• ঢাকা
  • সোমবার, ১৯ অক্টোবর ২০২৬, ০৭:৪৬ এএম


রিসোর্টে কক্ষ বুক করা ছিল, তবু খোঁজ নেই নাহিদুর ও তাঁর পরিবারের

দি পালস বিডি অনলাইন ডেস্ক
আপডেট টাইম: ১৮ অক্টোবর ২০২৬ ১২:২৯ পিএম

কক্সবাজারের উখিয়ার ইনানীতে টুপটুপ রেস্টো অ্যান্ড রিসোর্টে ভয়াবহ অগ্নিকাণ্ডের পর থেকে যশোরের একই পরিবারের চার সদস্য নিখোঁজ রয়েছেন। নিখোঁজ ব্যক্তিরা হলেন এক দম্পতি ও তাঁদের দুই শিশুসন্তান। আগুনে নিহত ব্যক্তিদের মধ্যে তাঁরাও থাকতে পারেন বলে আশঙ্কা করছেন স্বজনেরা। তবে শনিবার (১৭ অক্টোবর) রাত ১২টা পর্যন্ত তাঁদের বিষয়ে নিশ্চিত কোনো তথ্য পাওয়া যায়নি।

জানা গেছে, গত ১৬ থেকে ১৮ অক্টোবর পর্যন্ত রিসোর্টটির ২০২ নম্বর কক্ষে তাঁদের থাকার বুকিং ছিল। কিন্তু হাসপাতাল, পুলিশ ও সংশ্লিষ্ট সংস্থাগুলোর কাছে পরিবারের সদস্যদের বিষয়ে স্পষ্ট কোনো তথ্য নেই। সংবাদমাধ্যমে প্রকাশিত নিহত ও আহত ব্যক্তিদের তালিকাতেও তাঁদের নাম পাওয়া যায়নি বলে জানিয়েছেন স্বজনেরা। বুকিংয়ের নথি থাকা সত্ত্বেও তাঁদের সন্ধান না মেলায় উদ্বেগ ও উৎকণ্ঠার মধ্যে রয়েছেন পরিবারের সদস্যরা।

নিখোঁজ নাহিদুর রহমান যশোরের মণিরামপুর উপজেলার মোহনপুর গ্রামের মতিয়ার রহমানের ছেলে। তিনি ঢাকার শ্যামলীতে গ্র্যান্ড পাওয়ার লিমিটেড নামের একটি প্রতিষ্ঠানে কর্মকর্তা হিসেবে কর্মরত ছিলেন। স্ত্রী আফসানা এবং সাত বছর বয়সী মেয়ে রোবাইনা ও তিন বছর বয়সী মেয়ে সুনাইনাকে নিয়ে ঢাকায় বসবাস করতেন তিনি।

নাহিদুর মাওলানা ভাসানী বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয়ের ক্রিমিনোলজি অ্যান্ড পুলিশ সায়েন্স বিভাগের শিক্ষার্থী ছিলেন বলেও জানা গেছে।

বিশ্ববিদ্যালয়ের সপ্তম ব্যাচের শিক্ষার্থী তাহিরা সিদ্দিকা সূচি জানান, নাহিদুরের পরিবার চরম উদ্বেগের মধ্যে রয়েছে। বাড়িতে তাঁর বৃদ্ধ বাবা-মা রয়েছেন। তাঁরাও নাহিদুর ও পরিবারের অন্য সদস্যদের সঙ্গে যোগাযোগ করতে পারছেন না।

বুকিংয়ের নথিতে রয়েছে দুই রাত থাকার তথ্য

রিসোর্টের বুকিং নথি অনুযায়ী, ১৬ অক্টোবর থেকে ১৮ অক্টোবর পর্যন্ত দুই রাতের জন্য নাহিদুর রহমানের নামে ২০২ নম্বর সুপার ডিলাক্স কক্ষটি বুক করা হয়েছিল। সেখানে অতিথির সংখ্যা উল্লেখ করা হয়েছিল দুইজন। ১৮ অক্টোবর দুপুর ১টায় তাঁদের রিসোর্ট ছেড়ে যাওয়ার কথা ছিল। বুকিংয়ের বিলের একটি অনুলিপি সংবাদমাধ্যমের হাতে এসেছে।

নাহিদুরের বড় ভাই জাহিদুর রহমান প্রিন্স জানান, তাঁর ভাই শুক্রবার কক্সবাজারে যাওয়ার কথা জানিয়েছিলেন। শনিবার সকালে রিসোর্টে আগুন লাগার খবর পাওয়ার পর তিনি নাহিদুরকে ফোন করেন। কিন্তু নাহিদুর কিংবা তাঁর পরিবারের কারও সঙ্গে যোগাযোগ করতে পারেননি। এরপর থেকে পরিবারের সদস্য ও স্বজনেরা বিভিন্ন জায়গায় যোগাযোগ করে তাঁদের খোঁজ নেওয়ার চেষ্টা করছেন।

নাহিদুরের কর্মস্থল গ্র্যান্ড পাওয়ার লিমিটেডের ব্যবস্থাপনা পরিচালক মির্জা রকিবুজ্জামান জানান, তিনি বর্তমানে চীনে রয়েছেন। অগ্নিকাণ্ডের খবর শোনার পর তিনি এবং প্রতিষ্ঠানের অন্যরা নাহিদুরের সঙ্গে যোগাযোগের চেষ্টা করেও ব্যর্থ হয়েছেন।

নাহিদুরকে একজন ভালো কর্মকর্তা হিসেবে উল্লেখ করে মির্জা রকিবুজ্জামান বলেন, ঘটনাটি শোনার পর থেকে তিনি অসহায় বোধ করছেন।

পরিচয় শনাক্তে ডিএনএ পরীক্ষার উদ্যোগ

কক্সবাজারের অতিরিক্ত পুলিশ সুপার অহিদুর রহমান জানান, নাহিদুর নিখোঁজ রয়েছেন বলে পুলিশ জানতে পেরেছে।

পরে তিনি জানান, অগ্নিকাণ্ডে নিহত ব্যক্তিদের মধ্যে ছয়জনের পরিচয় সম্পর্কে তথ্য পাওয়া গেলেও বাকি চারজনের পরিচয় নিশ্চিত করা যায়নি। মরদেহগুলোর পরিচয় শনাক্ত করার জন্য ডিএনএ নমুনা সংগ্রহ করা হচ্ছে।

কক্সবাজার ফায়ার সার্ভিস ও সিভিল ডিফেন্সের জ্যেষ্ঠ স্টেশন কর্মকর্তা দোলন আচার্য্য জানান, প্রথমে ছয়জনের মরদেহ উদ্ধার করা হয়েছিল। পরে রিসোর্টের শৌচাগার থেকে আরও চারজনের মরদেহ পাওয়া যায়।

তিনি বলেন, মরদেহগুলো মারাত্মকভাবে পুড়ে যাওয়ায় চেহারা দেখে পরিচয় শনাক্ত করা সম্ভব হচ্ছে না। মরদেহগুলো উখিয়া থানায় হস্তান্তর করা হয়েছে। পরিচয় নিশ্চিত করতে ডিএনএ পরীক্ষা প্রয়োজন।

অগ্নিকাণ্ডে ১০ জনের মৃত্যু, আহত ছয়জন

শনিবার সকালে মেরিন ড্রাইভসংলগ্ন উখিয়ার পাটুয়ারটেক এলাকার টুপটুপ রিসোর্টে আগুন লাগে। এ ঘটনায় মোট ১০ জনের মরদেহ উদ্ধার করা হয় এবং ছয়জন আহত হন।

সংবাদমাধ্যমে প্রকাশিত তালিকা অনুযায়ী, পরিচয় শনাক্ত হওয়া নিহত ব্যক্তিদের মধ্যে রয়েছেন ইসরাত জাহান মালিহা (৩০), মিলিতা মেহজাবিন আলভী (২৩), লায়লা জাহান নাবিলা (২৭), নাফিসতা মীম (২৭), ফারিহা কবির (৩৩), পাঁচ বছর বয়সী ফায়িজান আহম্মেদ, নাসরিন আক্তার মুক্তা (২৯), জিহাদ হাওলাদার ও তারিকুল ইসলাম।

আহত ছয়জন হলেন চিকিৎসক শিহাব উদ্দীন (৩১), তাঁর স্ত্রী নাফিজা নেওয়াজ খান (২৯), মান্নান (৩৪), মেহেরুন্নেসা (৩০), মাসুদ (৩০) ও সামিদা (৩২)। প্রকাশিত তথ্য অনুযায়ী, আহতদের মধ্যে পাঁচজনের শরীরের প্রায় ৫ শতাংশ দগ্ধ হয়েছে।

অগ্নিকাণ্ডের ঘটনায় রিসোর্টটির রেস্টুরেন্ট ম্যানেজার মোহাম্মদ সুমনকে গ্রেপ্তার করেছে পুলিশ। জেলা প্রশাসক আ. মো. মান্নান জানিয়েছেন, ঘটনাটি তদন্তের জন্য পাঁচ সদস্যের একটি কমিটি গঠন করা হয়েছে।

আগুনের কারণ অনুসন্ধানে তদন্ত কমিটি

অগ্নিকাণ্ডের কারণ সম্পর্কে প্রাথমিকভাবে গ্যাস সিলিন্ডার বিস্ফোরণের কথা বলা হচ্ছে। ঘটনাস্থল পরিদর্শন করে জেলা প্রশাসক মো. আবদুল মান্নান জানান, রিসোর্টের গ্যাস সিলিন্ডার বিস্ফোরণের কারণে আগুনের সূত্রপাত হয়ে থাকতে পারে বলে প্রাথমিকভাবে ধারণা করা হচ্ছে।

তবে আগুন লাগার প্রকৃত কারণ নিশ্চিত করতে অতিরিক্ত জেলা ম্যাজিস্ট্রেটকে প্রধান করে একটি তদন্ত কমিটি গঠন করা হয়েছে। কমিটির প্রতিবেদন পাওয়ার পরই অগ্নিকাণ্ডের প্রকৃত কারণ সম্পর্কে নিশ্চিত হওয়া যাবে বলে জানান জেলা প্রশাসক।

এদিকে বুকিংয়ের নথিতে নাহিদুর রহমানের পরিবারের থাকার তথ্য পাওয়া গেলেও তাঁদের অবস্থান সম্পর্কে নিশ্চিত হওয়া যায়নি। স্ত্রী ও দুই শিশুসন্তানসহ একই পরিবারের চার সদস্যের খোঁজ না মেলায় উদ্বেগে রয়েছেন স্বজনেরা।

/এসএন