• ঢাকা
  • রোববার, ১৮ অক্টোবর ২০২৬, ০৪:৩৮ এএম


‘এ দেশে মেধার মূল্য নাই’, ৪৫তম বিসিএসে ৪০তম হয়েও গেজেটে নাম নেই ফাহিমের

দি পালস বিডি অনলাইন ডেস্ক
আপডেট টাইম: ১৭ অক্টোবর ২০২৬ ১:৩১ পিএম

৪৫তম বিসিএসে পুলিশ ক্যাডারে সহকারী পুলিশ সুপার (এএসপি) পদে সুপারিশপ্রাপ্ত হয়েছিলেন ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের ফার্মেসি বিভাগের সাবেক শিক্ষার্থী ফাহিম ফয়সাল। মেধাতালিকায় ৪০তম স্থান অর্জন করা এই তরুণের চার বছরের পরিশ্রমের পর স্বপ্ন পূরণের আশা তৈরি হয়েছিল। কিন্তু চূড়ান্ত নিয়োগের গেজেট প্রকাশের পর সেই স্বপ্নে ছেদ পড়েছে। জনপ্রশাসন মন্ত্রণালয়ের প্রকাশিত গেজেটে নাম না থাকায় হতাশা ও ক্ষোভে ভেঙে পড়েছেন ফাহিম ও তাঁর পরিবারের সদস্যরা।

ফাহিম ফয়সালের বাড়ি বগুড়া শহরের কাটনারপাড়া এলাকায়। তিনি ২০১৪ সালে বগুড়া জিলা স্কুল থেকে এসএসসি এবং ২০১৬ সালে সরকারি আজিজুল হক কলেজ থেকে এইচএসসি পাস করেন। পরে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের ফার্মেসি বিভাগ থেকে ২০২২ সালে স্নাতক (অনার্স) এবং ২০২৫ সালে স্নাতকোত্তর (মাস্টার্স) সম্পন্ন করেন। বর্তমানে তিনি বগুড়া শহরের চাঁদনী বাজার এলাকায় জনতা ব্যাংকে কর্মরত রয়েছেন।

পারিবারিক সূত্রে জানা গেছে, ফাহিমের বাবা মো. খাইরুল বাশার একজন আইনজীবী। তাঁর মা শাহানাজ বেগম একটি সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ের শিক্ষিকা। ফাহিমের ছোট ভাই নাফিস ফয়সাল সরকারি আজিজুল হক কলেজে উচ্চ মাধ্যমিকে পড়াশোনা করছেন।

প্রথম বিসিএসেই পছন্দের ক্যাডারে সুপারিশ

২০২২ সালে ফাহিম প্রথমবারের মতো ৪৫তম বিসিএসের বিজ্ঞপ্তি পান। সেটিই ছিল তাঁর প্রথম বিসিএসে অংশ নেওয়ার সুযোগ। পছন্দের তালিকায় প্রথমে পররাষ্ট্র ক্যাডার, দ্বিতীয় স্থানে প্রশাসন এবং তৃতীয় স্থানে পুলিশ ক্যাডার রেখেছিলেন তিনি।

২০২৩ সালে প্রিলিমিনারি ও লিখিত পরীক্ষায় অংশ নেওয়ার পর ২০২৫ সালের সেপ্টেম্বর মাসে মৌখিক পরীক্ষায় (ভাইভা) অংশ নেন ফাহিম। একই বছরের নভেম্বর মাসে ৪৫তম বিসিএসের চূড়ান্ত ফলাফল প্রকাশিত হলে পুলিশ ক্যাডারে সহকারী পুলিশ সুপার পদে সুপারিশপ্রাপ্ত হন তিনি।

এরপর ৪৬তম ও ৪৭তম বিসিএসের প্রিলিমিনারি পরীক্ষায় অংশ নিলেও ৪৫তম বিসিএসে এএসপি পদে সুপারিশ পাওয়ার পর আর কোনো বিসিএসের ভাইভায় অংশ নেননি। নতুন কোনো চাকরির আবেদনও করেননি। দীর্ঘ ১১ মাস অপেক্ষার পর গত ১৪ অক্টোবর বুধবার রাতে জনপ্রশাসন মন্ত্রণালয় চূড়ান্ত নিয়োগের গেজেট প্রকাশ করে। কিন্তু সেই গেজেটে ফাহিমের নাম পাওয়া যায়নি।

সম্প্রতি প্রকাশিত ওই গেজেটে বিভিন্ন ক্যাডারের মোট ১০৪ জন এবং সুপারিশপ্রাপ্তদের মধ্য থেকে অন্তত ৫৬ জন বাদ পড়েছেন বলে প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়েছে।

‘আমার অপরাধটা কোথায়, স্পষ্ট করে জানানো উচিত’

গেজেটে নাম না থাকায় নিজের হতাশা ও ক্ষোভ প্রকাশ করেছেন ফাহিম ফয়সাল। তিনি বলেন, তাঁর বিরুদ্ধে কোনো মামলা নেই এবং তিনি কখনো রাজনীতির সঙ্গে যুক্ত ছিলেন না। ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের হলে থেকে পড়াশোনা করে কোনো সুপারিশ বা তদবির ছাড়াই নিজের মেধা ও পরিশ্রমের মাধ্যমে এই অবস্থানে পৌঁছেছিলেন বলে জানান তিনি।

ফাহিমের ভাষ্য, তাঁর কী অপরাধ, তা সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষের স্পষ্ট করে জানানো উচিত। কোনো অন্যায়ের প্রমাণ থাকলে দেশের আইন অনুযায়ী শাস্তি মেনে নিতেও তিনি প্রস্তুত। তবে কোনো কারণ না জানিয়ে প্রাপ্য অধিকার থেকে বঞ্চিত হওয়া মেনে নেওয়া তাঁর জন্য কঠিন।

তিনি আরও বলেন, সরকার তদন্ত করে যদি তাঁর বিরুদ্ধে কোনো অপরাধের প্রমাণ না পায়, তাহলে তাঁকে তাঁর প্রাপ্য সুযোগ ফিরিয়ে দেওয়া উচিত।

এ বিষয়ে বগুড়ার আইনজীবী অ্যাডভোকেট কামাল উদ্দিন বলেন, গত ১৭ বছর বগুড়া জেলা বঞ্চিত ছিল। সেই ধারা এখনো অব্যাহত থাকলে তা অত্যন্ত দুঃখজনক হবে। বিষয়টি সরকারকে গুরুত্বের সঙ্গে দেখা উচিত। কেন ফাহিমের নাম গেজেটে আসেনি, তা নিয়ে সুষ্ঠু তদন্ত হওয়া প্রয়োজন বলে মন্তব্য করেন তিনি।

সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ফাহিমের আবেগঘন বার্তা

গেজেটে নাম না থাকার পর নিজের বঞ্চিত হওয়ার বিষয়টি তুলে ধরে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে একটি আবেগঘন পোস্ট দেন ফাহিম ফয়সাল। পাঠকদের জন্য তাঁর পোস্টটি হুবহু তুলে ধরা হলো—

‘আলহামদুলিল্লাহসহকারী পুলিশ সুপার (সুপারিশপ্রাপ্ত)Not- Gazetted

ঠিক কোন অপরাধে আমাকে গেজেট বঞ্চিত করা হলো, জানি না। রাষ্ট্রের সেটা স্পষ্ট করে জানাতে হবে। অপরাধ প্রমাণিত হলে উপযুক্ত শাস্তি দিতে হবে, যেন তার প্রায়শ্চিত্ত করতে পারি। আর যদি কোনো অপরাধ না থাকে, আমাকে আমার প্রাপ্য সুযোগ দেওয়া হোক।

অনার্স রেজাল্ট হবার আগেই ২০২২ সালে ৪৫তম বিসিএসের সার্কুলার পাই। প্রথম বিসিএস, আবেগও ছিল তুঙ্গে। কিভাবে দিনরাত এক করে পরিশ্রম করেছি, কাছের লোকেরা দেখেছে।

প্রথম বিসিএসে পছন্দের ক্যাডার পেয়ে যাওয়ায় আর কোনো বিসিএসে অগ্রসর হইনি। আমারও পাইপলাইনে ৪৬, ৪৭ ছিল। ভাইভা/রিটেন দিলে যে প্রিপ্রারেশন ছিল হয়ত আরো চাকরি পেতাম। বেকারদের কথা মাথায় রেখে কাউকে বঞ্চিত করতে চাইনি।

২০২২ থেকে ২০২৬, চারটি বছর পর এই বিসিএসের সব ধাপ পার করে আজ আমি খালি হাতে ফিরছি। ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় থেকে ফার্মেসি বিভাগে অনার্স-মাস্টার্স করে বিদেশ না যাওয়ার সিদ্ধান্ত সঠিক ছিল বলে আমি মনে করতাম। যদিও কাছের অনেকেই আমাকে বারবার সতর্ক করেছিল— এ দেশে মেধার মূল্য নাই।

#বঞ্চিত ৫৬ জনের গেজেট চাই’

এদিকে বিসিএসের মেধাতালিকায় স্থান পাওয়ার পরও চূড়ান্ত গেজেটে নাম না থাকায় ফাহিমের বাবা-মা ও নিকটজনেরা হতভম্ব এবং চরম হতাশার মধ্যে দিন কাটাচ্ছেন। সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে দেওয়া পোস্টেও ফাহিম গেজেট থেকে বাদ পড়া ৫৬ জন প্রার্থীর বিষয়ে যুক্তিসংগত সিদ্ধান্ত নিয়ে তাঁদের নিয়োগের গেজেট প্রকাশের দাবি জানিয়েছেন।

/এসএন