• ঢাকা
  • বুধবার, ০৭ অক্টোবর ২০২৬, ০৯:২৯ পিএম


বই-খাতার বদলে সংসারের ভার, ক্যানসার আক্রান্ত মায়ের সেবায় ১০ বছরের মরিয়ম

দি পালস বিডি অনলাইন ডেস্ক
আপডেট টাইম: ২৫ জুলাই ২০২৬ ৯:১৫ পিএম

বই-খাতার বদলে সংসারের ভার, ক্যানসার আক্রান্ত মায়ের সেবায় ১০ বছরের মরিয়ম

যে বয়সে বই-খাতা হাতে নিয়ে মাদ্রাসায় যাওয়ার কথা, সেই বয়সেই সংসারের দায়িত্ব কাঁধে তুলে নিয়েছে ১০ বছরের মরিয়ম। ক্যানসারে আক্রান্ত মায়ের সেবা, দুই বছরের ছোট বোনের দেখাশোনা, রান্নাবান্না ও ঘরের কাজেই কাটছে তার প্রতিদিন। অর্থাভাবে মায়ের চিকিৎসা প্রায় বন্ধ হয়ে যাওয়ায় একদিকে মৃত্যুর সঙ্গে লড়ছেন ফাতেমা বেগম, অন্যদিকে থমকে যাচ্ছে ছোট্ট মরিয়মের শৈশব ও পড়াশোনা।

জামালপুরের মেলান্দহ উপজেলার নাংলা ইউনিয়নের ভুরুঙ্গা গ্রামের বাসিন্দা ফাতেমা বেগম। স্বামী আব্দুর রহিম ও তিন মেয়েকে নিয়ে ভালোই চলছিল তাদের সংসার। কিন্তু প্রায় এক বছর আগে ফাতেমার ক্যানসার ধরা পড়ার পর বদলে যায় পুরো পরিবারের জীবন। সুখের সংসারে নেমে আসে একের পর এক দুর্যোগ।

সংসারের স্বচ্ছলতা ফেরাতে ধারদেনা করে ২০২৪ সালে সিঙ্গাপুরে যান আব্দুর রহিম। কিন্তু বিদেশে থাকতেই স্ত্রীর ক্যানসারের খবর পেয়ে ২০২৫ সালে দেশে ফিরে আসেন। এরপর আর বিদেশে যাওয়া হয়নি। স্ত্রীকে বাঁচাতে নিজের সঞ্চয়, বিদেশে উপার্জিত অর্থ ও ধার করা টাকাসহ প্রায় সাত লাখ টাকা চিকিৎসায় ব্যয় করেন তিনি। দীর্ঘদিন চিকিৎসা চালাতে গিয়ে এখন পরিবারটি নিঃস্ব। অর্থের অভাবে ফাতেমা বেগমের কেমোথেরাপি ও প্রয়োজনীয় ওষুধ কেনা প্রায় বন্ধ হয়ে গেছে।

কান্নাজড়িত কণ্ঠে ফাতেমা বেগম বলেন, ছোট মেয়ের বয়স যখন মাত্র ছয় মাস, তখন প্রথম স্তনে একটি টিউমার ধরা পড়ে। সন্তানকে রেখে চিকিৎসা করাতে না পারায় পরে ময়মনসিংহ মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে পরীক্ষা করে জানতে পারেন, তিনি ক্যানসারে আক্রান্ত। এরপর ভুল পরামর্শে প্রায় আট-নয় মাস হোমিওপ্যাথি চিকিৎসা নিলেও অবস্থার উন্নতি হয়নি; বরং ক্ষত আরও বড় হয়েছে এবং নিয়মিত রক্তপাত শুরু হয়েছে। তিনি বলেন, চিকিৎসা করাতে গিয়ে তার স্বামী সর্বস্ব হারিয়েছেন। এখন সন্তানদের মুখের দিকে তাকিয়ে বেঁচে থাকতে চান এবং সমাজের বিত্তবান ও সহৃদয় মানুষের সহযোগিতা কামনা করেন।

অর্থাভাবে চিকিৎসা প্রায় বন্ধ হয়ে যাওয়ার পর থেকে দিন দিন ফাতেমা বেগমের শারীরিক অবস্থার অবনতি হচ্ছে। তীব্র ব্যথায় তিনি স্বাভাবিকভাবে বসতে বা শুয়ে থাকতে পারেন না। বিশেষ করে রাতে যন্ত্রণার কারণে তার চোখে ঘুম আসে না। অনেক সময় তার কান্না ও আর্তনাদে নির্ঘুম রাত কাটাতে হয় স্বামী, সন্তান ও প্রতিবেশীদের।

মায়ের অসুস্থতার সবচেয়ে বড় প্রভাব পড়েছে মরিয়মের জীবনে। একসময় স্থানীয় মাদ্রাসায় নিয়মিত পড়াশোনা করলেও এখন মায়ের সেবা, রান্নাবান্না, কাপড় ধোয়া এবং দুই বছরের ছোট বোনের দেখাশোনাতেই দিন কেটে যায় তার। ফলে তার পড়াশোনা প্রায় বন্ধ হওয়ার পথে।

মরিয়ম জানায়, সারাদিন মায়ের পাশে থাকতে হয়। সে মাকে ভাত খাওয়ায়, ওষুধ দেয়, কাপড় ধোয় এবং ছোট বোনকে দেখাশোনা করে। আগে নিয়মিত মাদ্রাসায় যেত, বন্ধুদের সঙ্গে পড়াশোনা করত। এখন আর তা সম্ভব হয় না। তার আশা, মানুষের সহযোগিতায় মা সুস্থ হয়ে উঠলে সে আবার আগের মতো মাদ্রাসায় ফিরে পড়াশোনা করতে পারবে।

ফাতেমার স্বামী আব্দুর রহিম বলেন, ২০০৯ সালে বাবার মৃত্যুর পর থেকেই সংসারের দায়িত্ব তার কাঁধে। ঋণ করে বিদেশে গেলেও ভাগ্যের পরিবর্তন হয়নি। এখন স্ত্রীর চিকিৎসা করাতে গিয়ে নিঃস্ব হয়ে পড়েছেন। স্ত্রীর শারীরিক অবস্থা এতটাই সংকটাপন্ন যে তাকে একা রেখে কোথাও কাজ করতে যেতে পারেন না। ফলে সংসারে কোনো আয় নেই। প্রতিদিন শুধু ওষুধ কিনতেই ৪০০ থেকে ৫০০ টাকা প্রয়োজন হয়, যা জোগাড় করতেও হিমশিম খেতে হচ্ছে। তাই তিনি দেশবাসী ও বিত্তবান মানুষের কাছে স্ত্রীর চিকিৎসার জন্য সহযোগিতা কামনা করেন।

স্থানীয় বাসিন্দারা জানান, প্রতিবেশীরা নিজেদের সামর্থ্য অনুযায়ী খাবার ও নিত্যপ্রয়োজনীয় জিনিসপত্র দিয়ে পরিবারটিকে সহায়তা করছেন। তবে ক্যানসারের মতো ব্যয়বহুল রোগের চিকিৎসার খরচ বহন করা তাদের পক্ষে সম্ভব নয়। তাই ফাতেমা বেগমের চিকিৎসা চালিয়ে নিতে সমাজের বিত্তবান ব্যক্তি, স্বেচ্ছাসেবী সংগঠন এবং সরকারি-বেসরকারি প্রতিষ্ঠানের সহযোগিতা প্রয়োজন।

এ বিষয়ে মেলান্দহ উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা (ইউএনও) জিন্নাতুল আরা বলেন, অসুস্থ ওই নারীর আর্থিক সহায়তার প্রয়োজনীয়তার বিষয়টি প্রশাসনের নজরে এসেছে। প্রয়োজনীয় কাগজপত্রসহ আবেদন করলে সরকারি বিধি অনুযায়ী দ্রুত আর্থিক সহায়তার ব্যবস্থা করা হবে। পাশাপাশি মরিয়মের নিয়মিত শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে যেতে না পারার বিষয়টিও খতিয়ে দেখে পরিবারটির জন্য প্রয়োজনীয় সব ধরনের সহযোগিতা নিশ্চিত করার চেষ্টা করা হবে।

/এএসএফ