চোখে আলো না থাকলেও যাদের মনের জোর আকাশছোঁয়া, আত্মমর্যাদার গল্প শুরু হয় ঠিক তাদের জীবন থেকেই। রাজধানীর ব্যস্ত সড়ক আর তীব্র যানজটের মাঝেও প্রতিদিন এক সংগ্রামী মানুষ নেমে পড়েন জীবনের লড়াইয়ে। এই লড়াই শুধু জীবিকা নির্বাহের নয়, নিজের সম্মান অটুট রাখারও। তিনি খোকন মিয়া।
ভোর চারটায় যখন শহরের অধিকাংশ মানুষ ঘুমে, তখনই শুরু হয় তার দিন। চোখে দেখতে না পারলেও আত্মবিশ্বাস আর সততার আলো তাকে পথ দেখায়। প্রতিদিনের মতো তিনি যত্ন করে বাদাম বেছে ঝুড়ি গুছিয়ে নেন। পরিবারের লোকজন বিশ্রাম নিতে বললেও তিনি মৃদু হেসে বলেন, “নিজের পরিশ্রমে উপার্জিত ভাতের মতো তৃপ্তি আর কিছুতে নেই। আল্লাহ হাত-পা ভালো রেখেছেন, খেটে খাওয়াই আমার আনন্দ।”
সকাল গড়ালে গাবতলী-গুলিস্তান রুটের একটি লোকাল বাসে ওঠেন তিনি। এক হাতে সাদা লাঠি, অন্য হাতে বাদামের ঝুড়ি। বাসের পরিচিত হেল্পাররা তাকে সম্মানের সঙ্গে উঠতে সাহায্য করেন। বাসের ঝাঁকুনি সামলে তিনি পরিচিত কণ্ঠে ডাক দেন, “ভাজা বাদাম, টাটকা গরম বাদাম নিন ভাই।”
এক যাত্রী বিস্ময় নিয়ে জিজ্ঞেস করেন, “এত কষ্ট করেন কেন? চাইলে তো মানুষের সাহায্য নিয়েও চলতে পারতেন।”
খোকন মিয়া হাসিমুখে উত্তর দেন, “সততার সঙ্গে পরিশ্রম করে বাঁচার গর্বই আলাদা। কষ্ট হলেও নিজের উপার্জনে জীবন কাটালে বুক উঁচু করে চলা যায়।”
তার কথা শুনে বাসের পরিবেশ যেন বদলে যায়। এক মধ্যবয়সী ভদ্রলোক চার প্যাকেট বাদাম কিনে বড় একটি নোট দিয়ে বলেন, “বাকিটা রেখে দিন।”
খোকন মিয়া নোটটি আঙুলে ছুঁয়ে মূল্য বুঝে নিজের পকেট থেকে খুচরা টাকা বের করে ফেরত দেন। বিনয়ের সঙ্গে বলেন, “আমি অতিরিক্ত টাকা নিই না। বাদামের যা দাম, শুধু সেটাই নেব। বাকি টাকা আপনার হক।”
মুহূর্তেই পুরো বাস নীরব হয়ে যায়। তার সততা ও আত্মমর্যাদা যেন সবার জন্য এক নিঃশব্দ শিক্ষা হয়ে ওঠে। শারীরিক সীমাবদ্ধতা কখনোই একজন মানুষকে সৎ জীবন থেকে দূরে সরাতে পারে না—খোকন মিয়া তারই জীবন্ত উদাহরণ।
দিন শেষে সামান্য লাভ নিয়ে যখন তিনি বাড়ি ফেরেন, তখন ক্লান্তির চেয়ে বড় হয়ে ওঠে তৃপ্তি। কারণ তিনি জানেন, প্রতিটি উপার্জিত টাকা এসেছে সৎ পরিশ্রমের বিনিময়ে।
হয়তো তিনি আমাদের মতো পৃথিবীর রঙ দেখতে পান না, কিন্তু সততা, আত্মসম্মান আর কঠোর পরিশ্রমের আলোয় তিনি প্রতিদিন অসংখ্য মানুষকে জীবনের প্রকৃত অর্থ শিখিয়ে চলেছেন।
/এএসএফ