• ঢাকা
  • রোববার, ০৪ অক্টোবর ২০২৬, ১০:৫৮ পিএম


“যুক্তরাষ্ট্রের সম্ভাব্য আগ্রাসনের প্রস্ততি নিয়ে রাখছে কানাডা”

দি পালস বিডি অনলাইন ডেস্ক
আপডেট টাইম: ৪ অক্টোবর ২০২৬ ৯:৫৬ পিএম

কানাডার প্রধানমন্ত্রী মার্ক কার্নি জানিয়েছেন, যুক্তরাষ্ট্রের পক্ষ থেকে সামরিক পদক্ষেপ নেওয়ার মতো একটি অত্যন্ত অসম্ভাব্য পরিস্থিতির কথাও তার সরকার বিবেচনায় রেখেছে। তবে তিনি জোর দিয়ে বলেছেন, এমন পরিস্থিতি কানাডার জন্য কোনো ‘মূল সম্ভাবনা’ নয়; বরং ঝুঁকি ব্যবস্থাপনার অংশ হিসেবেই বিষয়টি বিবেচনা করা হয়েছে।

সম্প্রতি নিউইয়র্ক টাইমসকে দেওয়া এক সাক্ষাৎকারে কার্নি বলেন, কোনো দেশের নেতা যখন নিজের দেশের সার্বভৌমত্বের প্রতি হুমকি দেন, তখন দায়িত্বশীল সরকারের উচিত সম্ভাব্য চরম ঝুঁকিগুলোও বিবেচনায় রাখা। তিনি এ ধরনের পরিস্থিতিকে ‘এক্সট্রিম টেইল রিস্ক’ বা অত্যন্ত কম সম্ভাবনাময় কিন্তু গুরুতর ঝুঁকি হিসেবে বর্ণনা করেন।

কার্নি বলেন, ‘এটি ঝুঁকি ব্যবস্থাপনার অংশ। এটি কোনো মূল সম্ভাবনা নয়, কিন্তু বিষয়টি বিবেচনায় না নেওয়াটা দায়িত্বহীনতা হবে।’ তবে কানাডা ঠিক কী ধরনের প্রস্তুতি নিয়েছে, সে বিষয়ে বিস্তারিত জানাতে রাজি হননি তিনি।

ট্রাম্পের শাসনামলে যুক্তরাষ্ট্র ও কানাডার সম্পর্কের পরিবর্তিত পরিস্থিতির মধ্যেই কার্নির এ বক্তব্য এসেছে। মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প একাধিকবার কানাডাকে যুক্তরাষ্ট্রের ৫১তম অঙ্গরাজ্যে পরিণত করার কথা বলেছেন। পাশাপাশি দুই দেশের মধ্যে বাণিজ্য ও শুল্ক নিয়ে বিরোধও বেড়েছে।

তবে সামরিক বিশেষজ্ঞদের মতে, যুক্তরাষ্ট্রের সরাসরি সামরিক আগ্রাসনের সম্ভাবনা অত্যন্ত কম। কানাডা ও যুক্তরাষ্ট্র দীর্ঘদিন ধরে প্রতিরক্ষা ও নিরাপত্তার বিভিন্ন ক্ষেত্রে ঘনিষ্ঠভাবে সহযোগিতা করে আসছে।

দুই দেশই ন্যাটোর সদস্য। এ ছাড়া নর্থ আমেরিকান অ্যারোস্পেস ডিফেন্স কমান্ড বা নোরাডের আওতায় কানাডা ও যুক্তরাষ্ট্র উত্তর আমেরিকার আকাশ ও মহাকাশ নিরাপত্তায় যৌথভাবে কাজ করে। দুই দেশের সামরিক বাহিনীর মধ্যে নিয়মিত সহযোগিতা ও তথ্য বিনিময়ও রয়েছে।

রয়্যাল কানাডিয়ান এয়ার ফোর্সের সাবেক কর্মকর্তা লেফটেন্যান্ট জেনারেল ক্রিস্টোফার কোটস বলেন, কানাডা ও যুক্তরাষ্ট্রের মধ্যে সরাসরি যুদ্ধের পরিস্থিতি কল্পনা করাও অত্যন্ত কঠিন। তার সামরিক কর্মজীবনে যুক্তরাষ্ট্রের ভূখণ্ড থেকে কানাডার বিরুদ্ধে সামরিক হামলার আশঙ্কাকে বাস্তব পরিকল্পনার বিষয় হিসেবে বিবেচনা করা হয়নি।

তার মতে, দুই দেশের বিদ্যমান প্রতিরক্ষা সহযোগিতার কারণে সরাসরি সামরিক সংঘাতের পরিস্থিতি অত্যন্ত অস্বাভাবিক হবে। তবে সাইবার হামলার মতো তুলনামূলকভাবে গোপনীয় পদ্ধতিতে কোনো সংঘাত শুরু হতে পারে—এমন সম্ভাবনার কথাও তিনি উল্লেখ করেছেন।

সম্পর্ক সব সময় এতটা ঘনিষ্ঠ ছিল না

বর্তমানে কানাডা ও যুক্তরাষ্ট্র ঘনিষ্ঠ মিত্র হলেও ইতিহাসে দুই দেশের সম্পর্ক সব সময় এতটা সহযোগিতাপূর্ণ ছিল না।

কানাডিয়ান ওয়ার মিউজিয়ামের গবেষক টিম ফোরানের মতে, কানাডার জাতীয় পরিচয়ের একটি ঐতিহাসিক ভিত্তি হলো যুক্তরাষ্ট্রের সম্প্রসারণবাদী নীতির বিরুদ্ধে প্রতিরোধের ইতিহাস।

কানাডা রাষ্ট্র হিসেবে প্রতিষ্ঠিত হওয়ার আগেই ব্রিটিশ উত্তর আমেরিকার উপনিবেশগুলোতে যুক্তরাষ্ট্রের সামরিক অভিযান হয়েছিল। ১৭৭৫ সালে মার্কিন বাহিনী মন্ট্রিল দখল করেছিল এবং কুইবেক শহরও দখলের চেষ্টা করেছিল।

১৮১২ সালের যুদ্ধেও তৎকালীন আপার কানাডা, লোয়ার কানাডা ও উপকূলীয় এলাকায় মার্কিন বাহিনী একাধিক অভিযান চালায়। ওই যুদ্ধের সময় ব্রিটিশ বাহিনী ওয়াশিংটনে পাল্টা অভিযান চালিয়ে হোয়াইট হাউস পুড়িয়ে দেয়।

পরবর্তীতে প্রথম বিশ্বযুদ্ধের পরও যুক্তরাষ্ট্রের ক্রমবর্ধমান শক্তির প্রেক্ষাপটে কানাডা সম্ভাব্য সংঘাতের প্রস্তুতি হিসেবে একটি পরিকল্পনা তৈরি করেছিল। সেই পরিকল্পনার অংশ হিসেবে কানাডীয় সামরিক কর্মকর্তারা সীমান্তবর্তী মার্কিন শহরগুলোতে পর্যটকের ছদ্মবেশে গিয়ে সেতু, মহাসড়ক ও অন্যান্য গুরুত্বপূর্ণ স্থাপনার তথ্য সংগ্রহ করেছিলেন।

কানাডিয়ান ওয়ার মিউজিয়ামের গবেষক অ্যান্ড্রু বার্চ বলেন, তখন যুদ্ধের আশঙ্কা কম থাকলেও সম্ভাব্য পরিস্থিতির জন্য প্রস্তুত থাকা সামরিক বাহিনীর স্বাভাবিক দায়িত্বের অংশ ছিল।

সম্ভাব্য সংঘাত নিয়ে নতুন করে ভাবনা

বর্তমান পরিস্থিতিতেও কানাডার প্রতিরক্ষা পরিকল্পনায় সম্ভাব্য ঝুঁকিগুলো নতুন করে বিবেচনা করা হচ্ছে। কানেকটিকাটের ইউনিভার্সিটি অব নিউ হ্যাভেনের জাতীয় নিরাপত্তাবিষয়ক সহযোগী অধ্যাপক ম্যাথিউ শ্মিডটের মতে, কানাডার পক্ষ থেকে এমন প্রস্তুতির বিষয়টি উত্তর আমেরিকার ভূরাজনৈতিক পরিবেশের পরিবর্তনের ইঙ্গিত দেয়।

তিনি বলেন, কানাডীয় নেতৃত্বকে এখন যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে প্রতিরক্ষা সহযোগিতার ভবিষ্যৎ নিয়েও ভাবতে হচ্ছে। কারণ দীর্ঘদিনের ঘনিষ্ঠ সামরিক অংশীদারত্বের মাধ্যমে দুই দেশ একে অপরের গুরুত্বপূর্ণ নিরাপত্তা ও গোয়েন্দা তথ্যের সঙ্গে যুক্ত।

শ্মিডটের মতে, ট্রাম্পের কানাডাকে ৫১তম অঙ্গরাজ্য করার মন্তব্যকে যুক্তরাষ্ট্রে কেউ কেউ রাজনৈতিক বক্তব্য হিসেবে দেখলেও কানাডার নীতিনির্ধারকদের কাছে বিষয়টি উপেক্ষা করার মতো নয়।

চলতি বছরের শুরুতে গ্লোব অ্যান্ড মেইলের এক প্রতিবেদনে কানাডার সামরিক বাহিনীর একটি মডেলের কথা উল্লেখ করা হয়েছিল। ওই মডেল অনুযায়ী, যুক্তরাষ্ট্রের মতো বৃহৎ সামরিক শক্তির বিরুদ্ধে কোনো সরাসরি সংঘাতে কানাডার কৌশলগত অবস্থানগুলো দ্রুত চাপে পড়তে পারে। সে ক্ষেত্রে কানাডীয় বাহিনীকে দীর্ঘমেয়াদি প্রতিরোধের জন্য ভিন্ন ধরনের কৌশল নিতে হতে পারে বলে প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়েছিল।

কানাডার সাবেক সামরিক কর্মকর্তা কোটস অবশ্য মনে করেন, এ ধরনের মডেল মূলত সম্ভাব্য পরিস্থিতি নিয়ে সামরিক পরিকল্পনার একটি প্রাথমিক কাঠামো। তিনি বলেন, ভূরাজনৈতিক অনিশ্চয়তা বাড়ায় কানাডা এখন স্থলভিত্তিক প্রতিরক্ষা পরিকল্পনার ঘাটতিগুলোও পূরণের চেষ্টা করছে।

এরই মধ্যে কানাডার প্রতিরক্ষা প্রধান সামরিক বাহিনীর আকার বাড়ানোর আহ্বান জানিয়েছেন। এর মধ্যে স্বল্পমেয়াদি প্রশিক্ষণপ্রাপ্ত বিপুলসংখ্যক নাগরিক-সৈনিক অন্তর্ভুক্ত করার প্রস্তাবও রয়েছে।

তবে যুক্তরাষ্ট্রের সামরিক শক্তির তুলনায় কানাডা অনেক ছোট হলেও সরাসরি আগ্রাসন চালানো ওয়াশিংটনের জন্যও সহজ হবে না বলে মনে করেন কিছু বিশেষজ্ঞ। তাদের মতে, এমন সিদ্ধান্তের ক্ষেত্রে রাজনৈতিক, সামরিক ও আন্তর্জাতিক পর্যায়ে বড় ধরনের প্রতিক্রিয়ার বিষয়টি বিবেচনায় নিতে হবে।

শ্মিডটের মতে, দুই দেশের সামরিক বাহিনীর মধ্যে দীর্ঘদিনের ঘনিষ্ঠ যোগাযোগ ও যৌথ প্রশিক্ষণের কারণেও সরাসরি সংঘাতের পরিস্থিতি অত্যন্ত অস্বাভাবিক হবে।

কার্নির বক্তব্যের মূল বিষয়ও হলো, যুক্তরাষ্ট্রের সামরিক আগ্রাসনকে তিনি আসন্ন বা সম্ভাব্য ঘটনা হিসেবে দেখছেন না। বরং দুই দেশের সম্পর্কের পরিবর্তিত পরিস্থিতিতে কানাডা সরকার সম্ভাব্য চরম ঝুঁকিগুলোকেও নীতিগত প্রস্তুতির অংশ হিসেবে বিবেচনায় রাখছে।

/এএসএফ