কক্সবাজারের ডপলার আবহাওয়া রাডার গত তিন বছর ধরে অচল থাকায় বঙ্গোপসাগর উপকূলজুড়ে দুর্যোগের আগাম সতর্কতা ব্যবস্থায় বড় ধরনের ঘাটতি তৈরি হয়েছে। ফলে গভীর সমুদ্রে মাছ ধরতে যাওয়া জেলে, সমুদ্রসৈকতে থাকা পর্যটক এবং বিমান চলাচলের নিরাপত্তা নিয়ে উদ্বেগ বাড়ছে।
কক্সবাজার দেশের অন্যতম দুর্যোগপ্রবণ উপকূলীয় জেলা। প্রতিদিন শত শত জেলে গভীর সমুদ্রে মাছ ধরতে যান, হাজারো পর্যটক সমুদ্রসৈকতে ভিড় করেন এবং কক্সবাজার বিমানবন্দরে নিয়মিত বিমান ওঠানামা করে। অথচ এই পুরো উপকূলীয় অঞ্চলের আবহাওয়া পর্যবেক্ষণের সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ প্রযুক্তি—ডপলার আবহাওয়া রাডার—যন্ত্রাংশের মেয়াদ শেষ হওয়ার পর থেকে অচল হয়ে রয়েছে।
কক্সবাজার আবহাওয়া অফিসের সহকারী আবহাওয়াবিদ মো. আব্দুল হান্নান জানান, ঘূর্ণিঝড়, বজ্রঝড়, ভারি বৃষ্টিপাত, দমকা হাওয়া, মেঘের সৃষ্টি ও গতিপথ নির্ধারণে এই রাডারের ভূমিকা অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। রাডার থেকে সংগৃহীত তথ্য ঢাকায় পাঠানো হতো, যেখানে বিশেষজ্ঞরা তা বিশ্লেষণ করে পূর্বাভাস প্রস্তুত করতেন। তবে রাডার অচল থাকায় এখন স্থানীয় পর্যায়ের গুরুত্বপূর্ণ তথ্য সরাসরি সংগ্রহ করা যাচ্ছে না।
তিনি আরও জানান, বিমান চলাচলের নিরাপত্তার জন্য প্রতি ঘণ্টায় পাইলটদের তাপমাত্রা, শিশিরাঙ্ক, আর্দ্রতা, বায়ুচাপ, দৃশ্যমানতা, বাতাসের গতি ও দিকসহ প্রয়োজনীয় তথ্য সরবরাহ করা হয়। জরুরি পরিস্থিতিতে, যেমন বজ্রঝড় বা ঘন মেঘের সময়, প্রতি আধা ঘণ্টা পরপর তথ্য হালনাগাদ করা হয়।
আবহাওয়া অধিদপ্তরের তথ্য অনুযায়ী, স্যাটেলাইটসহ অন্যান্য প্রযুক্তির মাধ্যমে পূর্বাভাস পাওয়া গেলেও কক্সবাজারের স্থানীয় আবহাওয়া পর্যবেক্ষণের সক্ষমতা উল্লেখযোগ্যভাবে কমে গেছে। বিশেষ করে গভীর সমুদ্রে মোবাইল নেটওয়ার্ক না থাকায় জেলেদের জন্য রেডিও এবং নির্ভুল আবহাওয়ার পূর্বাভাসই প্রধান ভরসা।
এফবি মায়ের দোয়া ট্রলারের জেলে বাদশা মিয়া বলেন, গভীর সমুদ্রে গেলে মোবাইল নেটওয়ার্ক থাকে না। তখন আবহাওয়া খারাপ হলে পরিবারের সদস্যরাও যোগাযোগ করতে পারেন না, যা তাদের উদ্বেগ আরও বাড়িয়ে দেয়।
এফবি গালিব ট্রলারের মাঝি শামশুল আলম জানান, কক্সবাজার উপকূল থেকে ২৫ থেকে ৩০ কিলোমিটার দূরে গেলেই মোবাইল নেটওয়ার্ক পাওয়া যায় না। অথচ অনেক সময় ২০০ থেকে ২২৪ কিলোমিটার দূরে গিয়ে মাছ ধরতে হয়। ফলে ঝড় বা ঘূর্ণিঝড়ের আগাম তথ্য পাওয়া কঠিন হয়ে পড়ে।
কক্সবাজার মৎস্য অবতরণ কেন্দ্র ব্যবসায়ী ঐক্য সমবায় সমিতির প্রতিষ্ঠাতা সভাপতি জয়নাল আবেদীন বলেন, রাডার অকার্যকর থাকায় সময়মতো আবহাওয়ার তথ্য পাওয়া যাচ্ছে না। এতে হাজারো জেলে প্রাণ ও সম্পদের ঝুঁকিতে রয়েছেন। একটি মাছ ধরার ট্রলারে কোটি টাকার বিনিয়োগ থাকে, তাই দুর্ঘটনা হলে বড় ধরনের আর্থিক ক্ষতির পাশাপাশি প্রাণহানিও ঘটে।
সি সেফ লাইফ গার্ড সংস্থার প্রকল্প কর্মকর্তা মো. ইমতিয়াজ আহমেদ বলেন, দীর্ঘদিন ধরে রাডার বন্ধ থাকায় নির্ভুল আবহাওয়ার তথ্য পাওয়া যাচ্ছে না। কক্সবাজারের মতো ঘূর্ণিঝড়প্রবণ এলাকায় আধুনিক রাডার সচল থাকলে দুর্যোগ মোকাবিলায় আরও কার্যকর প্রস্তুতি নেওয়া সম্ভব হতো।
২০২৩ সালে রাডার সচল করতে জাপানের উন্নয়ন সংস্থা জাইকার কাছে কারিগরি সহায়তা চাওয়া হলেও সাড়া না পাওয়ায় সরকার নিজস্ব অর্থায়নে রাডার আধুনিকায়নের সিদ্ধান্ত নেয়। ২০২৪ সালে জাপানি বিশেষজ্ঞ দল পরিদর্শন করে বর্তমান ভবন ব্যবহারযোগ্য থাকলেও নতুন যন্ত্রপাতি স্থাপনের সুপারিশ করে। তবে এখনো প্রকল্পের কাজ শুরু হয়নি।
মো. আব্দুল হান্নান জানান, কক্সবাজারের রাডারটি ২০০৭ সাল থেকে ২০২৩ সালের আগস্ট পর্যন্ত চালু ছিল। পরে যন্ত্রাংশের মেয়াদ শেষ হওয়ায় এটি বন্ধ হয়ে যায়। আবহাওয়া অধিদপ্তরের প্রকৌশলীরা একাধিকবার চেষ্টা করেও এটি সচল করতে পারেননি। কক্সবাজারের পাশাপাশি পটুয়াখালীর খেপুপাড়া ও মৌলভীবাজারের রাডারও আধুনিকায়নের পরিকল্পনা রয়েছে। এ-সংক্রান্ত প্রকল্প বর্তমানে মন্ত্রণালয়ে অনুমোদনের অপেক্ষায় রয়েছে।
তিনি বলেন, কক্সবাজার একটি ‘মাল্টি হ্যাজার্ড’ জেলা। এখানে ঘূর্ণিঝড়, জলোচ্ছ্বাস, আকস্মিক বন্যা, জলাবদ্ধতা, ভূমিধস এবং ভারি বৃষ্টিপাতের ঝুঁকি রয়েছে। ২০২৪ সালে একদিনে ৫৫০ মিলিমিটার এবং সাত দিনে ৮২৩ মিলিমিটার বৃষ্টিপাতের রেকর্ড হয়েছে। এমন পরিস্থিতিতে আধুনিক আবহাওয়া রাডারের বিকল্প নেই।
কক্সবাজারের জেলা প্রশাসক (ডিসি) মো. আ. মান্নান বলেন, বিষয়টি প্রতিরক্ষা মন্ত্রণালয়ের আওতাধীন। এ বিষয়ে মন্ত্রণালয় অবগত রয়েছে এবং জেলা প্রশাসনের পক্ষ থেকেও প্রয়োজনীয় চিঠি পাঠানো হয়েছে।
উল্লেখ্য, কক্সবাজার শহরের সার্কিট হাউস-সংলগ্ন পাহাড়ের চূড়ায় সমতল থেকে প্রায় ১৬০ ফুট উঁচুতে অবস্থিত রাডার স্টেশনটি ১৯৬৯ সালে প্রতিষ্ঠিত হয়। পরে ২০০৭ সালে জাপানের সহায়তায় এটিকে আধুনিক ডপলার আবহাওয়া রাডারে উন্নীত করা হয়।
/এএসএফ