আটক সুমনের দেওয়া তথ্যের ভিত্তিতে উদ্ধার তাজমিনের আইফোন
কুমিল্লার লালমাইয়ে সপ্তম শ্রেণির শিক্ষার্থী জান্নাতুল তাজমিন হত্যাকাণ্ডের তদন্তে অটোরিকশা ও তার ব্যবহৃত আইফোনের সূত্র ধরে এগোচ্ছে পুলিশ। এ ঘটনায় চট্টগ্রাম থেকে মো. সুমন নামে এক সিএনজিচালিত অটোরিকশাচালককে গ্রেপ্তার করা হয়েছে। তাঁর দেওয়া তথ্যের ভিত্তিতে শুক্রবার (৯ অক্টোবর) বিকেলে নিহত তাজমিনের ব্যবহৃত আইফোনটিও উদ্ধার করা হয়। হত্যাকাণ্ডে আরও একাধিক ব্যক্তি জড়িত থাকতে পারেন বলে জানিয়েছে পুলিশ। তবে এ ঘটনায় সুমনের সরাসরি সম্পৃক্ততা এখনো নিশ্চিত হয়নি।নিহত তাজমিনের বাবা আবদুল আলীম বৃহস্পতিবার রাতে অজ্ঞাতনামা ব্যক্তিদের আসামি করে লালমাই থানায় হত্যা মামলা করেন। শুক্রবার সন্ধ্যায় কুমিল্লার পুলিশ সুপার মো. আনিসুজ্জামান এসব তথ্য জানান।গ্রেপ্তার সুমন চাঁদপুরের কচুয়া উপজেলার বাসিন্দা। কয়েক বছর আগে বিয়ে করে তিনি কুমিল্লার লালমাই উপজেলার জয়নগর গ্রামে ঘরজামাই হিসেবে বসবাস শুরু করেন। পুলিশ সূত্রে জানা গেছে, মাসখানেক আগে স্ত্রীর সঙ্গে কথা-কাটাকাটির জেরে শ্বশুরবাড়িতে ভাঙচুর করেন তিনি। এ সময় স্ত্রী ও শ্বশুরকে মারধরের পর বাড়ি ছেড়ে চলে যান। এরপর আর সেখানে ফেরেননি। তাজমিন হত্যাকাণ্ডের পর শুক্রবার চট্টগ্রাম থেকে তাঁকে গ্রেপ্তার করা হয়।কুমিল্লা নগরীর ফরিদা বিদ্যায়তনের শিক্ষার্থী জান্নাতুল তাজমিনের (১৩) মরদেহ গত বৃহস্পতিবার সকালে লালমাই উপজেলার পেরুল উত্তর ইউনিয়নের জগৎপুর গ্রামের একটি ফসলি জমি থেকে উদ্ধার করা হয়। তাঁর বাড়ি যশোর সদর উপজেলার চূড়ামনকাটি ইউনিয়নের ছাতিয়ানতলা এলাকায়। তাজমিনের বাবা আবদুল আলীম একটি বেসরকারি ওষুধ কোম্পানিতে কুমিল্লা জেলায় কর্মরত। তাঁদের পরিবার কুমিল্লা নগরীর রেইসকোর্স এলাকায় বসবাস করে।পুলিশ জানায়, পরিবারের দেওয়া তথ্য অনুযায়ী, গত ৪ অক্টোবর বান্ধবীর বাসায় বেড়াতে যাওয়ার কথা বলে বাড়ি থেকে বের হওয়ার পর নিখোঁজ হয় তাজমিন। তবে তার মোবাইল ফোনের কললিস্ট পর্যালোচনা করে পুলিশ জানতে পারে, সেদিন সে ব্রাহ্মণবাড়িয়ায় গিয়েছিল। পরদিন কুমিল্লায় ফিরে আবার ভোররাতে কক্সবাজার যায়। ৭ অক্টোবর দুপুর সাড়ে ১২টার দিকে সেখান থেকে বাসে রওনা হয়ে রাতে কুমিল্লার পদুয়ার বাজারে নূরজাহান হোটেলের সামনে নামে।পুলিশের ভাষ্য অনুযায়ী, সিসিটিভি ফুটেজে কক্সবাজার থেকে আসা একটি গাড়ি থেকে তাজমিনকে একা নামতে দেখা গেছে। হোটেলের আশপাশের একাধিক ক্যামেরার ফুটেজেও তাকে হাতে মোবাইল ফোন ও কাঁধে ভ্যানিটি ব্যাগ নিয়ে ঘোরাফেরা করতে দেখা যায়। একপর্যায়ে সে সড়কের দিকে চলে যায়। এরপর তার গতিবিধি আর সিসিটিভি ক্যামেরায় ধরা পড়েনি।বৃহস্পতিবার সকালে জগৎপুর গ্রামের ফসলি জমি থেকে তাজমিনের মরদেহ উদ্ধারের সময় পাশেই পরিত্যক্ত অবস্থায় একটি সিএনজিচালিত অটোরিকশা পাওয়া যায়। গাড়িটির নিবন্ধন নম্বরের সূত্র ধরে মালিক হিসেবে লালমাই উপজেলার আবুল হাসেমকে শনাক্ত করে পুলিশ। বৃহস্পতিবার রাতে তাঁকে জিজ্ঞাসাবাদ করা হয়। পুলিশের ভাষ্য অনুযায়ী, আবুল হাসেম জানান, তাঁর অটোরিকশাটি ভাড়ায় চালাতেন সুমন। তিনি লালমাইয়ের বাগমারা ইউনিয়নের জয়নগর এলাকায় থাকতেন।ঘটনাস্থলের বর্ণনা দিয়ে স্থানীয় বাসিন্দা আবু তাহের জানান, খবর পেয়ে মাঠের পাশে গিয়ে তিনি ধানক্ষেতে একটি সিএনজিচালিত অটোরিকশা পড়ে থাকতে দেখেন। আশপাশের ধানক্ষেতে ধস্তাধস্তি ও দৌড়াদৌড়ির চিহ্নও ছিল। পরে সেই চিহ্ন অনুসরণ করে সামনের একটি ধানক্ষেতে নারীর মরদেহ দেখতে পান তিনি। তাঁর ভাষ্য, মরদেহের গলায় গামছা প্যাঁচানো ছিল। পরে তিনি জাতীয় জরুরি সেবা ৯৯৯-এ ফোন করে পুলিশকে খবর দেন।এদিকে, পুলিশের একাধিক সূত্রের বরাতে জানা গেছে, তাজমিনের নতুন বা পুরোনো পরিচিতদের কেউ কেউ এ ঘটনায় জড়িত থাকতে পারেন। গত ৪ অক্টোবর বাড়ি থেকে বের হওয়ার আগে ও পরের কললিস্ট এবং সিসিটিভি ফুটেজ বিশ্লেষণ করে জড়িত ব্যক্তিদের শনাক্তের চেষ্টা চলছে। হত্যার আগে তাকে ধর্ষণ করা হয়েছিল কি না, তা-ও মেডিকেল রিপোর্টের মাধ্যমে খতিয়ে দেখা হচ্ছে।কুমিল্লার পুলিশ সুপার মো. আনিসুজ্জামান বলেন, হত্যাকাণ্ডের উদ্দেশ্য সম্পর্কে তাঁরা অনেকটা নিশ্চিত হয়েছেন। আটক অটোরিকশাচালক জিজ্ঞাসাবাদে বেশ কিছু তথ্য দিয়েছেন। তাজমিনের মোবাইল ফোনের কললিস্ট পর্যালোচনা ও তথ্যপ্রযুক্তির সহায়তায় হত্যাকাণ্ডে আরও একাধিক ব্যক্তির জড়িত থাকার তথ্য পাওয়া গেছে। তাঁদের গ্রেপ্তারে অভিযান চলছে।তবে অটোরিকশাচালক সুমন হত্যাকাণ্ডে সরাসরি জড়িত কি না, তা এখনো নিশ্চিত করেনি পুলিশ। শনিবার সংবাদ সম্মেলনে হত্যাকাণ্ডে জড়িত ব্যক্তিদের বিষয়ে বিস্তারিত জানানো হবে বলে জানিয়েছে আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনী।
/বিএসএস