• ঢাকা
  • মঙ্গলবার, ০৪ আগস্ট ২০২৬, ১১:০৮ পিএম


বড়পুকুরিয়ার বিষা/ক্ত ড্রেনে কয়লার গুঁড়া সংগ্রহ করেই জীবিকা নির্বাহ করছেন শতাধিক নারী

দি পালস বিডি অনলাইন ডেস্ক
আপডেট টাইম: ২৭ জুলাই ২০২৬ ৩:৫৯ পিএম

দিনাজপুরের বড়পুকুরিয়া কয়লাখনির বর্জ্য নিষ্কাশনের কালো ও বিষাক্ত ড্রেনে জাল পেতে ‘কালো সোনা’ নামে পরিচিত কয়লার গুঁড়া সংগ্রহ করছেন স্থানীয় শতাধিক নারী। জীবনের ঝুঁকি নিয়েই শীত, গ্রীষ্ম কিংবা বর্ষা—সব ঋতুতেই টানা ১৫ থেকে ১৬ বছর ধরে এই কঠিন ও ঝুঁকিপূর্ণ পেশার সঙ্গে যুক্ত থেকে তারা সংসারের খরচ চালিয়ে আসছেন।

সরেজমিনে দেখা যায়, নিজেদের তৈরি বিশেষ ধরনের নেটের হালচা ব্যবহার করে খনির পানি প্রবাহের ড্রেন থেকে ভেসে আসা কয়লা সংগ্রহ করছেন তারা। খনির ভূগর্ভ থেকে কয়লা উত্তোলন ও শোধনের পর বর্জ্য পানি পাম্পের মাধ্যমে ভূ-পৃষ্ঠের ড্রেন দিয়ে বাইরে ফেলা হয়। সেই পানির নিচে দীর্ঘ সময় অবস্থান করে যতটুকু কয়লা সংগ্রহ করা যায়, তা রোদে শুকিয়ে বিক্রি করেই চলে তাদের জীবিকা।

শীত, গ্রীষ্ম বা বর্ষা—কোনো ঋতুই তাদের কাজ থামাতে পারে না। জীবিকার তাগিদে ময়লা নিষ্কাশনের এই ড্রেনই হয়ে উঠেছে তাদের প্রধান আয়ের উৎস। ঝড়-বৃষ্টি কিংবা কনকনে শীত উপেক্ষা করে দিন-রাত বিষাক্ত পানিতে নেমে কয়লা সংগ্রহ করতে হয় তাদের। অভাবের সংসারে সামান্য স্বস্তি ফিরিয়ে আনতেই তারা বেছে নিয়েছেন এই দুর্গম পথ।

খনির পাশের চৌহাটি গ্রামের বাসিন্দা জেসমিন, মরিয়ম ও রুখসানার সঙ্গে কথা বলে জানা যায়, আশপাশের কয়েকটি গ্রামের প্রায় ১২০ জন নারী সমবায়ভিত্তিকভাবে এ কাজ করেন। দীর্ঘ ১৫ থেকে ১৬ বছর ধরে চলছে তাদের এই সংগ্রাম। ১২০ জন নারী আটটি দলে বিভক্ত হয়ে, প্রতি দলে ২০ থেকে ২৫ জন সদস্য নিয়ে পালাক্রমে ড্রেনে নেমে কয়লা সংগ্রহ করেন। প্রতিটি দল সপ্তাহে একদিন টানা ২৪ ঘণ্টা কাজ করার সুযোগ পায়।

তারা জানান, পানির সঙ্গে কতটুকু কয়লা আসবে, তা খনির যন্ত্র চালুর ওপর নির্ভর করে। কোনো দিন বেশি, আবার কোনো দিন কম কয়লা পাওয়া যায়। ভাগ্য ভালো থাকলে একটি দল একদিনে সাত থেকে আট মণ, কখনও ১০ থেকে ১২ মণ পর্যন্ত কয়লা সংগ্রহ করতে পারে। পরে এসব কয়লা প্রতি মণ ৪০০ থেকে ৫০০ টাকায় বিক্রি হয়। ইটভাটা চালু থাকলে দাম বেড়ে ৭০০ থেকে ৮০০ টাকা পর্যন্ত ওঠে। দলগতভাবে কাজ হওয়ায় একজন সদস্য মাসে গড়ে তিন দিন কাজের সুযোগ পান এবং প্রতিদিন ৪০০ থেকে ৫০০ টাকা পর্যন্ত আয় করতে পারেন।

কয়লা সংগ্রহকারী জেসমিন বলেন, যেদিন কাজ থাকে, সেদিন সকালে খেয়ে বেলা ১১টার দিকে পানিতে নামতে হয়। অভাবের কারণেই এত কষ্টের কাজ করতে হচ্ছে। তিনি আক্ষেপ করে বলেন, খনির পাশের গ্রামের বাসিন্দা হওয়া সত্ত্বেও তাদের পরিবারের কেউ খনিতে চাকরির সুযোগ পাননি। অথচ বাইরের অনেক মানুষ সেখানে চাকরি করছেন।

মনোয়ারা বেগম বলেন, কালো পানিতে নেমে কয়লা তুলে যে টাকা পাওয়া যায়, তা দিয়েই কোনোভাবে সংসার চলে। প্রায় ১৬ বছর ধরে তিনি এই কাজ করছেন। অনেক সময় কোনো কয়লা না পেয়ে খালি হাতেও ফিরে যেতে হয়।

মরিয়ম জানান, নেট সেলাই করে ড্রেনের পিলারের সঙ্গে বেঁধে রাখা হয়। পানির সঙ্গে ভেসে আসা কয়লা সেই নেটে আটকে যায়। মাঝেমধ্যে বাঁশের মাথায় লাগানো লোহার তৈরি সরঞ্জাম দিয়ে জমে থাকা ময়লা পরিষ্কার করতে হয়। দিনের শেষে যা আয় হয়, তা সবাই সমানভাবে ভাগ করে নেন।

তবে এই কাজের কারণে বড় ধরনের স্বাস্থ্যঝুঁকির মুখেও পড়ছেন এসব নারী। দীর্ঘ সময় কয়লাযুক্ত বিষাক্ত পানিতে কাজ করায় অনেকেই পানিবাহিত রোগ, চর্মরোগ ও শ্বাসকষ্টে ভুগছেন। স্থানীয়দের ভাষ্য, এ কাজ করতে গিয়ে অসুস্থ হয়ে অনেক নারী এখন শয্যাশায়ী কিংবা পেশা পরিবর্তন করতে বাধ্য হয়েছেন। কিন্তু দারিদ্র্যের কারণে নতুন নতুন নারীও এই ঝুঁকিপূর্ণ কাজে যুক্ত হচ্ছেন।

দিনাজপুর মেডিকেল কলেজ হাসপাতালের মেডিসিন বিভাগের আবাসিক চিকিৎসক ডা. আহসান আলী সরকার বলেন, দীর্ঘ সময় দূষিত পানিতে থাকায় হাত ও পায়ের তালুতে ক্ষতের সৃষ্টি হয়। এছাড়া ভূগর্ভস্থ কয়লার সূক্ষ্ম কণা ও বিভিন্ন রাসায়নিক উপাদান ত্বক, ফুসফুস ও শ্বাসযন্ত্রের মারাত্মক ক্ষতি করতে পারে। তিনি বলেন, বড় ধরনের জটিলতা না হলে এসব নারী চিকিৎসকের কাছে যান না, যা পরে প্রাণঘাতী রূপ নিতে পারে। তাই তাদের স্বাস্থ্যসচেতনতা বাড়ানোর পাশাপাশি নিয়মিত চিকিৎসাসেবার আওতায় আনা জরুরি।

/এসএন