সিলেটের জেলা প্রশাসক (ডিসি) ও জেলা ম্যাজিস্ট্রেট মো. সারওয়ার আলমকে আকস্মিকভাবে প্রত্যাহারের ঘটনায় জেলাজুড়ে তীব্র প্রতিক্রিয়া দেখা দিয়েছে। রোববার সরকারের জারি করা প্রজ্ঞাপনে এই বদলিকে ‘জনস্বার্থে’ উল্লেখ করা হলেও সিলেটের সাধারণ মানুষ, সুশীল সমাজ ও সচেতন মহলের একটি বড় অংশের দাবি, হজরত শাহজালাল (রহ.) ও হজরত শাহপরাণ (রহ.) মাজারের দানবাক্স সংস্কার এবং আয়ের অর্থের স্বচ্ছতা নিশ্চিতের উদ্যোগ নেওয়ায় তাকে সরিয়ে দেওয়া হয়েছে।
প্রত্যাহারের আদেশ জারির পর থেকেই সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে এ নিয়ে ব্যাপক আলোচনা শুরু হয়। অনেকেই বিদায়ী ডিসির পক্ষে অবস্থান নিয়ে তার সততা ও সাহসিকতার প্রশংসা করেন। শুধু অনলাইনেই নয়, তার পুনর্বহালের দাবিতে রাজপথেও নেমেছেন সিলেটের বিভিন্ন শ্রেণি-পেশার মানুষ।
রোববার ‘সিলেটের সর্বস্তরের নাগরিক সমাজ’-এর ব্যানারে নগরীতে মানববন্ধন অনুষ্ঠিত হয়। সোমবার সকাল থেকেও জেলা প্রশাসক কার্যালয় ও বন্দরবাজার কোর্ট পয়েন্ট এলাকায় বিক্ষোভ কর্মসূচি পালন করেন আন্দোলনকারীরা। ‘সিলেটের সচেতন নাগরিক সমাজ’, ‘সিলেটের যুবসমাজ’ ও ‘সিলেটের সচেতন তরুণ’-এর ব্যানারে আয়োজিত এসব কর্মসূচিতে বিভিন্ন বয়সী মানুষ ছাড়াও মাদ্রাসার শিক্ষক ও শিক্ষার্থীরা অংশ নেন।
বিক্ষোভে ‘ডিসি সারওয়ারের প্রত্যাহার মানি না, মানব না’ এবং ‘সিলেটবাসীর দরকার, ডিসি সারওয়ার’ স্লোগানে মুখর হয়ে ওঠে এলাকা। বক্তারা অভিযোগ করেন, দুর্নীতি ও অনিয়মের বিরুদ্ধে অবস্থান নেওয়ায় একটি প্রভাবশালী মহলের চাপে তাকে সরিয়ে দেওয়া হয়েছে।
সোমবার সকালে জেলা প্রশাসক কার্যালয়ে প্রবেশের সময় বিক্ষোভকারীদের সঙ্গে করমর্দন করেন মো. সারওয়ার আলম। পরে জনতার স্লোগানের মধ্যেই তিনি কার্যালয়ে প্রবেশ করেন। দুপুরে তিনি নিজ কার্যালয় থেকে বের হয়ে হজরত শাহজালাল (রহ.) মাজারে যান।
জাতীয় ইমাম সমিতি সিলেট জেলা শাখার সভাপতি মোহাম্মদ এহসান উদ্দিন যুগান্তরকে বলেন, জেলা প্রশাসক সারওয়ার আলম একজন অত্যন্ত ভালো মানুষ। মাজারের দানের অর্থ নিয়ে যেখানে কেউ প্রশ্ন তোলার সাহস পায়নি, সেখানে তিনি স্বচ্ছতা আনার উদ্যোগ নিয়েছিলেন। তার মতে, এই অর্থের সঠিক ব্যবস্থাপনা হলে মাজারের উন্নয়নে তা বড় ভূমিকা রাখতে পারত। মাত্র চার দিনে ১৭ লাখ টাকার বেশি জমা হওয়ার বিষয়টি উল্লেখ করে তিনি বলেন, সারা বছরে কত অর্থ জমা হয় তা সহজেই অনুমান করা যায়। তিনি প্রধানমন্ত্রীর কাছে উন্নয়নমূলক উদ্যোগগুলো বাস্তবায়নের স্বার্থে সারওয়ার আলমকে আরও এক বছর সিলেটের জেলা প্রশাসক হিসেবে রাখার দাবি জানান।
সুশাসনের জন্য নাগরিক (সুজন) সিলেটের সভাপতি সৈয়দা শিরিন আক্তার বলেন, সরকার যে কোনো কর্মকর্তাকে বদলি করতে পারে। তবে সিলেটের মানুষের ধারণা, দানের অর্থের স্বচ্ছতা নিশ্চিতের উদ্যোগের কারণেই তাকে সরিয়ে দেওয়া হয়েছে। যদি সেটাই সত্য হয়ে থাকে, তাহলে তা দুর্নীতি ও অস্বচ্ছতাকে উৎসাহিত করবে। তিনি বলেন, স্বচ্ছতার জন্য কাজ করতে গিয়ে কেউ শাস্তি পেলে ভবিষ্যতে আর কেউ এমন উদ্যোগ নিতে উৎসাহিত হবে না।
নিজের প্রত্যাহারের আদেশ পাওয়ার পরদিন সোমবার জোহরের নামাজের পর ওয়াকফ এস্টেটের কর্মকর্তা ও জেলা প্রশাসনের কর্মকর্তাদের নিয়ে শাহজালাল (রহ.) মাজারে যান সারওয়ার আলম। তিনি গত বৃহস্পতিবার জেলা প্রশাসনের পক্ষ থেকে স্থাপন করা দানবাক্সগুলো খুলে অর্থ গণনার নির্দেশ দেন।
স্থানীয়দের অনেকের মতে, যেসব দানবাক্স এক মাস পর খোলার কথা ছিল, সেগুলো প্রত্যাহারের আদেশের পরদিনই খোলার নির্দেশ দিয়ে জেলা প্রশাসক যেন ইঙ্গিত দিয়েছেন যে এই দানবাক্স সংস্কারই তার প্রত্যাহারের কারণ। তবে এ বিষয়ে জানতে চাইলে সারওয়ার আলম তাৎক্ষণিকভাবে কোনো মন্তব্য করতে রাজি হননি। তিনি পরে ভিডিও বার্তার মাধ্যমে বক্তব্য দেবেন বলে জানান। তবে প্রতিবেদন লেখা পর্যন্ত এমন কোনো ভিডিও বার্তা পাওয়া যায়নি।
এদিকে শাহজালাল (রহ.) মাজারের প্রায় ৭০০ বছরের ইতিহাসে প্রথমবারের মতো দানবাক্সের অর্থ প্রকাশ্যে গণনা করা হয়। মাজার কর্তৃপক্ষের আপত্তি ও অসন্তোষের মধ্যেই সোমবার দুপুর আড়াইটার দিকে জেলা প্রশাসনের তত্ত্বাবধানে এ কার্যক্রম পরিচালিত হয়।
দানের অর্থ সংরক্ষণের জন্য ব্যবহৃত ও সিলগালা করা তিনটি বড় ডেগ খোলা হয়। মাত্র তিন দিনে জমা হওয়া অর্থ থেকে নগদ ১৭ লাখ ৬৬ হাজার ৫৫৯ টাকা পাওয়া যায়। এর মধ্যে অধিকাংশ ছিল ১ হাজার ও ৫০০ টাকার নোট। এছাড়া ১০০, ৫০, ২০ ও ১০ টাকার নোটও ছিল উল্লেখযোগ্য পরিমাণে। দেশীয় মুদ্রার পাশাপাশি পাওয়া গেছে ডলার, রিয়াল, পাউন্ড এবং স্বর্ণের ছোট ছোট টুকরো।
মেশিনের মাধ্যমে অর্থ গণনার কাজে দরগাহ মাদ্রাসার শিক্ষার্থীসহ মোট ৩৯ জন স্বেচ্ছাসেবক অংশ নেন।
এর আগে গত ১২ জুন মাজার পরিদর্শনে গিয়ে আয়-ব্যয়ের স্বচ্ছতা ও জবাবদিহি নিশ্চিত করার ঘোষণা দেন জেলা প্রশাসক মো. সারওয়ার আলম। এর অংশ হিসেবে গত বৃহস্পতিবার বিকেলে ঐতিহাসিক তিনটি ডেগ সিলগালা করে প্রশাসনের পক্ষ থেকে নতুন দানবাক্স স্থাপন করা হয়। এই উদ্যোগের পর মাজার-সংশ্লিষ্টদের মধ্যে অসন্তোষ দেখা দেয়।
প্রশাসনিক হস্তক্ষেপ নিয়ে সমালোচনার মধ্যেই রোববার জনপ্রশাসন মন্ত্রণালয়ের এক আদেশে সারওয়ার আলমকে প্রত্যাহার করে মন্ত্রণালয়ের উপসচিব হিসেবে নিয়োগ দেওয়া হয়।
ডিসি সারওয়ার আলম প্রথমে ঘোষণা দিয়েছিলেন, ১৫ দিন পর দানবাক্সের অর্থ গণনা করা হবে। তবে প্রত্যাহারের আদেশের পর সিলেট ছাড়ার আগে তড়িঘড়ি করে তিনি নিজ উপস্থিতিতে অর্থ গণনার কাজ শুরু করেন। যদিও কিছুক্ষণ পর তিনি মাজার এলাকা ত্যাগ করেন।