অতিবৃষ্টি ও উজান থেকে নেমে আসা পাহাড়ি ঢলে নেত্রকোনার হাওড়াঞ্চলসহ জেলার ১০টি উপজেলায় ব্যাপক ফসলের ক্ষয়ক্ষতি হয়েছে। প্রাথমিক হিসেবে অন্তত ২২ হাজার ৩৪৮ হেক্টর জমির ফসল নষ্ট হওয়ার তথ্য পাওয়া গেছে।
জেলা প্রশাসনের প্রাথমিক জরিপ অনুযায়ী, প্রায় ৬৯ হাজার ৬৯৮ জন কৃষক ক্ষতির মুখে পড়েছেন এবং এতে প্রায় ৩১৩ কোটি টাকার ফসলহানি হয়েছে।
জেলা প্রশাসন ও কৃষি বিভাগের তথ্য অনুযায়ী, কলমাকান্দা উপজেলায় ১৪ হাজার ৬৭৫টি পরিবারের ৭ হাজার ২৫০ হেক্টর জমি, খালিয়াজুরীতে ১৫ হাজার ১৩৩টি পরিবারের ৬ হাজার ২০০ হেক্টর, মদনে ৮ হাজার ৪৭০টি পরিবারের ৩ হাজার ৮৫০ হেক্টর জমি ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে। এছাড়া নেত্রকোনা সদরে ৩ হাজার ৯৬৫টি পরিবারের ৪৯৫ হেক্টর, বারহাট্টায় ৩ হাজার ৩৬৫টি পরিবারের ৫৮২ হেক্টর, কেন্দুয়ায় ৯ হাজার ৩৪০ পরিবারের ১ হাজার ৩১০ হেক্টর, আটপাড়ায় ৭ হাজার ৫৫০ পরিবারের ১ হাজার ৬০০ হেক্টর, মোহনগঞ্জে ৩ হাজার ৫০০ পরিবারের ৪৩৪ দশমিক ৫ হেক্টর, পূর্বধলায় ১ হাজার ২৫০ পরিবারের ৩০০ হেক্টর এবং দুর্গাপুরে ২ হাজার ৪৫০ পরিবারের ৩২৭ হেক্টর জমির ফসল ক্ষতি হয়েছে।
তবে স্থানীয়দের দাবি, প্রকৃত ক্ষতির পরিমাণ সরকারি হিসাবের তুলনায় অনেক বেশি। তাদের মতে, কৃষি বিভাগের জরিপে বাস্তব চিত্র পুরোপুরি উঠে আসেনি।
পানি উন্নয়ন বোর্ড (পাউবো) সূত্রে জানা গেছে, চলতি বছরে নেত্রকোনায় ৩১ কোটি টাকা ব্যয়ে ১৩৮ কিলোমিটার ফসলরক্ষা বাঁধ নির্মাণ করা হয়। এই বাঁধের ওপর প্রায় ৪২ হাজার হেক্টর জমির বোরো ধান নির্ভরশীল, যেখানে উৎপাদন হয় প্রায় ৩ লাখ টন ধান। এই ফসলের ওপরই হাওড় অঞ্চলের কৃষকদের সারাবছরের জীবনযাপন ও সন্তানের শিক্ষার ব্যয় নির্ভর করে। ফলে ফসল হারানোর শঙ্কা তাদের জীবনে অনিশ্চয়তা তৈরি করে।
এবার অতিবৃষ্টি ও পাহাড়ি ঢলের কারণে জেলার বিভিন্ন নদ-নদীর পানি বাড়লেও কোনো বাঁধ ভাঙার ঘটনা ঘটেনি। তবে বৃষ্টির পানি জমে থেকেই ক্ষতির মূল কারণ হয়ে দাঁড়িয়েছে।
জেলা কৃষি কর্মকর্তার কার্যালয় ও পাউবো সূত্রে জানা গেছে, এ বছর নেত্রকোনার ১০ উপজেলায় ১ লাখ ৮৫ হাজার ৫৪৭ হেক্টর জমিতে বোরো ধানের আবাদ হয়েছে। উৎপাদনের লক্ষ্যমাত্রা নির্ধারণ করা হয়েছে ১৩ লাখ ২১ হাজার ৭৩২ টন। এর মধ্যে হাওড় এলাকায় ৪১ হাজার ৬৫ হেক্টর জমিতে ধান চাষ করা হয়। সরকারি হিসাবে হাওড়ের ৬২ শতাংশ জমির ধান ইতোমধ্যে কাটা হয়েছে, তবে অতিবৃষ্টিতে ২২ হাজার ৩৪৮ হেক্টর জমির ধান পানিতে তলিয়ে গেছে।
তবে মাঠপর্যায়ের বাস্তবতা ভিন্ন চিত্র তুলে ধরছে। খালিয়াজুরী, মোহনগঞ্জ, মদন, কলমাকান্দা, আটপাড়া ও বারহাট্টা উপজেলার বিভিন্ন হাওর এলাকায় ঘুরে দেখা গেছে, এখনো প্রায় ৬০ শতাংশ জমির ধান কাটা বাকি রয়েছে এবং প্রায় সাড়ে ২৩ হাজার হেক্টর জমির ধান পানিতে নিমজ্জিত।
কৃষকদের সঙ্গে কথা বলে জানা গেছে, এ সময় হাওড়ে পানি আসা স্বাভাবিক হলেও এবার ভারতের চেরাপুঞ্জি, আসাম, সিলেট ও ময়মনসিংহ অঞ্চলে অতিবৃষ্টির কারণে পরিস্থিতি আরও খারাপ হয়েছে। যদিও সরাসরি ঢলের পানি হাওড়ে প্রবেশ করেনি, তবে অতিরিক্ত বৃষ্টির পানি জমে ক্ষতির কারণ হয়েছে।
এছাড়া ডিজেল সংকটের কারণে কৃষকেরা হার্ভেস্টার দিয়ে দ্রুত ধান কাটতে পারেননি। আগে বিভিন্ন জেলা থেকে শ্রমিক এনে ধান কাটা হলেও এখন যন্ত্রনির্ভরতার কারণে সেই সুযোগ কমে গেছে। অথচ জমিতে পানি জমে গেলে হার্ভেস্টার ব্যবহার করা যায় না। একই সঙ্গে শুকনো মৌসুমে পানি দেরিতে নামার কারণে বীজতলা তৈরি ও চারা রোপণও বিলম্বিত হয়েছে।
হাওড় অঞ্চলে অপরিকল্পিত বাঁধ নির্মাণের কারণে পানি নিষ্কাশন বাধাগ্রস্ত হচ্ছে। অনেক জলকপাট (স্লুইসগেট) অকার্যকর হয়ে পড়েছে এবং পানি চলাচলের পথ পলি জমে বন্ধ হয়ে গেছে।
খালিয়াজুরী উপজেলা কৃষি কর্মকর্তা মো. দেলোয়ার হোসেন জানান, উপজেলায় ২০ হাজার ২৩২ হেক্টর জমিতে বোরো আবাদ হয়েছে এবং শনিবার পর্যন্ত প্রায় ৫২ শতাংশ জমির ধান কাটা সম্ভব হয়েছে। বর্তমানে প্রায় সব জমির ধান পানির নিচে রয়েছে।
অন্যদিকে, জেলা পানি উন্নয়ন বোর্ডের নির্বাহী প্রকৌশলী মো. সাখাওয়াত হোসেন জানান, কংস ও উব্দাখালি নদীর পানি এখনো বিপৎসীমার ওপরে রয়েছে এবং ধনু নদীর পানি বিপৎসীমার ১ সেন্টিমিটার নিচ দিয়ে প্রবাহিত হচ্ছে।