মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প গত সপ্তাহে নেব্রাস্কার একটি সমাবেশে যে গাঢ় নীল রঙের স্যুট পরেছিলেন, সেটি তৈরি হয়েছে বাংলাদেশের নারায়ণগঞ্জের আদমজী রপ্তানি প্রক্রিয়াকরণ অঞ্চলে (ইপিজেড)। চলতি বছরের প্রথম আট মাসে যুক্তরাষ্ট্রে পোশাক আমদানি কমলেও ভবিষ্যতে দেশটির বাজারে প্রবৃদ্ধির সম্ভাবনা দেখছেন বাংলাদেশের পোশাক প্রস্তুতকারকেরা। সংশ্লিষ্ট কারখানার ব্যবস্থাপনা পরিচালকও যুক্তরাষ্ট্রের বাজার নিয়ে আশাবাদ প্রকাশ করেছেন।
মার্কিন পোশাক ব্র্যান্ড ‘জোস. এ. ব্যাংক’-এর ওই স্যুটটি তৈরি করেছে বাংলাদেশের ইউনিভার্সাল মেনসওয়্যার লিমিটেড। প্রতিষ্ঠানটির ব্যবস্থাপনা পরিচালক শরিফ জহির বিষয়টি নিশ্চিত করেছেন। গত ৫ অক্টোবর নেব্রাস্কার গ্র্যান্ড আইল্যান্ডে আয়োজিত ‘মেক আমেরিকা গ্রেট এগেইন’ সমাবেশে স্যুটটি পরেছিলেন ট্রাম্প।
স্যুটটির ব্র্যান্ডের নাম প্রকাশ্যে আসার পর এটি কোথায় তৈরি হয়েছে, তা নিয়ে প্রশ্ন ওঠে। গত বৃহস্পতিবার সিএনএনের এক প্রতিবেদনে বলা হয়, স্যুটটি বাংলাদেশ অথবা চীনের যেকোনো একটি দেশে তৈরি হয়ে থাকতে পারে।
অনন্ত গ্রুপের ব্যবস্থাপনা পরিচালক এবং বাংলাদেশ পোশাক প্রস্তুতকারক ও রপ্তানিকারক সমিতির (বিজিএমইএ) সাবেক পরিচালক শরিফ জহির জানিয়েছেন, এই স্যুট তৈরির ঘটনা বাংলাদেশের পোশাকশিল্প এবং সংশ্লিষ্ট কারখানার দক্ষ শ্রমিকদের জন্য গর্বের বিষয়।
তাঁর মতে, বিশ্বের অন্যতম ধনী দেশের প্রেসিডেন্টের গায়ে সাশ্রয়ী মূল্যে তৈরি বাংলাদেশি স্যুট দেখা যাওয়াটা দেশের প্রযুক্তিগত সক্ষমতা ও কম খরচে মানসম্মত পণ্য উৎপাদনের দক্ষতার পরিচয় বহন করে।
ইউনিভার্সাল মেনসওয়্যার আন্তর্জাতিক বাজারের জন্য স্যুট, ব্লেজার, জ্যাকেট ও ট্রাউজার তৈরি করে থাকে। প্রতিষ্ঠানটির কারখানা পাঁচ লাখ বর্গফুটেরও বেশি জায়গাজুড়ে বিস্তৃত। কোম্পানির ওয়েবসাইটে দেওয়া তথ্য অনুযায়ী, কারখানাটিতে স্বয়ংক্রিয় কাপড় কাটার ব্যবস্থা, বিশেষায়িত সেলাই ও প্রেসিং মেশিন এবং উৎপাদন ও গুদামজাতকরণ এলাকায় পণ্য পরিবহনের জন্য কনভেয়ারভিত্তিক ব্যবস্থা রয়েছে।
শরিফ জহির জানান, বর্তমানে ইউরোপ বাংলাদেশের পোশাকশিল্পের সবচেয়ে বড় বাজার হলেও সেখানে বাংলাদেশি সরবরাহকারীদের জন্য সম্প্রসারণের সুযোগ প্রায় সীমিত হয়ে এসেছে। এ অবস্থায় যুক্তরাষ্ট্রের বাজারকে ভবিষ্যৎ প্রবৃদ্ধির প্রধান ক্ষেত্র হিসেবে দেখছেন তিনি।
জহির বলেন, ‘ইউরোপীয় বাজার প্রায় পূর্ণ হয়ে আসায় বাংলাদেশি পোশাকের ভবিষ্যৎ প্রবৃদ্ধির চালিকাশক্তি হবে যুক্তরাষ্ট্র।’
তিনি আরও জানান, অনন্ত গ্রুপের বিভিন্ন ইউনিটে ডেনিম, সোয়েটার, নারী ও পুরুষদের পোশাক এবং অ্যাক্টিভওয়্যার উৎপাদন করা হয়।
শরিফ জহিরের মতে, ট্রাম্প প্রশাসনের সময়কার শুল্ক কাঠামোও বাংলাদেশের পোশাকশিল্পের জন্য নতুন সম্ভাবনা তৈরি করছে। প্রধান প্রতিযোগী ভিয়েতনামের তুলনায় বাংলাদেশের শুল্কহার মাত্র প্রায় এক শতাংশ বেশি। ফলে দেশের উৎপাদন ও সরবরাহব্যবস্থার কাঠামোগত দুর্বলতাগুলো কাটিয়ে উঠতে পারলে এই সুযোগ কাজে লাগিয়ে আন্তর্জাতিক বাজারে প্রতিযোগিতায় টিকে থাকা সম্ভব।
পোশাকশিল্পের সক্ষমতা বাড়াতে পলিয়েস্টার ও নাইলনজাত পণ্যের উৎপাদনে আরও গুরুত্ব দেওয়ার আহ্বান জানিয়েছেন তিনি। এসব পণ্য তৈরির জন্য প্রয়োজনীয় ফ্যাব্রিক মিল স্থাপনে বড় বিনিয়োগকারীদের এগিয়ে আসার কথাও বলেন তিনি।
বাংলাদেশের পোশাক রপ্তানির ক্ষেত্রে পণ্য পরিবহনে দীর্ঘ সময় লাগাকে একটি বড় চ্যালেঞ্জ হিসেবে উল্লেখ করেছেন শরিফ জহির। তাঁর ভাষ্য, দেশে গভীর সমুদ্রবন্দর না থাকায় যুক্তরাষ্ট্রে পণ্য পৌঁছাতে প্রায় ৩০ দিন সময় লাগে। এর পাশাপাশি শুল্ক বিভাগের ছাড়পত্র পেতেও অতিরিক্ত সময় ব্যয় হয়।
তিনি বলেন, ‘ভিয়েতনাম এবং মিশরের মতো প্রতিদ্বন্দ্বীরা যুক্তরাষ্ট্রে অনেক দ্রুত পণ্য পাঠাতে পারে। তাই লিড টাইম কমানো অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ।’
অর্ডারের সময়সীমা সম্পর্কে শরিফ জহির জানান, শরৎকালীন পোশাকের অর্ডারগুলোর কাজ শেষ হয়েছে। বর্তমানে তাঁদের প্রতিষ্ঠান বসন্তকাল এবং পরবর্তী সময়ে গ্রীষ্মকালের জন্য অর্ডার নিচ্ছে। ভবিষ্যতে তাঁদের ব্যবসার প্রবৃদ্ধির বড় অংশ যুক্তরাষ্ট্রের বাজার থেকে আসবে বলে আশা করছেন তিনি।
যুক্তরাষ্ট্রের টেক্সটাইল অ্যান্ড অ্যাপারেল অফিসের (ওটিইএক্সএ) তথ্য অনুযায়ী, ২০২৬ সালের প্রথম আট মাসে দেশটির পোশাক আমদানিতে পতন হয়েছে। তবে অন্যান্য কয়েকটি প্রধান সরবরাহকারী দেশের তুলনায় বাংলাদেশ এই মন্দা তুলনামূলক ভালোভাবে মোকাবিলা করেছে। বিশেষ করে আগস্ট মাসে বাংলাদেশের পোশাক রপ্তানিতে উল্লেখযোগ্য প্রবৃদ্ধি দেখা গেছে।
জানুয়ারি থেকে আগস্ট পর্যন্ত আট মাসে যুক্তরাষ্ট্র মোট ৪৯ দশমিক ০৮ বিলিয়ন ডলারের পোশাক আমদানি করেছে। আগের বছরের একই সময়ের তুলনায় আমদানির এই পরিমাণ ৭ দশমিক ৪২ শতাংশ কম। বর্গমিটার সমতুল্য হিসাবে আমদানির পরিমাণ কমেছে ৮ দশমিক ৯৮ শতাংশ। অন্যদিকে, প্রতি ইউনিট পোশাকের গড় মূল্য বেড়েছে ১ দশমিক ৭১ শতাংশ।
একই সময়ে যুক্তরাষ্ট্রে বাংলাদেশের পোশাক রপ্তানি ৪ দশমিক ৪৩ শতাংশ কমে ৫ দশমিক ৩৯ বিলিয়ন ডলারে দাঁড়িয়েছে। তবে শুধু আগস্ট মাসের হিসাব বিবেচনায় নিলে গত বছরের একই সময়ের তুলনায় বাংলাদেশের পোশাক রপ্তানি ১১ দশমিক ১৫ শতাংশ বেড়েছে।
বাংলাদেশ অ্যাপারেল ভয়েসের প্রতিষ্ঠাতা ও প্রধান নির্বাহী মহিউদ্দিন রুবেল মনে করেন, তুলনামূলক অনুকূল শুল্ক কাঠামো যুক্তরাষ্ট্রের বাজারে বাংলাদেশের প্রতিযোগিতামূলক অবস্থানকে শক্তিশালী করতে পারে।
তিনি বলেন, ‘চীনের মতো প্রতিযোগীদের সঙ্গে শুল্কের এই পার্থক্য ক্রেতাদের সোর্সিংয়ের সিদ্ধান্তকে প্রভাবিত করতে পারে।’
তিনি আরও বলেন, ‘আমাদের প্রতিযোগীদের তুলনায় বাংলাদেশের শুল্ক কাঠামো ভালো। স্বাভাবিকভাবেই ক্রেতারা সেই সুবিধা নিতে চাইবেন।’
/এসএন