• ঢাকা
  • বুধবার, ২১ অক্টোবর ২০২৬, ১২:২১ পিএম


পূজার ছুটিতে রাজশাহী যাওয়া হলো না, পথে প্রাণ গেল বাবা-মেয়ের

দি পালস বিডি অনলাইন ডেস্ক
আপডেট টাইম: ২০ অক্টোবর ২০২৬ ৮:৫৭ পিএম

হাসপাতালে শুয়ে স্বামী-মেয়ের খোঁজ করছেন রুবিনা, জানেন না তাঁরা আর নেই

পূজার ছুটিতে স্বামী ও দুই সন্তানকে নিয়ে রাজশাহীতে বড় বোনের বাসায় বেড়াতে যাওয়ার পরিকল্পনা করেছিলেন রুবিনা আক্তার (৩৬)। সেখানে স্বজনদের সঙ্গে আনন্দে সময় কাটানোর কথা ছিল তাঁদের। কিন্তু গন্তব্যে পৌঁছানোর আগেই ভয়াবহ সড়ক দুর্ঘটনায় থেমে যায় তাঁদের যাত্রা। বাস ও ট্রাকের মুখোমুখি সংঘর্ষে প্রাণ হারান রুবিনার স্বামী শহিদুল ইসলাম (৪০) ও আট বছর বয়সী মেয়ে তাছফিয়া খাতুন। গুরুতর আহত রুবিনা ও তাঁর ছেলে লাবিব হোসেন (১০) হাসপাতালে চিকিৎসাধীন।স্বামী ও মেয়ের মৃত্যুর খবর এখনো জানেন না রুবিনা। হাসপাতালের বিছানায় শুয়ে শারীরিক যন্ত্রণার মধ্যেও বারবার জানতে চাইছেন, তাঁর স্বামী ও সন্তানেরা কোথায়। অথচ তাঁর জীবনের সবচেয়ে আপন দুজন আর কখনো ফিরে আসবেন না—এই নির্মম সত্যটি জানেন আশপাশের স্বজনেরা, শুধু জানেন না তিনি নিজেই।মঙ্গলবার (২০ অক্টোবর) ভোরে নাটোরের বড়াইগ্রাম উপজেলার বনপাড়া পুলিশ তদন্ত কেন্দ্রের সামনে নাটোর-পাবনা মহাসড়কে এ মর্মান্তিক দুর্ঘটনা ঘটে। যাত্রীবাহী একটি বাসের সঙ্গে বালুবোঝাই ট্রাকের মুখোমুখি সংঘর্ষে মোট ১২ জন নিহত হন। আহত হন আরও অনেকে। নিহতদের মধ্যে রয়েছেন রুবিনার স্বামী ও মেয়ে।রুবিনা পটুয়াখালীর মির্জাগঞ্জ উপজেলার সুবিদখালী গ্রামের বাসিন্দা। তিনি পূবালী ব্যাংকের সুবিদখালী শাখার জ্যেষ্ঠ কর্মকর্তা। তাঁর স্বামী শহিদুল ইসলাম ব্র্যাক ব্যাংকের মাগুরা শাখার ক্রেডিট ম্যানেজার ছিলেন। তাঁদের মেয়ে তাছফিয়া খাতুন তৃতীয় শ্রেণিতে এবং ছেলে লাবিব হোসেন পঞ্চম শ্রেণিতে পড়ত।পূজার ছুটিতে রাজশাহীতে বড় বোনের বাসায় বেড়াতে যাওয়ার পরিকল্পনা অনুযায়ী সন্তানদের নিয়ে পটুয়াখালী থেকে রওনা হয়েছিলেন রুবিনা। পথে একই বাসে ওঠেন তাঁর স্বামী শহিদুল ইসলাম। পরিবারের সবাই মিলে ছুটি কাটানোর কথা থাকলেও রাজশাহীতে পৌঁছানোর আগেই ঘটে যায় ভয়াবহ দুর্ঘটনা। আনন্দের সফর পরিণত হয় এক অপূরণীয় বেদনায়।রুবিনার ভগ্নিপতি শহিদুর রহমান রাজশাহীর পাঠানপাড়া এলাকায় থাকেন। তিনি ইস্টার্ন ব্যাংকের কর্মকর্তা। তাঁর বাসাতেই পূজার ছুটি কাটানোর কথা ছিল রুবিনা ও শহিদুলের।নির্ধারিত সময়ে তাঁরা না পৌঁছানোয় খোঁজখবর শুরু করেন শহিদুর রহমান। পরে দুর্ঘটনার খবর পেয়ে জানতে পারেন, যে স্বজনদের আগমনের অপেক্ষায় ছিলেন, তাঁদের মধ্যে দুজন আর কখনো ফিরবেন না। এমন সংবাদ মেনে নেওয়া তাঁর জন্যও কঠিন হয়ে পড়ে।শহিদুর রহমান জানান, কিছুদিন আগেই রুবিনা ও শহিদুল ওমরাহ পালন করে দেশে ফিরেছিলেন। দুজনই ব্যাংকে চাকরি করতেন। পূজার ছুটিতে পরিবারের সদস্যদের নিয়ে একসঙ্গে সময় কাটানোর পরিকল্পনা করেছিলেন তাঁরা। কিন্তু একটি দুর্ঘটনা মুহূর্তেই সবকিছু বদলে দিয়েছে।দুর্ঘটনার পর আহত মা-ছেলের চিকিৎসা নিয়ে উদ্বিগ্ন স্বজনেরা। মঙ্গলবার সকাল সাড়ে আটটার দিকে বনপাড়া পাটোয়ারী ক্লিনিকে চিকিৎসাধীন রুবিনার পাশে ছিলেন তাঁর পরিবারের সদস্যরা। অন্যদিকে নাটোর সদর হাসপাতালে ভর্তি ছেলে লাবিবের পাশে রয়েছেন শহিদুর রহমান। রুবিনার পাশে আছেন শহিদুর রহমানের স্ত্রী।শয্যায় শুয়ে ব্যথায় কাতরাচ্ছিলেন রুবিনা। নিজের শারীরিক কষ্টের মধ্যেও বারবার জানতে চাইছিলেন, তাঁর স্বামী ও সন্তানেরা কোথায়। কিন্তু স্বামী ও মেয়ের মৃত্যুর খবর তাঁকে এখনো জানানো হয়নি। স্বজনেরা একদিকে আহত মা-ছেলের চিকিৎসা নিয়ে উৎকণ্ঠায় রয়েছেন, অন্যদিকে তাঁদের সামলাতে হচ্ছে প্রিয়জন হারানোর অসহনীয় শোক।যে পূজার ছুটিতে পরিবারের সবাই মিলে আনন্দে কয়েকটি দিন কাটানোর কথা ছিল, সেই ছুটিই রুবিনার পরিবারের জন্য হয়ে উঠেছে চিরবেদনার স্মৃতি। রাজশাহীর বাসায় তাঁদের অপেক্ষায় থাকা স্বজনদের আনন্দও মুহূর্তে মুছে গেছে।হাসপাতালে শুয়ে স্বামী ও সন্তানের খোঁজ করছেন রুবিনা। এখনো যেন অপেক্ষা করছেন তাঁদের ফিরে পাওয়ার আশায়। অথচ তাঁর অপেক্ষার পরিণতি কী, তা জানেন চারপাশের মানুষ। শুধু রুবিনা জানেন না, তাঁর সাজানো সংসারের দুটি প্রিয় মুখ চিরতরে হারিয়ে গেছে।এদিকে দুর্ঘটনায় নিহতের সংখ্যা নিয়ে প্রাথমিকভাবে বিভ্রান্তি তৈরি হয়েছিল। নাটোরের অতিরিক্ত পুলিশ সুপার ইফতেখায়ের আলম জানান, তথ্যগত ভুলের কারণে দুর্ঘটনার পর প্রথমে নিহতের সংখ্যা ১৪ বলা হয়েছিল। পরে যাচাই-বাছাই করে নিহতের সংখ্যা ১২ বলে নিশ্চিত হওয়া গেছে।দুর্ঘটনার পর উদ্ধার তৎপরতার কারণে কিছু সময় মহাসড়কে যান চলাচল ব্যাহত হয়। তবে বর্তমানে যান চলাচল স্বাভাবিক রয়েছে। এ ঘটনায় আইনগত ব্যবস্থা নেওয়ার প্রক্রিয়া চলছে।

/বিএসএস