সামাজিক ব্যবসা, তরুণ ও প্রযুক্তির শক্তিকে কাজে লাগিয়ে একটি ইতিবাচক পৃথিবী গড়ে তোলার আহ্বান জানিয়েছেন নোবেলজয়ী অধ্যাপক ও বাংলাদেশের সাবেক অন্তর্বর্তী সরকারের প্রধান উপদেষ্টা ড. মুহাম্মদ ইউনূস। জাতিসংঘ সদর দফতরে আয়োজিত একটি উচ্চপর্যায়ের অনুষ্ঠানে বক্তব্য দেন তিনি।
সোমবার (২১ সেপ্টেম্বর) জাতিসংঘের সাধারণ পরিষদের অধিবেশনের উদ্বোধনী দিনে আয়োজিত ‘সামাজিক ব্যবসা, তরুণ ও প্রযুক্তি’ বিষয়ক উচ্চপর্যায়ের সাইড ইভেন্টের ১১তম আসরে অংশ নেন অধ্যাপক ইউনূস। সেখানে তিনি বর্তমান বৈশ্বিক বাস্তবতা, কূটনীতির ভাষা, ক্ষুদ্রঋণ এবং সামাজিক ব্যবসার বিভিন্ন দিক ও এর প্রভাব তুলে ধরেন।
অনুষ্ঠানে উপস্থিত ছিলেন জাতিসংঘ সাধারণ পরিষদের সভাপতি ড. খলিলুর রহমান, তিমুর-লেস্তের প্রেসিডেন্ট জোসে রামোস-হোর্তা এবং ব্রাজিলের সামাজিক উন্নয়ন ও সহায়তা, পরিবার ও ক্ষুধামুক্তিমন্ত্রী ওয়েলিংটন দিয়াসসহ বিভিন্ন বিশিষ্ট ব্যক্তি।
বক্তব্যে অধ্যাপক ইউনূস বলেন, বর্তমান বিশ্বের কূটনীতিতে অনেক সময় শব্দের প্রকৃত অর্থ হারিয়ে যাচ্ছে। এর ফলে যুদ্ধ ও শান্তির মতো মৌলিক ধারণাগুলো নিয়েও বিভ্রান্তি তৈরি হচ্ছে। তিনি আশা প্রকাশ করেন, সাধারণ পরিষদের এই অধিবেশন শব্দের স্পষ্টতা ও প্রকৃত অর্থ ফিরিয়ে আনার ক্ষেত্রে ভূমিকা রাখবে। একই সঙ্গে তিনি বলেন, বিশ্বের সাধারণ মানুষের বড় আকাঙ্ক্ষা এখন এই অধিবেশনের দিকে নিবদ্ধ।
ক্ষুদ্রঋণের ৫০ বছর পূর্তির প্রসঙ্গ তুলে ধরে ড. ইউনূস যুক্তরাষ্ট্রে পরিচালিত ‘গ্রামীণ আমেরিকা’ কর্মসূচির উদাহরণ দেন। তিনি বলেন, এই কর্মসূচি দেখিয়েছে কীভাবে উন্নত বিশ্বেও প্রান্তিক মানুষের পাশে দাঁড়ানো সম্ভব।
২০০৮ সালে নিউ ইয়র্কে সর্বোচ্চ ৫০০ ডলারের ঋণসীমা নিয়ে ‘গ্রামীণ আমেরিকা’র কার্যক্রম শুরু হয়েছিল। বর্তমানে এই কর্মসূচির মাধ্যমে ৮ বিলিয়ন ডলারের বেশি ঋণ বিতরণ করা হয়েছে এবং ঋণ পরিশোধের হার প্রায় শতভাগ বলে জানান তিনি। হিস্পানিক ও কৃষ্ণাঙ্গ নারীদের পাশাপাশি পুরুষদেরও এই কাঠামোর আওতায় এনে কার্যক্রমটি সফলভাবে এগিয়ে নেওয়া হচ্ছে। তবে আমানত গ্রহণ বা সঞ্চয় ব্যবস্থাপনার ক্ষেত্রে কিছু আইনি বাধা রয়েছে বলেও উল্লেখ করেন তিনি।
সামাজিক ব্যবসার গুরুত্ব তুলে ধরে ড. ইউনূস বলেন, অর্থ উপার্জন মানুষকে সুখ দিতে পারে। তবে অন্য মানুষের জীবনে ইতিবাচক পরিবর্তন আনতে পারাটা পরম আনন্দের। তাঁর মতে, সামাজিক ব্যবসা কেবল মুনাফা অর্জনের ওপর নির্ভর না করে মানুষের বিভিন্ন সমস্যা সমাধানের কার্যকর মাধ্যম হিসেবে কাজ করতে পারে।
বাংলাদেশে সামাজিক ব্যবসার আওতায় পরিচালিত বিভিন্ন কার্যক্রমের কথাও তুলে ধরেন তিনি। জানান, দেশে এই মডেলের অধীনে ১৫৩টি স্বাস্থ্যকেন্দ্র পরিচালিত হচ্ছে। গ্রামীণ ফোনের সুবিধা ব্যবহার করে প্রত্যন্ত অঞ্চলের মানুষ সরাসরি চিকিৎসকের সঙ্গে কথা বলে চিকিৎসাসেবা নেওয়ার সুযোগ পাচ্ছেন।
এ ছাড়া চক্ষু হাসপাতালের একটি স্বয়ংসম্পূর্ণ নেটওয়ার্ক গড়ে তোলার কথাও উল্লেখ করেন ড. ইউনূস। তাঁর বক্তব্য অনুযায়ী, এই নেটওয়ার্ক নিজেদের অর্জিত উদ্বৃত্ত আয় ব্যবহার করেই নতুন নতুন হাসপাতাল নির্মাণ করতে সক্ষম হচ্ছে।
তরুণদের উদ্দেশে বক্তব্য দিতে গিয়ে অধ্যাপক ইউনূস প্রচলিত শিক্ষা ব্যবস্থার সমালোচনা করে বলেন, এই ব্যবস্থা মূলত মানুষকে চাকরিপ্রত্যাশী হিসেবে গড়ে তোলে। অথচ মানুষ জন্মগতভাবেই উদ্যোক্তা বলে তিনি উল্লেখ করেন।
এই ধারণাকে বাস্তবে রূপ দেওয়ার লক্ষ্যে আগামী ডিসেম্বরে ‘গ্রামীণ ইউনিভার্সিটি’ কার্যক্রম শুরু করতে যাচ্ছে বলেও জানান তিনি। ‘তিন শূন্যের পৃথিবী’ গড়ার লক্ষ্যকে সামনে রেখে প্রতিষ্ঠিত এই বিশ্ববিদ্যালয় তরুণদের শুধু সনদ অর্জনের পেছনে না ছুটে সরাসরি উদ্যোক্তা হিসেবে গড়ে ওঠার সুযোগ তৈরি করবে বলে জানান তিনি।
সবশেষে দারিদ্র্য, বেকারত্ব ও নেট কার্বন নিঃসরণমুক্ত পৃথিবী গড়ে তোলার লক্ষ্যে সবাইকে একসঙ্গে কাজ করার আহ্বান জানান ড. মুহাম্মদ ইউনূস।
/এসএন