন তিনি। কিন্তু এবার পরিবারের খাদ্য জোগাড়ই অনিশ্চিত হয়ে পড়েছে।

পাশে থাকা অন্যান্য কৃষকেরাও একই পরিস্থিতির কথা জানান। তাঁদের মতে, এ বছর হাওরের প্রায় অর্ধেক ফসল নষ্ট হয়েছে। একরের পেছনে পাঁচ থেকে ছয় হাজার টাকা খরচ করে জমি আবাদ করতে হয়, যার জন্য বেশির ভাগ কৃষককে ঋণ নিতে হয়। কিন্তু এবার অনেকেই সেই খরচই তুলতে পারছেন না।

বর্তমানে শরিয়ত উল্লাহ ভাবছেন, বয়স সত্ত্বেও সংসার চালাতে তাঁকে শ্রমিকের কাজ করতে হবে। তিনি বলেন, “বৈশাখ মাসে হাওরের খলাত যে আনন্দ থাকে, ইবার এই আনন্দ আমরার মনে নাই। সামনের বছরটাই আমরার নিরানন্দে যাইব।”