পরিকল্পনার তুলনায় অনেক দ্রুত বিস্তৃত হয়েছে রাজধানী ঢাকা। জলাভূমি ভরাট, নিচু জমিতে স্থাপনা নির্মাণ এবং বিল্ডিং কোড না মেনে গড়ে ওঠা অসংখ্য বহুতল ভবন বড় ধরনের ভূমিকম্পে ভয়াবহ বিপর্যয়ের কারণ হতে পারে বলে সতর্ক করেছেন বিশেষজ্ঞরা।
ছয় পর্বের ধারাবাহিক প্রতিবেদনের পঞ্চম পর্বে উঠে এসেছে, নির্মাণত্রুটি, ভবন নির্মাণ বিধিমালা যথাযথভাবে অনুসরণ না করা এবং পুরোনো ভবন সংস্কারে অবহেলার কারণে ঢাকার হাজার হাজার ভবন এখন ভূমিকম্পের উচ্চ ঝুঁকিতে রয়েছে।বিশেষজ্ঞদের মতে, বাংলাদেশে বহু পুরোনো ভবন ভূমিকম্প সহনশীল নকশায় নির্মিত হয়নি। ভবন নির্মাণের সময় বাংলাদেশ ন্যাশনাল বিল্ডিং কোড (বিএনবিসি) পুরোপুরি অনুসরণ করা হয়নি। দুর্বল রডের ব্যবহার, বিম ও কলামের দুর্বল সংযোগ এবং নিম্নমানের নির্মাণসামগ্রীর কারণে এসব ভবনের কাঠামো দুর্বল হয়ে পড়েছে। ফলে ভূমিকম্পের সময় ভবনের দুর্বল অংশগুলো প্রথমে ভেঙে পড়ে এবং পুরো ভবন আংশিক বা সম্পূর্ণ ধসে যেতে পারে।
বিশ্বব্যাংকের অর্থায়নে পরিচালিত আরবান রেজিলিয়েন্স প্রকল্পের আওতায় রাজধানী উন্নয়ন কর্তৃপক্ষের (রাজউক) এক গবেষণায় বলা হয়েছে, টাঙ্গাইলের মধুপুর ফল্টলাইনে ৬ দশমিক ৯ মাত্রার ভূমিকম্প হলে ঢাকায় প্রায় ৮ লাখ ৬৫ হাজার ভবন ক্ষতিগ্রস্ত হতে পারে। দিনের বেলায় এমন ভূমিকম্প আঘাত হানলে প্রায় ২ লাখ ১০ হাজার মানুষের মৃত্যু এবং আরও ২ লাখ ২৯ হাজার মানুষ আহত হওয়ার আশঙ্কা রয়েছে।দুর্যোগ ব্যবস্থাপনা মন্ত্রণালয়ের বাস্তবায়িত সমন্বিত দুর্যোগ ব্যবস্থাপনা কর্মসূচির (সিডিএমপি) ২০০৪ থেকে ২০১৪ সালের তথ্য অনুযায়ী, বাংলাদেশ পাঁচটি বড় ফল্টলাইনের কাছাকাছি অবস্থিত।
এগুলো হলো—মধুপুর ফল্ট, ডাউকি ফল্ট এবং প্লেট বাউন্ডারি ফল্ট ১, ২ ও ৩। এসব ফল্টলাইনে ৭ থেকে ৮ দশমিক ৫ মাত্রার ভূমিকম্প হওয়ার সম্ভাবনা রয়েছে।এত বড় ঝুঁকি থাকা সত্ত্বেও ঢাকার ভূমিকম্প প্রস্তুতি এখনো অপর্যাপ্ত বলে মনে করেন বিশেষজ্ঞরা। তাদের মতে, অপরিকল্পিত নগরায়ণ, ভবন নির্মাণ বিধিমালার দুর্বল প্রয়োগ এবং জলাভূমি ভরাট করে ভবন নির্মাণের প্রবণতাই পরিস্থিতিকে আরও ঝুঁকিপূর্ণ করে তুলেছে।বাংলাদেশ আর্থকোয়েক সোসাইটির সহসভাপতি অধ্যাপক মুনাজ আহমেদ নূর বলেন, ভবন নির্মাণ বিধিমালা কঠোরভাবে অনুসরণ করা ছাড়া বিকল্প নেই। অতীতে এর বাস্তবায়ন দুর্বল ছিল।
তিনি বলেন, ভবনের নকশা অনুমোদনের আগে রাজউকের আরও কঠোর যাচাই-বাছাই করা উচিত। পাশাপাশি মালয়েশিয়া, থাইল্যান্ড ও ইন্দোনেশিয়ার মতো দেশের আদলে স্বাধীন তৃতীয় পক্ষের মাধ্যমে নকশা যাচাই ব্যবস্থা চালুর পরামর্শ দেন তিনি।রাজউকের তথ্য অনুযায়ী, তাদের আওতাধীন ১ হাজার ৫২৮ বর্গকিলোমিটার এলাকায় প্রায় ২১ লাখ ভবন রয়েছে, যার প্রায় ৮৪ শতাংশই একতলা।বাড়তি ওজনেও বাড়ছে ঝুঁকিআর্কিটেকচারাল কনসালট্যান্সি এলএলসির ব্যবস্থাপনা পরিচালক আহমেদ মুক্তা বলেন, ভবনের ছাদে নকশার বাইরে ভারী পানির ট্যাংক, জেনারেটর ও অন্যান্য যান্ত্রিক সরঞ্জাম স্থাপন অতিরিক্ত ওজন সৃষ্টি করে।
এতে ভূমিকম্পের সময় ভবনের দুলুনি বেড়ে যায় এবং আগে থেকেই দুর্বল ভবনগুলো আরও বেশি ঝুঁকিতে পড়ে।তার মতে, ভূমিকম্পে শুধু ভবন ধসেই নয়, ভবনের নন-স্ট্রাকচারাল অংশ ভেঙে পড়েও বহু মানুষ হতাহত হন। পার্টিশন ওয়াল, ফলস সিলিং, কাঁচের আবরণ ও বাইরের সাজসজ্জা দ্রুত ভেঙে পড়ে, যা প্রাণহানির বড় কারণ হতে পারে।তিনি আরও বলেন, দুর্বল মর্টার দিয়ে নির্মিত ইটের দেয়াল সহজেই ধসে পড়ে। এছাড়া যেসব ভবনের নিচতলা খোলা থাকে, সেগুলো ভূমিকম্পে তুলনামূলক বেশি ঝুঁকিপূর্ণ। দুর্বল ভিত্তির কারণে ভবন হেলে পড়া বা দেবে যাওয়ার ঘটনাও ঘটতে পারে, যা বাংলাদেশে অস্বাভাবিক নয়।
পুরোনো ভবন রেট্রোফিটিংয়ের তাগিদবাংলাদেশ প্রকৌশল বিশ্ববিদ্যালয়ের (বুয়েট) পুরকৌশল বিভাগের অধ্যাপক মেহেদী আহমেদ আনসারী বলেন, “ভূমিকম্প মানুষ মারে না, দুর্বল ভবনই মানুষকে মারে।”তিনি উদাহরণ হিসেবে ২০২৩ সালের তুরস্কের ৭ দশমিক ৮ মাত্রার ভূমিকম্পের কথা উল্লেখ করেন, যেখানে ভবন ধসের কারণে প্রায় ৫৩ হাজার ৫০০ মানুষের মৃত্যু হয়েছিল। অন্যদিকে ২০১০ সালে হাইতিতে ৭ মাত্রার ভূমিকম্পে প্রায় ২ লাখ ৩০ হাজার মানুষ মারা গেলেও একই বছর চিলিতে ৮ দশমিক ৮ মাত্রার ভূমিকম্পে মাত্র ২৮০ জনের মৃত্যু হয়।
কারণ, চিলির ভবনগুলো ছিল অধিক শক্তিশালী ও ভূমিকম্প সহনশীল।ভবিষ্যতে ক্ষয়ক্ষতি কমাতে অধ্যাপক আনসারী ভবনগুলো পরীক্ষা করে লাল (অত্যন্ত ঝুঁকিপূর্ণ), হলুদ (মাঝারি ঝুঁকিপূর্ণ) এবং সবুজ (তুলনামূলক নিরাপদ) জোনে ভাগ করার প্রস্তাব দেন। তার মতে, এভাবে শ্রেণিবিন্যাস করা হলে কোন ভবন আগে সংস্কার বা রেট্রোফিটিং করতে হবে, তা নির্ধারণ করা সহজ হবে।তিনি জানান, গত এক দশকে শ্রম মন্ত্রণালয়ের অধীনে প্রায় ৫০০ পোশাক কারখানায় একই পদ্ধতিতে সফলভাবে রেট্রোফিটিং করা হয়েছে।
/বিএসএস