গত ১৫ বছর ধরে দেশের ব্যাংকিং খাতকে রাজনৈতিক হাতিয়ার হিসেবে ব্যবহার করা হয়েছে বলে মন্তব্য করেছেন স্বতন্ত্র সংসদ সদস্য রুমিন ফারহানা। তিনি বলেন, এই সময়ে ব্যাংক খাতের ওপর বিভিন্ন রাজনৈতিক প্রভাবের কারণে অর্থনীতির গুরুত্বপূর্ণ সূচকগুলো উদ্বেগজনক অবস্থায় পৌঁছেছে।
সোমবার (১৫ জুন) জাতীয় সংসদে বাজেট আলোচনা এবং দেশের সামগ্রিক অর্থনৈতিক পরিস্থিতি নিয়ে বক্তব্য রাখতে গিয়ে তিনি এসব কথা বলেন।
বক্তব্যে রুমিন ফারহানা দেশের অর্থনীতির বিভিন্ন খাতের বর্তমান চিত্র তুলে ধরেন। তিনি জানান, বাংলাদেশের মোট জিডিপির আকার বর্তমানে ৬৮ লাখ কোটি টাকা হলেও জিডিপি প্রবৃদ্ধির হার মাত্র ৩ দশমিক ৪৯ শতাংশ। একই সময়ে মূল্যস্ফীতির হার দাঁড়িয়েছে ৯ দশমিক ৫ শতাংশে।
ব্যাংকিং খাতের পরিস্থিতি নিয়ে উদ্বেগ প্রকাশ করে তিনি বলেন, মোট বিতরণ করা ঋণের ৩৫ দশমিক ৭৩ শতাংশ বর্তমানে খেলাপি ঋণে পরিণত হয়েছে। এর আর্থিক পরিমাণ প্রায় ৬ লাখ ৪৪ হাজার কোটি টাকা। পাশাপাশি ব্যাংকিং খাতের সামগ্রিক মূলধন পর্যাপ্ততার হার ঋণাত্মক ২ দশমিক ৬৪ শতাংশে নেমে এসেছে বলেও উল্লেখ করেন তিনি।
রুমিন ফারহানা আরও বলেন, একসময় বেসরকারি খাতে ঋণের প্রবৃদ্ধি ২২ শতাংশ ছিল, যা বর্তমানে কমে ৫ শতাংশে নেমে এসেছে। একই সঙ্গে রপ্তানি কমে যাওয়া এবং আমদানি বৃদ্ধি পাওয়ার কারণে দেশের বাণিজ্য ঘাটতি বেড়ে ২২ দশমিক ২১ বিলিয়ন ডলারে পৌঁছেছে।
অর্থপাচারের প্রসঙ্গ টেনে তিনি বলেন, শ্বেতপত্রের তথ্য অনুযায়ী গত ১৫ বছরে বাংলাদেশ থেকে ২৩৪ বিলিয়ন ডলার বিদেশে পাচার হয়েছে। তার হিসাবে বছরে গড়ে ১৪ থেকে ১৬ বিলিয়ন ডলার দেশ থেকে বেরিয়ে গেছে। এছাড়া গ্লোবাল ফাইন্যান্সিয়াল ইন্টিগ্রিটির তথ্যের উদ্ধৃতি দিয়ে তিনি বলেন, আন্ডার ইনভয়েসিং ও ওভার ইনভয়েসিংয়ের মাধ্যমে প্রতিবছর আরও প্রায় ৮ বিলিয়ন ডলার বিদেশে চলে গেছে।
সংসদ সদস্য অভিযোগ করেন, যাদের দৃশ্যমান কোনো ব্যবসা ছিল না, তাদেরও বিপুল অঙ্কের ঋণ দেওয়া হয়েছে। একই সঙ্গে ব্যাংকগুলোকে নির্দিষ্ট কিছু পরিবারের নিয়ন্ত্রণে তুলে দেওয়া হয়েছে বলেও তিনি দাবি করেন। তার মতে, রাজনৈতিক সিদ্ধান্তের মাধ্যমে ডলারের মূল্য নিয়ন্ত্রণে রাখার কারণে ব্যাংকিং খাত থেকে ১৮ থেকে ২০ বিলিয়ন ডলার বিদেশে পাচার হয়েছে।
বাজেট ঘাটতি পূরণে ব্যাংক খাত থেকে ঋণ গ্রহণের ওপর অতিরিক্ত নির্ভরশীলতাকে বড় ঝুঁকি হিসেবে উল্লেখ করেন রুমিন ফারহানা। তিনি বলেন, বিপুল পরিমাণ খেলাপি ঋণের চাপে ব্যাংকগুলো এখন বেসরকারি খাতে নতুন বিনিয়োগে কার্যকর ভূমিকা রাখার সক্ষমতা হারাচ্ছে।
তিনি আরও বলেন, আন্তর্জাতিক মুদ্রা তহবিল (আইএমএফ) পরবর্তী কিস্তির অর্থ ছাড় স্থগিত করায় সরকারকে এখন চীন বা একই ধরনের উৎস থেকে তুলনামূলক উচ্চ সুদে ঋণ নেওয়ার দিকে ঝুঁকতে হচ্ছে। ভবিষ্যতে এসব ঋণ পরিশোধ দেশের জন্য বাড়তি চাপ সৃষ্টি করতে পারে বলেও তিনি আশঙ্কা প্রকাশ করেন।
বক্তব্যের শেষাংশে রুমিন ফারহানা বলেন, শেয়ারবাজার এবং কর ব্যবস্থাপনায় প্রয়োজনীয় সংস্কার ও উন্নয়ন না করা গেলে অর্থনীতির পুরো চাপ ব্যাংক খাতের ওপরই বর্তাবে। আর সেই পরিস্থিতি দেশের অর্থনীতির জন্য বড় ধরনের বিপর্যয়ের কারণ হতে পারে।
/এসএন