• ঢাকা
  • মঙ্গলবার, ০৪ আগস্ট ২০২৬, ১১:৩১ পিএম


সংবিধান থেকে বাদ যেতে পারে শেখ মুজিবুর রহমানের ‘জাতির পিতা’ স্বীকৃতি

দি পালস বিডি অনলাইন ডেস্ক
আপডেট টাইম: ৪ আগস্ট ২০২৬ ৯:২৮ পিএম

বাংলাদেশের সংবিধানে একাধিক গুরুত্বপূর্ণ পরিবর্তনের প্রস্তাব নিয়ে আলোচনা শুরু হয়েছে। এর মধ্যে প্রথমবারের মতো বিএনপির প্রতিষ্ঠাতা ও সাবেক রাষ্ট্রপতি জিয়াউর রহমানের মহান মুক্তিযুদ্ধে অবদানের বিষয়টি সংবিধানে অন্তর্ভুক্ত করার উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে। একই সঙ্গে চট্টগ্রামের কালুরঘাট বেতার কেন্দ্র থেকে তৎকালীন মেজর জিয়ার দেওয়া স্বাধীনতার ঘোষণাও সংবিধানে স্থান পেতে পারে।

অন্যদিকে পঞ্চদশ সংশোধনীর মাধ্যমে যুক্ত হওয়া শেখ মুজিবুর রহমানকে ‘জাতির পিতা’ হিসেবে স্বীকৃতি, তার ৭ মার্চের ভাষণ, ২৬ মার্চের স্বাধীনতার ঘোষণা এবং সরকারি-বেসরকারি বিভিন্ন প্রতিষ্ঠানে তার প্রতিকৃতি সংরক্ষণ ও প্রদর্শনের বাধ্যবাধকতা বাদ দেওয়ার প্রস্তাব আলোচনায় এসেছে।

এ ছাড়া সংবিধানে পুনর্বহাল হতে পারে নির্দলীয় তত্ত্বাবধায়ক সরকারব্যবস্থা ও গণভোটের বিধান। পাশাপাশি ২০২৪ সালের ছাত্র-জনতার অভ্যুত্থান এবং জুলাই যোদ্ধাদের অবদানকে সাংবিধানিক স্বীকৃতি দেওয়ার বিষয়টিও আলোচনায় রয়েছে। সংশ্লিষ্ট একাধিক সূত্রের বরাত দিয়ে এসব তথ্য জানা গেছে। সংবিধান সংশোধন সম্পর্কিত বিশেষ কমিটির প্রথম বৈঠককে কেন্দ্র করেই এসব প্রস্তাব সামনে এসেছে।

সূত্র জানায়, নৈতিক অপরাধে অভিযুক্ত সংসদ সদস্যদের সদস্যপদ বাতিলের বিধানসহ আরও কয়েকটি নতুন বিষয় সংবিধানে যুক্ত করার আলোচনা চলছে। বিশেষ করে জুলাই সনদের আলোকে দ্বিকক্ষবিশিষ্ট সংসদ, একজন ব্যক্তি সর্বোচ্চ দুই মেয়াদ প্রধানমন্ত্রী থাকতে পারবেন—এমন বিধান, রাষ্ট্রপতির ক্ষমতা বৃদ্ধি, একাধিক ডেপুটি স্পিকারের পদ সৃষ্টি এবং নারী সদস্যদের জন্য আরও বেশি আসন সংরক্ষণের মতো প্রস্তাবও বিবেচনায় রয়েছে।

মঙ্গলবার দুপুর ১২টায় জাতীয় সংসদ ভবনের ক্যাবিনেট কক্ষে বিশেষ কমিটির প্রথম বৈঠক অনুষ্ঠিত হয়। এতে সভাপতিত্ব করেন কমিটির সভাপতি, বিএনপির স্থায়ী কমিটির সদস্য ও স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী সালাহউদ্দিন আহমদ। বৈঠকে পরিচিতি পর্বের পাশাপাশি সংবিধানের কোন কোন স্থানে সংশোধনী আনা হবে, তা নিয়েও আলোচনা হয়।

বিশেষ করে পঞ্চদশ সংশোধনী সংক্রান্ত উচ্চ আদালতের রায় এবং জুলাই সনদকে সামনে রেখে কমিটির সদস্যরা বিভিন্ন প্রস্তাব উপস্থাপন করেন। আদালতের রায় অনুসারে সংবিধানের প্রথম ভাগের ৪(ক), ৭(১)(ক), ৭(১)(খ), ৭(২), ৭(৩), ৭(খ) এবং ৪৪(২) অনুচ্ছেদ বাতিলের বিষয়টি আলোচনায় রয়েছে।

এ ছাড়া সংবিধানের শেষে সংযোজিত তিনটি তফসিলের মধ্যে শেখ মুজিবুর রহমানের ৭ মার্চের ভাষণসংবলিত পঞ্চম তফসিল এবং ২৬ মার্চের স্বাধীনতার ঘোষণাসংবলিত ষষ্ঠ তফসিল বাদ দেওয়ার প্রস্তাবও রয়েছে। তবে ১০ এপ্রিল ১৯৭১ সালে মুজিবনগর সরকার কর্তৃক স্বাধীনতার ঘোষণাসংবলিত সপ্তম তফসিলের বিষয়ে কোনো সিদ্ধান্তের কথা উল্লেখ করা হয়নি।

রাষ্ট্র পরিচালনার মূলনীতি সম্পর্কিত সংবিধানের দ্বিতীয় ভাগের ৮(১) অনুচ্ছেদেও পরিবর্তনের আলোচনা চলছে। বর্তমানে সেখানে জাতীয়তাবাদ, সমাজতন্ত্র, গণতন্ত্র ও ধর্মনিরপেক্ষতার কথা রয়েছে। একই সঙ্গে ৯ অনুচ্ছেদে থাকা ‘বাঙালি জাতীয়তাবাদ’-এর পরিবর্তে ‘বাংলাদেশি’ শব্দ যুক্ত করার বিষয়টিও বিবেচনায় রয়েছে।

বর্তমান সংবিধানের ৪(ক) অনুচ্ছেদে রাষ্ট্রপতি, প্রধানমন্ত্রী, স্পিকার, প্রধান বিচারপতিসহ সরকারি ও আধা-সরকারি প্রতিষ্ঠান, শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান এবং বিদেশে বাংলাদেশের মিশনগুলোতে ‘জাতির পিতা বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান’-এর প্রতিকৃতি সংরক্ষণ ও প্রদর্শনের বাধ্যবাধকতা রয়েছে। পঞ্চদশ সংশোধনীর মাধ্যমে যুক্ত হওয়া এই বিধানটি বাতিলের প্রস্তাব করা হয়েছে। তবে রাষ্ট্রপতি ও প্রধানমন্ত্রীর ছবি সংরক্ষণ ও প্রদর্শনের বিধান আগের মতো বহাল থাকবে।

এ ছাড়া সংবিধানের ৭(ক) অনুচ্ছেদে সংবিধান বাতিল, স্থগিত বা অসাংবিধানিকভাবে পরিবর্তনের উদ্যোগকে রাষ্ট্রদ্রোহিতা হিসেবে গণ্য করার বিধান রয়েছে। একই অনুচ্ছেদের সহযোগিতা, সমর্থন ও সর্বোচ্চ শাস্তির বিধানও আলোচনায় এসেছে।

সংবিধানের ৭(খ) অনুচ্ছেদে সংবিধানের মৌলিক কাঠামো সংশোধন-অযোগ্য বলে যে বিধান রয়েছে, সেটিও পঞ্চদশ সংশোধনীর মাধ্যমে যুক্ত হয়েছিল। উচ্চ আদালত এই অনুচ্ছেদ এবং ৪৪(২) অনুচ্ছেদ বাতিল ঘোষণা করেন। আদালতের পর্যবেক্ষণে বলা হয়, তত্ত্বাবধায়ক সরকারব্যবস্থা বাতিল করে নির্বাচনব্যবস্থাকে দলীয়করণের মাধ্যমে সংবিধানের মৌলিক কাঠামো—গণতন্ত্র ও জনগণের সার্বভৌমত্ব—ক্ষুণ্ন করা হয়েছে। এর ফলে ২০১৪, ২০১৮ ও ২০২৪ সালের প্রশ্নবিদ্ধ নির্বাচনের মাধ্যমে নাগরিকদের ভোটাধিকার হরণ করা হয়, যা শেষ পর্যন্ত জুলাই-আগস্টের ছাত্র-জনতার অভ্যুত্থানের জন্ম দেয়।

রায়ে আরও বলা হয়, সংবিধানের ১৪২ অনুচ্ছেদে থাকা গণভোটের বিধান পঞ্চদশ সংশোধনীর মাধ্যমে বাতিল করা হয়েছিল। আদালত সেই সংশোধনী বাতিল করে গণভোটের বিধান পুনর্বহালের নির্দেশ দেন।

আদালত ৭(ক) অনুচ্ছেদকে অস্পষ্ট এবং ভিন্নমত দমনের হাতিয়ার হিসেবে উল্লেখ করে বলেন, এটি পরবর্তী সংসদের সংবিধান সংশোধনের ক্ষমতা সীমিত করেছে এবং সুপ্রিম কোর্টের বিচারিক পর্যালোচনার ক্ষমতাও খর্ব করেছে। তবে আদালত পুরো পঞ্চদশ সংশোধনী বাতিল করেননি। বরং বাকি বিধানগুলো নিয়ে ভবিষ্যতে জনগণের মতামতের ভিত্তিতে জাতীয় সংসদ প্রয়োজনীয় সংশোধন করতে পারবে বলে পর্যবেক্ষণে উল্লেখ করেন।

জানা গেছে, আদালতের রায়ের প্রতি সম্মান জানিয়ে সংবিধান সংশোধন কমিটি ৭(১)(ক), ৭(১)(খ), ৭(২), ৭(৩), ৭(খ) এবং ৪৪(২) অনুচ্ছেদ বাদ দেওয়ার পক্ষে মত দেবে। একই সঙ্গে পঞ্চদশ সংশোধনীর মাধ্যমে যুক্ত শেখ মুজিবুর রহমানকে ‘জাতির পিতা’ হিসেবে স্বীকৃতি, তত্ত্বাবধায়ক সরকারব্যবস্থা ও গণভোট বাতিলের বিধান এবং মুক্তিযুদ্ধের মানবতাবিরোধী অপরাধে দণ্ডপ্রাপ্তদের নির্বাচনে অংশগ্রহণ নিষিদ্ধ রাখার বিষয়গুলো সংবিধানে না রাখার পক্ষে যুক্তি তুলে ধরবেন কমিটির সদস্যরা।

উল্লেখ্য, ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদের দ্বিতীয় অধিবেশন শেষ হওয়ার দুই দিন আগে, গত ১৩ জুলাই সালাহউদ্দিন আহমদকে সভাপতি করে সংবিধান সংশোধনের জন্য ১২ সদস্যের বিশেষ কমিটি গঠন করা হয়। চিফ হুইপ নূরুল ইসলাম মনি সংসদে কমিটির নাম প্রস্তাব করেন এবং তা কণ্ঠভোটে গৃহীত হয়। ১৭ সদস্যের কমিটি গঠনের পরিকল্পনা থাকলেও বিরোধী দল নাম না দেওয়ায় আপাতত ১২ সদস্যের কমিটি গঠন করা হয়েছে। বিরোধী দলের জন্য পাঁচটি পদ শূন্য রাখা হলেও এখন পর্যন্ত জামায়াতে ইসলামী, জাতীয় নাগরিক পার্টি (এনসিপি) এবং বাংলাদেশ খেলাফত মজলিস তাদের প্রতিনিধি মনোনয়ন দেয়নি।

/এসএন