• ঢাকা
  • সোমবার, ১২ অক্টোবর ২০২৬, ১০:৩৮ পিএম


প্রাণঘাতী ইনজেকশনেও মৃত্যু হয়নি, ফের কারাগারে ক্রিস্টিয়া পাইক!

দি পালস বিডি অনলাইন ডেস্ক
আপডেট টাইম: ১২ অক্টোবর ২০২৬ ৯:৪৫ পিএম

প্রাণঘাতী ইনজেকশনেও মৃত্যু হয়নি, মৃত্যুদণ্ড কার্যকরের পর হাসপাতালে ক্রিস্টিয়া পাইক

একজন মানুষের মৃত্যুদণ্ড কার্যকরের প্রস্তুতি সম্পন্ন। নির্ধারিত পদ্ধতিতে শরীরে প্রাণঘাতী ওষুধ প্রয়োগ করা হলো। প্রত্যাশা ছিল, অল্প সময়ের মধ্যেই তাঁর মৃত্যু হবে। কিন্তু প্রত্যাশিত পরিণতি ঘটল না। বরং শ্বাসপ্রশ্বাসে অস্বাভাবিকতা দেখা দিল, তাঁকে হাসপাতালে নেওয়া হলো। চিকিৎসার পর তিনি বেঁচে উঠলেন। শেষ পর্যন্ত মৃত্যুদণ্ড কার্যকরের স্থান থেকে আবার কারাগারে ফিরতে হলো তাঁকে।

এমন ঘটনা মানুষের মনে স্বাভাবিকভাবেই বিস্ময়, প্রশ্ন ও নানা ব্যাখ্যার জন্ম দেয়। কেউ একে চিকিৎসাবিজ্ঞানের ব্যর্থতা হিসেবে দেখেন, কেউ বিচারব্যবস্থার গুরুতর সংকট মনে করেন, আবার কারও কাছে এটি স্রষ্টার অসীম ক্ষমতার স্মারক। মৃত্যুকে নিশ্চিত ধরে নেওয়া একটি পরিস্থিতিতে জীবন ফিরে পাওয়ার এই অভিজ্ঞতা থেকেই হয়তো মানুষের মুখে উচ্চারিত হয়—‘রাখে আল্লাহ মারে কে?’

তবে আবেগের পাশাপাশি জরুরি কয়েকটি প্রশ্নও রয়েছে। ঠিক কী ঘটেছিল? প্রাণঘাতী ইনজেকশন কেন প্রত্যাশিত ফল দেয়নি? ইতিহাসে এমন ব্যর্থ মৃত্যুদণ্ডের নজির কতটা বিরল? আর চিকিৎসাবিজ্ঞানের ব্যাখ্যা ও ধর্মীয় বিশ্বাসের মধ্যে সম্পর্কটি কোথায়?

মৃত্যুর মুখ থেকে ফিরে আসা ক্রিস্টিয়া পাইকের ঘটনা

যুক্তরাষ্ট্রের টেনেসি অঙ্গরাজ্যের ক্রিস্টিয়া পাইকের ঘটনা কেবল মৃত্যুদণ্ড কার্যকরের একটি ব্যর্থ প্রচেষ্টা নয়; এটি একই সঙ্গে চিকিৎসাবিজ্ঞান, রাষ্ট্রীয় ক্ষমতা, মানবাধিকার ও বিচারব্যবস্থার জবাবদিহি নিয়ে গুরুতর প্রশ্ন তুলেছে।

৫০ বছর বয়সী পাইক ১৯৯৫ সালে সহপাঠী কোলিন স্লিমারকে হত্যার দায়ে মৃত্যুদণ্ডে দণ্ডিত হন। হত্যাকাণ্ডের সময় তাঁর বয়স ছিল ১৮ বছর। দীর্ঘ তিন দশক কারাগারে থাকার পর গত ৩০ সেপ্টেম্বর তাঁর মৃত্যুদণ্ড কার্যকরের উদ্যোগ নেওয়া হয়।

ন্যাশভিলের রিভারবেন্ড সর্বোচ্চ নিরাপত্তার কারাগারে তাঁর শরীরে প্রাণঘাতী ওষুধ পেন্টোবারবিটালের দুটি মাত্রা প্রয়োগ করা হয়। কিন্তু প্রত্যাশিতভাবে তাঁর মৃত্যু হয়নি। বরং তিনি শ্বাস নিতে থাকেন, মাথা তোলেন এবং বাহুতে ব্যথার কথা জানান।

পরে তাঁকে হাসপাতালে নেওয়া হয়। একপর্যায়ে কৃত্রিম শ্বাসপ্রশ্বাসের সহায়তাও দিতে হয়। তাঁর আইনজীবীরা প্রথমে আশঙ্কা করেছিলেন, তিনি হয়তো মস্তিষ্কের কার্যক্ষমতা হারিয়েছেন। কিন্তু পরে তিনি জ্ঞান ফিরে পান, কথা বলতে শুরু করেন এবং সহায়তা নিয়ে হাঁটতেও সক্ষম হন। ১০ অক্টোবর হাসপাতাল থেকে তাঁকে আবার কারাগারে নেওয়া হয়, যেখানে তাঁর চিকিৎসা অব্যাহত রয়েছে।

এক প্রচেষ্টায় দুই মাত্রার ওষুধ, তবু মৃত্যু হয়নি

ঘটনার একটি গুরুত্বপূর্ণ দিক হলো, পাইককে আলাদা আলাদা সময়ে একাধিকবার মৃত্যুদণ্ড দেওয়া হয়নি। একই দিন মৃত্যুদণ্ড কার্যকরের একটি প্রচেষ্টায় তাঁকে পরপর দুটি মাত্রায় প্রাণঘাতী ওষুধ দেওয়া হয়েছিল। দুই মাত্রার পরও তাঁর মৃত্যু না হওয়ায় কার্যক্রম বন্ধ করা হয়।

তাই ঘটনাটিকে ‘বারবার মৃত্যুদণ্ড থেকে বেঁচে যাওয়া’ বলার চেয়ে ‘একটি মৃত্যুদণ্ড কার্যকরের প্রচেষ্টায় দুই মাত্রার ওষুধ প্রয়োগের পরও বেঁচে যাওয়া’ বলা তথ্যগতভাবে বেশি নির্ভুল।

কেন ব্যর্থ হলো প্রাণঘাতী ইনজেকশন?

এ ঘটনায় টেনেসি কর্তৃপক্ষ এখনো কী ভুল হয়েছিল, তার বিস্তারিত ব্যাখ্যা দেয়নি। তবে চিকিৎসাবিশেষজ্ঞ ও প্রাণঘাতী ইনজেকশন পদ্ধতি নিয়ে কাজ করা বিশেষজ্ঞদের একটি সম্ভাব্য ব্যাখ্যা হলো, শিরায় ওষুধ প্রবেশ করানোর ব্যবস্থায় ত্রুটি থাকতে পারে।

ইনজেকশনের ওষুধ রক্তপ্রবাহে প্রবেশ না করে শরীরের আশপাশের টিস্যুতে জমা হলে প্রত্যাশিত প্রভাব নাও ঘটতে পারে। পাইকের আইনজীবীরাও আদালতে এমন আশঙ্কার কথা তুলেছেন। তবে তদন্ত শেষ হওয়ার আগে এটিকে নিশ্চিত কারণ হিসেবে ধরে নেওয়ার সুযোগ নেই।

অর্থাৎ, ওষুধ প্রয়োগের পরও কেন প্রত্যাশিত ফল আসেনি, তার চূড়ান্ত উত্তর এখনো পাওয়া যায়নি। বিষয়টি নিশ্চিত করতে সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষের পর্যালোচনা ও তদন্তের ফল গুরুত্বপূর্ণ।

টেনেসিতে মৃত্যুদণ্ড স্থগিত, স্বাধীন পর্যালোচনার নির্দেশ

ঘটনার পর টেনেসির গভর্নর বিল লি ২০২৬ সালের বাকি সময়ের জন্য অঙ্গরাজ্যে সব মৃত্যুদণ্ড কার্যকর স্থগিত করেছেন। পাশাপাশি কী ঘটেছিল, তা জানতে স্বাধীন পর্যালোচনার নির্দেশ দিয়েছেন।

এর আগে মে মাসে টনি ক্যারুথার্সের মৃত্যুদণ্ড কার্যকরের প্রচেষ্টাও শিরায় ওষুধ প্রয়োগের ব্যবস্থা স্থাপন করতে না পারায় বন্ধ করতে হয়েছিল। এ দুই ঘটনার পর অঙ্গরাজ্যের কারা বিভাগের প্রধানের পদত্যাগের খবরও প্রকাশিত হয়েছে।

ফলে প্রশ্নটি আর শুধু একজন দণ্ডপ্রাপ্ত ব্যক্তির বেঁচে থাকার মধ্যে সীমাবদ্ধ নেই। মৃত্যুদণ্ড কার্যকরের পদ্ধতি কতটা নির্ভরযোগ্য, প্রক্রিয়ায় ত্রুটি হলে তার দায় কে নেবে এবং এমন ঘটনার পর রাষ্ট্র কীভাবে জবাবদিহি নিশ্চিত করবে—সেসব প্রশ্নও সামনে এসেছে।

ক্রিস্টিয়া পাইকের ঘটনা তাই চিকিৎসাবিজ্ঞানের সীমাবদ্ধতা, রাষ্ট্রীয় ব্যবস্থার নির্ভরযোগ্যতা এবং মৃত্যুদণ্ডের প্রয়োগ নিয়ে নতুন করে আলোচনার অবকাশ তৈরি করেছে। তবে ঘটনাটির প্রকৃত কারণ এবং দায় নির্ধারণের জন্য স্বাধীন পর্যালোচনার ফলের অপেক্ষা করতে হবে।

/এএসএফ