বাংলাদেশে জন্ম। মাত্র ১২ বছর বয়সে পরিবারের সঙ্গে পাড়ি জমান যুক্তরাষ্ট্রে। এরপর নিউইয়র্কের পাবলিক স্কুলে পড়াশোনা, আইন বিষয়ে উচ্চশিক্ষা, নিজস্ব আইনজীবী প্রতিষ্ঠান পরিচালনা এবং শেষ পর্যন্ত বিচারকের আসনে বসা—বাংলাদেশি বংশোদ্ভূত সোমা সাঈদের পথচলাটা যেন এক দীর্ঘ সংগ্রাম ও সাফল্যের গল্প।সোমা সাঈদ বর্তমানে নিউইয়র্ক অঙ্গরাজ্যের সুপ্রিম কোর্টের বিচারপতি হিসেবে দায়িত্ব পালন করছেন। ২০২৫ সালের নির্বাচনে তিনি নিউইয়র্ক স্টেট সুপ্রিম কোর্টের ১১তম জুডিশিয়াল ডিস্ট্রিক্টের বিচারপতি নির্বাচিত হন। নিউইয়র্কের সরকারি আদালতের তথ্যেও ‘Part 31’-এর বিচারপতি হিসেবে তার নাম রয়েছে।তবে তার বিচারক হওয়ার যাত্রা শুরু হয়েছিল আরও আগে। বাংলাদেশে জন্ম নেওয়া সোমা সাঈদ ১২ বছর বয়সে পরিবারের সঙ্গে নিউইয়র্কে চলে যান। আলবানি ল স্কুলের তথ্য অনুযায়ী, ছোটবেলা থেকেই তার স্বপ্ন ছিল আইনজীবী হওয়া। নিউইয়র্কের পাবলিক স্কুলে পড়াশোনা শেষ করে তিনি সিটি কলেজ অব নিউইয়র্ক থেকে আরবান লিগ্যাল স্টাডিজ/প্রি-ল বিষয়ে স্নাতক ডিগ্রি এবং পরে আলবানি ল স্কুল থেকে জুরিস ডক্টর ডিগ্রি অর্জন করেন।আইনজীবী হিসেবে ক্যারিয়ারের শুরুতে তিনি নিজের প্রতিষ্ঠান গড়ে তোলেন। তার আইন পেশার কাজের মধ্যে ছিল রিয়েল এস্টেট, পারিবারিক আইন, অভিবাসন, অলাভজনক প্রতিষ্ঠান এবং দেওয়ানি মামলা। একই সঙ্গে অভিবাসী, ক্ষুদ্র ব্যবসায়ী ও শ্রমজীবী মানুষের আইনি প্রয়োজন নিয়েও তিনি কাজ করেছেন।সোমা সাঈদের পেশাগত জীবনের আরেকটি গুরুত্বপূর্ণ দিক ছিল কমিউনিটি ও পেশাজীবী সংগঠনে সক্রিয় ভূমিকা। তিনি কুইন্স কাউন্টি উইমেনস বার অ্যাসোসিয়েশনের প্রেসিডেন্ট ছিলেন এবং নিউইয়র্ক স্টেট বার অ্যাসোসিয়েশনের আইনজীবী রেফারেল ও ইনফরমেশন সার্ভিসের চেয়ারপারসন হিসেবেও দায়িত্ব পালন করেন।২০২১ সালে তার জীবনে আসে বড় পরিবর্তন। কুইন্স কাউন্টি সিভিল কোর্টের বিচারক পদে নির্বাচনে জয়ী হন তিনি। এ বিজয়ের মধ্য দিয়ে নিউইয়র্ক স্টেটের বিচারক হিসেবে নির্বাচিত প্রথম বাংলাদেশি-আমেরিকান হিসেবে ইতিহাস তৈরি করেন সোমা সাঈদ। এশিয়ান আমেরিকান বার অ্যাসোসিয়েশন অব নিউইয়র্কও তাকে নিউইয়র্কের বিচারাঙ্গনে নির্বাচিত প্রথম বাংলাদেশি-আমেরিকান বিচারক হিসেবে উল্লেখ করেছে।বিচারক হিসেবে তার দায়িত্বের ক্ষেত্রও ধাপে ধাপে বিস্তৃত হয়েছে। ২০২২ থেকে ২০২৩ সাল পর্যন্ত তিনি ম্যানহাটনের নিউইয়র্ক কাউন্টি ক্রিমিনাল কোর্টে দায়িত্ব পালন করেন। সেখানে জামিন শুনানি, গুরুতর অপরাধ ও অন্যান্য ফৌজদারি মামলার বিভিন্ন অংশে বিচারকার্য পরিচালনা করেন। ২০২৪ সাল থেকে তিনি কুইন্স কাউন্টি সিভিল কোর্টে দায়িত্ব পালন করেন।এরপর আসে আরও বড় দায়িত্ব। ২০২৫ সালের ৪ নভেম্বরের নির্বাচনে সোমা সাঈদ নিউইয়র্ক স্টেট সুপ্রিম কোর্টের বিচারপতি নির্বাচিত হন। এর মাধ্যমে স্থানীয় সিভিল কোর্টের বিচারকের দায়িত্ব থেকে তিনি অঙ্গরাজ্যের সুপ্রিম কোর্টের বিচারপতির পর্যায়ে উঠে আসেন। ২০২৬ সালের তথ্য অনুযায়ী তিনি নিউইয়র্ক স্টেট ইউনিফায়েড কোর্ট সিস্টেমে ‘Justice’ হিসেবে দায়িত্ব পালন করছেন।সোমা সাঈদের সাফল্যের গল্প শুধু একজন আইনজীবী বা বিচারকের ক্যারিয়ার অগ্রগতির গল্প নয়। বাংলাদেশ থেকে যুক্তরাষ্ট্রে যাওয়া একটি পরিবারের সন্তান কীভাবে শিক্ষা, পেশাগত দক্ষতা, সামাজিক সম্পৃক্ততা ও দীর্ঘদিনের পরিশ্রমের মাধ্যমে নিউইয়র্কের বিচারব্যবস্থার গুরুত্বপূর্ণ পর্যায়ে পৌঁছাতে পারেন—তারও একটি উদাহরণ এটি।আলবানি ল স্কুলের প্রকাশিত তথ্যে জানা যায়, ব্যক্তিগত জীবনেও তার পথ সবসময় সহজ ছিল না। আইন পেশার পাশাপাশি তিনি তার বাবা-মায়ের দেখাশোনার দায়িত্বও পালন করেছেন। নিউইয়র্কের জ্যামাইকা এলাকায় নিজের আইনজীবী প্রতিষ্ঠান প্রতিষ্ঠা করার বিষয়টিকে তিনি পরিবারের জীবন ও উত্তরাধিকারের সঙ্গে যুক্ত একটি গুরুত্বপূর্ণ অধ্যায় হিসেবে দেখেছেন।আজ নিউইয়র্কের আদালতে বিচারকের দায়িত্ব পালন করা সোমা সাঈদের গল্প তাই বাংলাদেশি অভিবাসী পরিবারের নতুন প্রজন্মের জন্যও গুরুত্বপূর্ণ। বাংলাদেশে জন্ম নেওয়া একটি মেয়ের ১২ বছর বয়সে যুক্তরাষ্ট্রে যাত্রা থেকে নিউইয়র্ক স্টেট সুপ্রিম কোর্টের বিচারপতির আসনে পৌঁছানোর এই দীর্ঘ পথ তৈরি হয়েছে শিক্ষা, আইন পেশা, জনসম্পৃক্ততা এবং বছরের পর বছর কাজের মধ্য দিয়ে।
/বিএসএস